তুমুল তর্কবিতর্ক ও হট্টগোল আর বিরোধী দলের বারবার ওয়াকআউটের মধ্য দিয়ে বেশ উত্তপ্ত ছিল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনও। বৃহস্পতিবার শেষ হওয়া এ অধিবেশন ছিল ৯ কার্যদিবসের। চলমান জ্বালানি ও গ্যাসসংকট নিয়ে সংসদে বিরোধী দল ছিল সোচ্চার। মুখে কালো কাপড় বেঁধে প্রতিবাদ করেছেন তারা। বিলসহ অন্য ইস্যুতে অধিবেশন থেকে ওয়াকআউটের ঘটনা ঘটেছে একাধিকবার। স্বতন্ত্র এমপিরাও সরকারের সমালোচনায় ছিলেন মুখর। অন্যদিকে সরকারদলীয় জোট দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে দিয়েছে ব্যাখ্যার পর ব্যাখ্যা। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানে মন্ত্রীরা তুলে ধরেছেন সরকারের গৃহীত নানা সমন্বিত পদক্ষেপের কথা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জ্বালানিসংকটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন। দেশ পরিচালনায় চেয়েছেন বিরোধীদলীয় জোটের সহযোগিতা।
বলেছেন, জুলাইয়ের গণতান্ত্রিক শক্তির মধ্যে বিভেদে যাতে পতিত রাজনৈতিক দল ফেরার সুযোগ না পায়, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। অন্যদিকে সংসদের চিত্রকে পুরোনো নেতিবাচক গণতান্ত্রিক বন্দোবস্ত বলছেন বিশ্লেষকরা। এবারের তৃতীয় অধিবেশনে সংসদীয় রেওয়াজ ও কার্যপ্রণালি বিধি ভঙ্গেও কিছু ঘটনা ঘটেছে। অধিবেশন কক্ষে মোবাইল ফোনে কথা বলা, একজনের বক্তব্যের সময় অন্যদের দাঁড়িয়ে উচ্চৈস্বরে বক্তব্য দেওয়া, স্পিকারের অনুমতি না নিয়ে লিখিত বক্তব্য পড়া, বিল পাসের পরও তা নিয়ে আলোচনা করা ইত্যাদি। সবচেয়ে বেশি বিধি ভঙ্গ করা হয়েছে পয়েন্ট অব অর্ডার নিয়ে। এ পয়েন্টে অনেক এমপি দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু সেগুলো বিধিসম্মত হয়নি বলে উষ্মা প্রকাশ করেছেন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার। বিষয়টি নিয়ে এমপিদের পড়াশোনার কথাও বলেছেন তারা। সমাপনী দিনে স্পিকার জানিয়েছেন, পয়েন্ট অব অর্ডারের ১০০ ভাগের মধ্যে ৯৯ ভাগও সঠিকভাবে হয়নি। সংসদের এ চিত্রের কড়া সমালোচনা করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
তারা বলেছেন, সংসদ দেখে মনে হয়েছে, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে সরকারি দল যেটা চাইবে সেটাই হবে। আবার বিরোধী দলকে দেখা গেছে বেশ অসহিষ্ণু। মূল বিষয় বাদ দিয়ে তারা অন্য বিষয় নিয়ে বেশি সোচ্চার ছিলেন। সরকারের কিছু দুর্বলতাকে তারা রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, জনদুর্ভোগ বাড়িয়ে যদি লং মার্চ আর বড় বড় সমাবেশ করা হয়, আর এটাই যদি বিরোধী দলের কাজ হয়, তাহলে আমরা সেই পুরোনো নেতিবাচক গণতান্ত্রিক বন্দোবস্তের মধ্যে আবার ঢুকে যাব। অধিবেশন চলাকালে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, গ্যাস-বিদ্যুৎসংকট এবং লাগামহীন মূল্যস্ফীতি নিয়ে বিরোধী ও স্বতন্ত্র এমপিরা সরকারের কড়া সমালোচনা করেন। এর জবাবে সরকারের পক্ষ থেকে পাল্টাপাল্টি যুক্তি দেওয়া হলে পুরো সংসদে চরম হট্টগোল ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিরোধীদলীয় জোট কয়েক দফা ওয়াকআউট করে। সরকারি দলের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ ও অন্য মন্ত্রীরা এ ওয়াকআউটকে ‘পরিকল্পিত’ এবং সংসদীয় প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা বলে অভিহিত করেন। তারা বিরোধী দলকে তুচ্ছ অজুহাতে সংসদ বর্জন না করে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের আহ্বান জানান।
অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গালাগালির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, বর্তমানে দেশে গণতান্ত্রিক একটি পরিবেশ বিরাজ করছে, বাকস্বাধীনতা অবারিত। কিন্তু আমাদের মনে রাখা দরকার, বাকস্বাধীনতা যেন বাকশালীনতার সীমা লঙ্ঘন না করে। অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তারা দায়িত্বশীলভাবে ভূমিকা পালন করবেন। প্রশাসনকে দলীয়করণ থেকে বিরত রাখা, বৈষম্য দূর করা, মানুষের বাঁচার দাবি, শিল্প রক্ষা এবং জ্বালানি ও বিদ্যুতের সংকট সমাধানসহ তাদের বিভিন্ন দাবি জনগণের দাবি বলেও উল্লেখ করেন তিনি। লং মার্চ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি কোনো দলীয় স্বার্থের কর্মসূচি ছিল না, জনগণের বিভিন্ন দাবি নিয়েই তারা এ কর্মসূচি পালন করেছেন। সরকার আলোচনায় বসে জনগণের দাবি মেনে নিলে লং মার্চের প্রয়োজন হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংসদ অধিবেশন বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সংসদের প্রথম অধিবেশনে ইতিবাচক সংস্কৃতির কিছু দৃষ্টান্ত ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংসদে সরকারদলীয় জোট তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করছে। অর্থাৎ তারা যা চাইবেন সেটাই হবে-এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে ভিন্ন মতের বিরুদ্ধে নেতিবাচক মন্তব্য শোনা গেছে। এটা সংসদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে বিরোধী দল বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা করছে। পাশাপাশি সরকারের কিছু ভুল পদক্ষেপকে তারা রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করছে। একই প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, রাস্তাঘাটে জ্বালাও-পোড়াও কিংবা জনদুর্ভোগ বাড়িয়ে বিরোধী দলের শক্তি সামর্থ্য প্রকাশ করা-এটা কিন্তু আসলে সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল আকর্ষণ কিংবা মূল কার্যক্রম নয়। এখন বিরোধী দল যদি মনে করে যে, ওই পুরোনো ধারায় তারা আবার চলে যাবে, তাহলে গণতন্ত্র বিকশিত হওয়ার ক্ষেত্রে আবার আমরা আটকে যাব। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের কার্যক্রম শুরু হয় ২৭ আগস্ট। এবারের অধিবেশনে মোট ৯টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ছয়টি বিল পাস হয়েছে। অধিবেশনে ৩৫টি সংসদীয় কমিটি গঠন ও পুনর্গঠন করা হয়েছে।
এ ছাড়া একটি বিশেষ কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। সংসদীয় কার্যপ্রণালির বিভিন্ন বিধির আওতায় এমপিরা গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে নোটিস দিয়েছেন। ৬৮ বিধিতে সাতটি নোটিস পাওয়া যায়, যার মধ্যে দুটি নোটিস গৃহীত ও আলোচিত হয়েছে। ৭১ বিধিতে ১৫টি নোটিস গৃহীত হয় এবং এর মধ্যে ১৪টি নোটিসের ওপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ৭১ক বিধিতে দুই মিনিটের বক্তব্যর জন্য ১২৪টি নোটিস পাওয়া যায়। এ ছাড়া ১৪৭ বিধিতে দুটি নোটিস পাওয়া যায়, যার মধ্যে একটি নোটিসের ওপর আলোচনা হয়েছে এবং ৩০২ বিধিতে একটি নোটিস উত্থাপিত হয়েছে। অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর উত্তরদানের জন্য ১৪৪টি প্রশ্নের নোটিস দেন। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ১৫টি প্রশ্নের উত্তর দেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের উত্তরদানের জন্য মোট ২,৬৭৬টি প্রশ্নের নোটিস পাওয়া যায়। এর মধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রিরা ১,৬৭৮টি প্রশ্নের উত্তর দেন।