কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ উপন্যাসের তাৎপর্যপূর্ণ উক্তি হলো ‘সংসারে মানুষ চায় এক, হয় আরেক। পুতুল বৈ তো নই আমরা, একজন আড়ালে বসে খেলাচ্ছেন’। ওই উপন্যাসের চরিত্রের সঙ্গে কি সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের চরিত্রের মিল খুঁজে যাওয়া যায়? ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতার অপব্যবহার করে ‘ধরাকে সরা জ্ঞান’ করেছিলেন। ভারতের খুঁটির জোরে তিনটি পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় বসে রাষ্ট্রের শত শত কোটি টাকা খরচ করে পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে নবী-রাসূলের (নাউজুবিল্লাহ) পর্যায়ে নিতে চেয়েছিলেন। পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়কে বিশেষজ্ঞ পরিচয়ে প্রধানমন্ত্রীর অবৈতনিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ক উপদেষ্টা পদে নিয়োগ দিয়ে কয়েক লাখ টাকা বেতন দেন।
ভারতের পৃষ্ঠপোষকতায় ‘পিএইচডি ডিগ্রির’ ফেইক সার্টিফিকেট দেখিয়ে কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক পদে নির্বাচিত করিয়েছিলেন। কথায় কথায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্ত্রী-সন্তানদের ‘অশিক্ষিত-মূর্খ’ বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে নিজের ছেলেমেয়ের উচ্চ শিক্ষা নিয়ে অহঙ্কার করতেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! পুতুলনাচের ইতিকথা গল্পের মতোই শেখ হাসিনার পরিণতি ‘একজন আড়ালে বসে খেলাচ্ছেন’। পুত্র-কন্যা দু’জনকই ডিভোর্সি হওয়ায় পরিবার-সংসারের সুখ বলে কিছু নেই। পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় বাংলাদেশের পাসপোর্ট স্যালেন্ডার করে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব নিয়েছেন। কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল অনিময়, দুর্নীতি এবং জাল-জালিয়াতির সার্টিফিকেটের দায় নিয়ে ডব্লিউএইচও দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগ করলেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক প্রধানের পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। দুর্নীতি, জালিয়াতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠায় তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা দায়ের করায় গত জুলাই মাসে তাকে অবৈতনিক ছুটিতে পাঠায় জাতিসংঘের সংস্থা ডব্লিউএইচও। গত ৯ সেপ্টেম্বর ডব্লিউএইচও’র মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুসের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন পুতুল।
জানা গেছে, ডব্লিউএইচও সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বিরুদ্ধে ‘চীনে তার সফর-সংক্রান্ত বিষয়ে আর্থিক জালিয়াতি করার’ এবং তার অ্যাকাডেমিক যোগ্যতা সম্পর্কে ভ্রান্ত তথ্য (ফেইক পিএইচডি) দেয়ার অভিযোগ আনে। গত ৩ জুলাই ডব্লিউএইচওকে পাঠানো একটি পৃথক চিঠিতে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ৯ সেপ্টেম্বর পদত্যাগপত্রে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল উল্লেখ করেছেন, তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে একটি প্লট অবৈধভাবে অধিগ্রহণের অভিযোগ এনেছে ডব্লিউএইচও।
সায়মা ওয়াজেদ পুতুল জানিয়েছেন, জাতিসংঘের এই সংস্থাটিতে যোগদানের আগেই এই জমিটি অধিগ্রহণ করেছিলেন তিনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রযোজ্য একটি আইনের আওতায় ওই জমিটি তিনি পারিবারিকভাবে পেয়েছিলেন।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জাতিসংঘের এই সংস্থাটির আঞ্চলিক প্রধান হিসেবে পাঁচ বছরের জন্য দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। ২০২৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ওই পদে তার দায়িত্ব পালনের কথা ছিল। এর আগে ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক পদে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ভারতের পৃষ্ঠপোষকতায় নেপালের প্রার্থী শম্ভু প্রসাদ আচার্যকে পরাজিত করেন। অথচ ওই পদে শম্ভু প্রসাদ আচার্য ছিলেন যোগ্য এবং সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ছিলেন অযোগ্য।
