রাজধানীর টেকনিক্যাল মোড়ে রিকশার ওপর এক উদ্বিগ্ন তরুণ। ফোনে কাউকে তিনি বলছেন, আমাকে বশ করে হাত থেকে আইফোন নিয়ে গেছে। ওরা আমার হাতে কী দিল আমি কিছুই বুঝলাম না। আমি থানায় যাচ্ছি। কী হয়ে গেল আমার সঙ্গে?
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ইফতিমুল হাসান নামে ওই তরুণ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, কিশোরগঞ্জের ইটনায় তার বাড়ি। ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ নিতে কয়েক দিন ধরে ঢাকায় থাকা শুরু করেছেন। দারুসসালাম টাওয়ারের সামনে এক মুরুব্বি তাকে জিজ্ঞাসা করে, এটা কোন জায়গা? তখন তিনি বলেন, আমি ঢাকায় নতুন। তেমন একটা চিনি না। এর কিছুক্ষণ পরই অন্য এক ব্যক্তি এসে তাকে সালাম দিয়ে বলেন, ফোনটা দেওয়া যাবে? জরুরি ফোন করা দরকার।
তখন তিনি ওই ব্যক্তিকে বলেন, ফোনে টাকা নেই। এর কিছুক্ষণ পর একই ব্যক্তি তাকে বলেন, ফোন তো দিলেন না, এই প্যাকেটে কী আছে একটু দেখে দেন। লবণের মতো একটি প্যাকেট দেখতে গিয়ে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন ইফতিমুল। আর ওই ব্যক্তি তার পকেট থেকে আইফোনটি নিয়ে চম্পট দেন। নিজের চোখের সামনে শখের আইফোন নিয়ে গেলেও কোনো বাধা দেননি তিনি। চক্রের সদস্যরা সবকিছু নেওয়ার কিছু সময় পর স্বাভাবিক হন তিনি। দিক্বিদিক লোকগুলোকে খুঁজতে থাকেন। কোথাও তাদের না পেয়ে এরপর অভিযোগ দিতে ছোটেন দারুসসালাম থানায়।
শুধু ইফতিমুল হাসানই নন, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এই চক্রটি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। দেশের জনবহুল বিভিন্ন স্পটে, ব্যাংক, মানি এক্সচেঞ্জ, লঞ্চে, বাসে বা ট্রেনে চক্রটি কাজ করে। এরা প্রতিটি গ্রুপে ৩-৪ জন থাকে। আজ যে গ্রুপটি এই এলাকায় কাজ করছে, কাল সে গ্রুপটি অন্য এলাকায় কাজ করে। ঘুরেফিরে এরা বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ হয়ে বিভিন্ন এলাকায় কাজ করে থাকে। স্কোপোলামিন প্রয়োগ করে কখনো মোটা অঙ্কের টাকা, সঙ্গে থাকা মূল্যবান জিনিসপত্র, কখনো কখনো এটি প্রয়োগ করে টার্গেটকৃত ব্যক্তিকে হত্যা করে সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে। গত ২৫ মে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় অটোরিকশা নিয়ে বের হয়ে নিখোঁজ হন হোসেন মিয়া। ২৮ মে কসবার একটি পুকুরে তার লাশ পাওয়া যায়। নিহতের স্ত্রীর অভিযোগ, অটোরিকশা, নগদ টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা তাকে হত্যা করেছে। এ ঘটনায় র?্যাব-৯ ও র?্যাব-১১ এর যৌথ অভিযানে ২৩ আগস্ট কুমিল্লার দেবিদ্বার ও কোতোয়ালি থেকে আবুল বাশার ও নাজমুন নাহার লাভলীকে গ্রেপ্তার করা হয়। র্যাব জানায়, গ্রেপ্তার দুজন স্বীকার করেছেন, তারা ও অন্য আসামিরা ঘটনার দিন শয়তানের নিঃশ্বাস নামে এক ধরনের চেতনানাশক ব্যবহার করে চালককে অচেতনের পর হত্যা করে তার অটোরিকশাটি নিয়ে যান।
গত ২০ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসে শয়তানের নিঃশ্বাস প্রয়োগ করে একটি অটোরিকশা ও মোবাইল ফোন ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। জানা গেছে, ঢাবির সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের সামনে থেকে রিকশা নিয়ে ফুলার রোড দিয়ে টিএসসি আসার পথে ভিসি চত্বরে তাকে ইশারা দিয়ে থামতে বলা হয়। ভিসি চত্বর ও কলা ভবন গেটের মধ্যবর্তী স্থানে পৌঁছে ওই যাত্রী ভাড়ার জন্য কেমিক্যালযুক্ত একটি ৫০ টাকার নোট দেন। চালক টাকা হাতে নিয়ে ২০ টাকা ফেরত দেওয়ার পরপরই নিজের ইচ্ছাশক্তি ও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। এরপর তার সঙ্গে কী কী হয়েছে তা মনে নেই। জ্ঞান ফেরার পর দেখেন, তার রিকশা ও মোবাইল নেই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শয়তানের নিঃশ্বাস বা ডেভিলস ব্রেথ হলো স্কোপোলামিন নামক একটি শক্তিশালী এবং বিপজ্জনক রাসায়নিক বা ড্রাগ, যা মূলত ধুতরা গাছের ফুলের বীজ থেকে তৈরি করা হয়। এর ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব হারাচ্ছে অসংখ্য মানুষ। ?শয়তানের নিঃশ্বাসের স্পর্শে, নিঃশ্বাসে বা খাবারের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করলে আক্রান্ত ব্যক্তি সাময়িকভাবে তার নিজের ইচ্ছাশক্তি ও স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলে।
মূলত অজ্ঞান পার্টি, মলম পার্টি বা ছিনতাইকারী চক্র এই ড্রাগটি ব্যবহারের কৌশল রপ্ত করে। শয়তানের নিঃশ্বাস বা ডেভিলস ব্রেথের ফলে তার সামনের ব্যক্তি যা আদেশ করবে, সেই ব্যক্তি সেই আদেশ অনুযায়ী কাজ করতে বাধ্য থাকবে। এর প্রভাবে ভুক্তভোগী কোনো প্রতিরোধ না করে অপরাধীর নির্দেশ অনুসরণ করে সবকিছু দিয়ে দিচ্ছে। এই মাদক ব্যবহার করে বহির্বিশ্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপরাধীদের জবানবন্দি আদায় করে থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে এর উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষক ড. দুলাল কৃষ্ণ সাহা জানান, চিকিৎসার জন্য আবিষ্কৃত ও ব্যবহৃত এই গুঁড়া বা তরল রাসায়নিক দ্রব্যের অপব্যবহার বিশ্বজুড়ে এখন এতটা ভয়াবহ হয়ে উঠেছে যে শয়তানের নিঃশ্বাস বা ডেভিলস ব্রেথ নামে পরিচিতি পেয়েছে। স্কোপোলামিন মানুষের নাকের কাছাকাছি এলেই এটা নিঃশ্বাসের সঙ্গে ভিতরে প্রবেশ করে। অল্প সময়ের মধ্যে এটা প্রভাব ফেলতে শুরু করে। তখন মেমোরি আর ব্রেন সচেতনভাবে কাজ করতে পারে না। এটি সাধারণত ১৫ থেকে ৩০ মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হয়। তবে এর তীব্র প্রভাব ১ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
এটি ব্যবহারের ফলে সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে মুখ শুকিয়ে যাওয়া, ঝাপসা দেখা, চোখের মণি বড় হয়ে যাওয়া, মাথাব্যথা, ঝিমুনি, মাথা ঘোরা, বিভ্রান্তি, ঘাম হওয়া ও গলাব্যথা হতে পারে। এ ছাড়া হৃদ্স্পন্দন ধীর হয়ে যাওয়া, হ্যালুসিনেশন, কথা বলার সমস্যা, খিঁচুনি, উত্তেজনা, ত্বকে র্যাশ বা লালচে ভাব ও প্রস্রাব করতে কষ্ট বা ব্যথা হতে পারে।