ডেঙ্গুর সংক্রমণ কমার কোনো লক্ষণ নেই। বরং সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। প্রায় মাঝামাঝি এসে এখন আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। শুধু সরকারি হিসাবেই এ পর্যন্ত রোগটি নিয়ে প্রায় অর্ধলাখ মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। অধিকাংশ মানুষ ছাড়পত্র নিলেও স্বজন হারিয়েছে শতাধিক পরিবার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, গত সাড়ে ৮ মাসে ডেঙ্গুতে প্রাণহানি ১৪১ জনের। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগেই মারা গেছেন ৭২ জন। ডেঙ্গুতে দেশে মোট মৃত্যুর ৫১ দশমিক ১ শতাংশই ঢাকা বিভাগে। বাকি ৬৯ জন মারা গেছেন বাকি সাত বিভাগে। শুধু মৃত্যু নয়, রোগীর হিসাবেও ঢাকা শীর্ষে। গতকাল সারা দেশের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৭৯০ রোগীর মধ্যে ঢাকা বিভাগেরই ৩৭২ জন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ৬২ এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৬১ জন।
ডেঙ্গুবিষয়ক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এবারের ডেঙ্গু পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি হয়েছে ঢাকাকে ঘিরেই। রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন ও ঢাকা বিভাগের অন্যান্য জেলায় ডেঙ্গু রোগী ও মৃত্যু বেশি হওয়ার পেছনে বিশেষজ্ঞদের ধারণা জনঘনত্ব, নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ ও বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং এডিস মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা সবচেয়ে বেশি দায়ী। তাদের মতে, সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে সংক্রমণ ও মৃত্যুর যে গতি, তাতে সামনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। রোগটি মোকাবিলায় এখনই কার্যকর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা না হলে আগামী নভেম্বর পর্যন্ত রোগী ও মৃত্যু উদ্বেগজনক হারে বাড়তে পারে।
এ বিষয়ে জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল বলেন, ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর অর্ধেকের বেশি ঢাকায় হওয়া অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। রাজধানীতে জনঘনত্ব বেশি, পাশাপাশি নির্মাণাধীন ভবন, বাসাবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনায় পানি জমে এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। তবে ঢাকায় মৃত্যুর সংখ্যা বেশি হওয়ার আরেকটি কারণ হলো, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে গুরুতর রোগীরা উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসেন। তাই শুধু হাসপাতালের পরিসংখ্যান দিয়ে স্থানীয় সংক্রমণের পুরো চিত্র বোঝা যাবে না।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এখন এলাকাভিত্তিক নজরদারি বাড়াতে হবে। কোন ওয়ার্ডে রোগী বেশি, কোথায় মশার ঘনত্ব বেশি—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও জরুরি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ১৪১ জনের মৃত্যু এবং প্রায় ৫০ হাজার রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়া পরিস্থিতির ভয়াবহতা নির্দেশ করছে। বিশেষ করে ঢাকায় মৃত্যুর হার বেশি হওয়া আমাদের জন্য বড় সতর্কবার্তা। শুধু মশা নিধন বা ফগিং করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; এডিস মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে উৎস ধ্বংস করতে হবে। একই সঙ্গে রোগী শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। ডেঙ্গুতে জ্বর কমে যাওয়ার পরও রোগীর অবস্থা হঠাৎ সংকটাপন্ন হতে পারে; তাই চিকিৎসকদের পাশাপাশি রোগীর স্বজনদেরও সতর্ক থাকতে হবে। ঢাকার পাশাপাশি দেশের অন্যান্য এলাকাতেও নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ সংক্রমণ যদি আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ দ্রুত বাড়বে।
১৪১ মৃত্যুর ৭২ জনই ঢাকায় ডেঙ্গুতে মৃত্যু এখন দেড় শয়ের কাছাকাছি। এ বছরের গত সাড়ে ৮ মাসে ডেঙ্গুতে ১৪১ জনের প্রাণহানির তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তাদের মধ্যে প্রতি ১০ জনে পাঁচজনের বেশি মারা গেছেন ঢাকায়। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও অন্যান্য জেলায় মারা গেছেন ৭২ জন। এরপর দ্বিতীয় অবস্থানে খুলনা বিভাগ। সেখানে মারা গেছেন ২৫ জন। ময়মনসিংহে ১৪, বরিশালে ১২, চট্টগ্রামে ১০ ও রাজশাহীতে ছয়জন মারা গেছেন। রংপুর ও সিলেট বিভাগে একজন করে মারা গেছেন। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের সব বিভাগ মিলিয়েও মৃত্যুর সংখ্যা ঢাকার চেয়ে কম। ঢাকার বাইরে সব বিভাগে মারা গেছেন ৬৯ জন। এদিকে গতকাল ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৭৯০ জনের মধ্যে ঢাকা বিভাগ ও দুই সিটি করপোরেশন মিলিয়ে রাজধানীকেন্দ্রিক এলাকায় এক দিনেই ভর্তি হয়েছেন ৩৭২ জন। এর পরই রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ—১৯৬ জন। ময়মনসিংহে ৭৩, খুলনায় ৬০, রংপুরে ৩৮, রাজশাহীতে ৩৩ ও বরিশালে ১৮ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
সেপ্টেম্বরেই বেড়েছে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর গতি বছরের প্রথম ছয় মাস ডেঙ্গু অনেকটা নিয়ন্ত্রণে ছিল। জুলাই থেকে বাড়তে শুরু করে শনাক্ত-মৃত্যু। আগস্টে পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকে, আর সেপ্টেম্বরে এসে তুলনামূলকভাবে ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। গতকাল নতুন করে আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। নতুন দুই মৃত্যুর একজন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের এবং অন্যজন চট্টগ্রাম বিভাগের। শুধু সেপ্টেম্বরের গত ১১ দিনে মারা গেছে ৪৪ জন।
অর্ধলাখের ঘরে ডেঙ্গু রোগী বছরের শুরুতে সংক্রমণ তুলনামূলক কম থাকলেও বর্ষা ও সেপ্টেম্বরের শুরুতে রোগীর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। এখন প্রায় প্রতিদিন গড়ে হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। এ নিয়ে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা এখন ৪৯ হাজার ২২০ জনে পৌঁছে গেছে। শুরুতে রোগীর চাপ কম থাকলেও দেড় মাস ধরে প্রতিদিন প্রায় এক হাজারের বেশি রোগী ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে রাজধানীসহ সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ সময় মৃত্যুও বেড়েছে আগের ৭ মাসের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি।