চট্টগ্রামে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্ন হওয়ায় ভারী ও মাঝারি শিল্পগুলোর চাকা কার্যত মন্থর হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, ইস্পাত এবং সিমেন্টের মতো বৃহৎ শিল্পগুলোতে কমেছে উৎপাদন। তবে চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে সরকার যে উদ্যাগ নিয়েছে তাতে আশাবাদ ব্যক্ত করছেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, ‘পৃথিবীর প্রায় প্রত্যেক দেশ বর্তমানে জ্বালানি সংকটে ভুগছে। এ সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী যে স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদি উদ্যোগ নিয়েছেন তা এক কথায় ইউনিক। শিল্পাঞ্চলের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ, গ্যাসের নতুন কূপ খনন, দেশি গ্যাস অনুসন্ধান এবং জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি অগ্রাধিকার দেওয়া শুভ ইঙ্গিত বহন করছে। সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে দেশ জ্বালানিনির্ভর হবে বলে আশা করছি।’
বিজিএমইএর পরিচালক ও এশিয়ান গ্রুপের উপ-পরিচালক সাকিফ আহমেদ সালাম বলেন, ‘জ্বালানি সংকটের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি যে উদ্যোগ নিয়েছেন তা প্রশংসনীয়। এ উদ্যোগ শিল্পখাতের জন্য মাইলফলক হয়ে থাকবে। আমরা চাই এ উদ্যোগ দ্রুত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন হোক।’ জানা গেছে, চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছে তৈরি পোশাক খাত। অপর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের কারণে এক প্রকার থমকে গেছে এর উৎপাদন। বিজিএমইএর তালিকাভুক্ত ৭৫৯টি কারখানার মধ্যে প্রায় ৫০০টি কারখানার উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া হয়েছে দুই তৃতীয়াংশ। তৈরি পোশাক কারখানার বয়লারগুলো কাজ না করায় উৎপাদন নেমে এসেছে অর্ধেকেরও নিচে। গ্যাস সংকটের কারণে ওয়াশিং কারখানাগুলোর বেশির ভাগ মেশিন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। চট্টগ্রামের প্রায় ৫০টিরও বেশি ওয়াশিং কারখানায় ৩৫ শতাংশ সক্ষমতাও ব্যবহার করা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দেশের ইস্পাতের চাহিদার ৭০ শতাংশের বেশি পূরণ করে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড ও মিরসরাই বেল্টের কারখানাগুলো। কিন্তু জ্বালানি সংকটের কারণে চট্টগ্রামের বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ কমে গেছে। ইস্পাত খাতের মতোই জ্বালানি সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সিমেন্ট শিল্পেও। কাঁচামাল বা ‘স্ল্যাগ’ শুকানো এবং গ্যাসচালিত জেনারেটর চালানোর জন্য পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় চট্টগ্রামের সিমেন্ট কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর বাইরে ভোগ্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকারী বৃহৎ শিল্পগ্রুপগুলোও চরম বিপাকে। গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে ভোজ্য তেল এবং গম পরিশোধনকারী অনেক কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা ৪০ থেকে ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে। অনেক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখতেও বাধ্য হয়েছেন মালিকরা। এদিকে শিল্পখাতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্ন হওয়ার মধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর নেওয়া স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকে ঘিরে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা। প্রসঙ্গত, আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করেছে সরকার। এর মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, বায়ু, বর্জ্য, পানিবিদ্যুৎ, ভাসমান সোলার ও অ্যাগ্রিভোলটেইক্সসহ অন্যান্য প্রযুক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। সংকট নিরসনে সরকার শিল্পাঞ্চলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ, নতুন কূপ খনন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। এ ছাড়া ভোলা থেকে সরাসরি মূল ভূখণ্ডে গ্যাস নিতে পাইপলাইন নির্মাণ, ভোলায় শিল্প-কারখানা স্থাপন, সার কারখানা এবং নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।