বিশ্ব স্বাস্থ্যা সংস্থার আঞ্চলিক পরিচালক পদের জন্য বাংলাদেশের তরফ থেকে যখন সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে মনোনীত করা হয় তখন সেটি নিয়ে বেশ বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। এই পদের জন্য তিনি কতটা ‘উপযুক্ত’ সে প্রশ্ন উঠেছিল বিভিন্ন জায়গায়। চিকিৎসা বিষয়ক বিশ্বখ্যাত সাময়িকী দ্য ল্যানসেট ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসের এক সম্পাদকীয়তে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের মনোনয়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। এতে বলা হয়েছিল, কয়েকটি অঞ্চলে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে; এছাড়া সায়মা ওয়াজেদ পুতুল প্রার্থী হিসেবে এই পদের জন্য উপযুক্ত কি না সেই প্রশ্নও রয়েছে। ওই সম্পাদকীয়তে আরো বলা হয় যে, অনুপযুক্ত প্রার্থীর নির্বাচন প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ যেমন রয়েছে তেমনি আঞ্চলিক পরিচালকদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে।
ডব্লিউএইইও’র দিল্লির হেড অফিসে কর্মরত আঞ্চলিক পরিচালক ১১টি দেশের দুইশ’ কোটি মানুষের জন্য ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বাজেট দেখাশোনা করেন। এই ১১টি দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ, ভুটান, নেপাল, ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, উত্তর কোরিয়া, পূর্ব তিমুর। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক পদে বাংলাদেশ থেকে প্রার্থী সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে মনোনয়ন দেয়ায় স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তোলা হয়েছিল। কারণ প্রার্থী ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা। এই পদের জন্য সে সময় সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের সাথে আরেকজন প্রার্থী ছিলেন নেপালের সম্ভু আচার্য। তিনি ছিলেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে সেখানে কাজ করছিলেন এবং জনস্বাস্থ্যোর ওপর তার পিএইচডি ডিগ্রি রয়েছে।
অন্যদিকে, সায়মা ওয়াজেদ পুতুল মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে কাজ করতেন। তার বেশিরভাগ কাজ ছিল অটিজম নিয়ে। ব্রিটেনের ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস পত্রিকার ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এক প্রতিবেদনে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের মনোনয়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। এই পদের জন্য সায়মা ওয়াজেদ পুতুল কতটা উপযুক্ত সেই প্রশ্ন তুলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সায়মা ওয়াজেদ পুতুল স্কুল সাইকোলজিস্ট হিসেবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং তিনি একটি দাতব্য ও গবেষণা সংস্থা দেখাশোনা করেন। তবে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় বড় বাজেট নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা তার নেই। অথচ ডব্লিউএইচও’র আঞ্চলিক পরিচালকরা বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী স্বাস্থ্য নীতিনির্ধারক হিসেবে বিবেচিত হন বলে এই পদটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। নতুন রোগের প্রাদুর্ভাব ও জরুরি পরিস্থিতিতে সাড়া দেয়া এবং স্থাানীয় পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডব্লিউএইচও’র নীতি বাস্তবায়ন এই আঞ্চলিক পরিচালকদের অন্যতম দায়িত্বে।
ভারতের পৃষ্ঠপোষকতা ও মায়ের বদৌলতে জাতিসংষের সংস্থাটিকে নিয়োগ পাওয়া পুতুলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম, সার্টিফিকেট জাল জালিয়াতির অভিযোগ ওঠায় তাকে বাধ্যতামূলক ছুটি দেয়া হয়েছিল। দীর্ঘদিন বাধ্যতামূলক ছুটি দেয়ার পর ডব্লিউএইচও আনুষ্ঠানিকভাবে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে অপসারণের পরিকল্পনা করে। এটা বুঝতে পেরে ৯ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সংস্থা ডব্লিউএইচওতে পদত্যাগপত্র জমা দেন। জমা দেয়া পদত্যাগপত্রে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল লিখেছেন, ‘আমার অঞ্চলের দেশগুলোর সেবা করার জন্য আমি আঞ্চলিক পরিচালক পদে নির্বাচিত হয়েছিলাম এবং সেটি সততার সঙ্গেই পালন করেছিলাম। যেহেতু আপনি (ডব্লিউএইচও’র মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুস) আমাকে আমার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা থেকে বিরত রেখে চলেছেন তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় আপনার নেতৃত্বের ওপর আমার আস্থা এবং বিশ্বাস হারিয়ে গেছে।
আপনার সিদ্ধান্তে আমাকে অবৈতনিক ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্তের পর এক বছর ধরে কোনো বেতন বা পারিশ্রমিক না পাওয়ায় আমার আর্থিক অবস্থা অসহনীয় হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আমি সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছি’। এর আগে গত জুলাই মাসে এক চিঠিতে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল আইনজীবীর মাধ্যমে চীন সফরে জালিয়াতির অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। সে সময় তিনি জানিয়েছিলেন, ওই ভুল প্রশাসনিক একজন কর্মকর্তা করেছিলেন। যিনি দৈনন্দিন বিল পরিশোধের আবেদনগুলো নিয়ে কাজ করতেন। ওই অর্থের পরিমাণ ছিল ৯০১ ডলার। একই সঙ্গে নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা অভিযোগ প্রসঙ্গে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল বাংলাদেশে অটিজম নিয়ে কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ একটি ‘সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি’ অর্জন করার কথা ডব্লিউএইচও’র মহাপরিচালককে জানিয়েছিলেন।
চার সন্তানের মা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল সিঙ্গেল মাদার। স্বামী খন্দকার মাসরুর হোসেন মিতুর প্রায় ২৫ বছরের দীর্ঘ সংসার জীবনের অবসান ঘটিয়ে ২০২৬ সালের জুলাই মাসে সমঝোতার মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটান। বিচ্ছেদের চুক্তির শর্তাদি ও তাদের অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের আইনগত অভিভাবকত্ব সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। পুতুলের সাবেক স্বামী খন্দকার মাসরুর হোসেন মিতু রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান এবং তার বাবা সাবেক মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন ফরিদপুরের এমপি ছিলেন। মূলত গণমাধ্যমের তথ্যে জানা যায়, সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ও খন্দকার মাসরুর হোসেন মিতুর অনানুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ ঘটে কয়েক বছর আগে। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, একটি মহাপ্রকল্পের বিশাল অংকের স্পিরিটমানি দুবাইয়ের একটি ব্যাংকে খন্দকার মাসরুর হোসেন মিতু ও সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের নামে জমা হয়। ওই অর্থের উৎস সম্পর্কে সঠিক তথ্য দিতে ব্যর্থ হওয়ায় মাসরুর হোসেন মিতুকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়।
তিনি কয়েক বছর দুবাই কারাগারেই ছিলেন। গণমাধ্যমে খবর অনুযায়ী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে এবং ওই সময়ের অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালকে দুবাই পাঠিয়ে মিতুকে জেল থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। অতঃপর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দুতিয়ালিতে ‘পুতুল-মিতুর ছাড়াছাড়ি হলে মামলায় স্ত্রী সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের নাম থাকবে না’ এমন সমঝোতায় পুতুল স্বামী মিতুকে কাগজে-কলমে ডিভোর্স দেন। টাকা পাচার মামলা থেকে হাসিনাকন্যা রক্ষা পেলেও মিতুর পরিবারে নেমে আসে অন্ধকার যুগ। হাসিনার বেয়াই মিতুর পিতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন সুইডেনে পালিয়ে যান। আর মিতুর চাচাকে ফরিদপুর ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের আড়াই হাজার কোটি টাকা পাচার মামলায় আসামি হিসেবে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। ওই মামলায় ছাত্রলীগের দুই নেতা কারাদণ্ড হয়েছে। বর্তমানে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল দিল্লিতেই অবস্থান করলেও মা শেখ হাসিনার সঙ্গে থাকছেন না। পুতুলের একাধিক কন্যা যুক্তরাষ্ট্রে ওয়েস্টার্ন জীবনযাপনে অভ্যস্ত।
ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় ২০০২ সালের ২৬ অক্টোবর মার্কিন নাগরিক ক্রিস্টিন ওভারমায়ারকে বিয়ে করেছিলেন। তাঁদের ‘সোফিয়া’ নামের প্রাপ্তবয়স্ক একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে ক্রিস্টিন অ্যান ওভারমায়ারের মধ্যেও বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে। তাদের আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ ২০২৩ সালের দিকে সম্পন্ন হলেও ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল। সজীব ওয়াজেদ জয় বিবাহ বিচ্ছেদের কথা স্বীকার করে ২০২৫ সালের ১৪ জানুয়ারি তার ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানান যে, তার ও ক্রিস্টিন ওভারমায়ারের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, ‘ক্রিস্টিন এবং আমি আর বিবাহিত নই। আমাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে’। বিভিন্ন নথিপত্র এবং তথ্য অনুযায়ী, ক্রিস্টিনাকে ২ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিয়ে উভয়ের সম্মতিতে জয়ের বিচ্ছেদ সম্পন্ন হয়। সোফিয়া নামে তাদের কন্যা সন্তান মায়ের সঙ্গে বসবাস করেন।
ক্ষমতার অপব্যবহার করে পূর্বাচলে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্লট বরাদ্দ নেয়ার অভিযোগের এক মামলায় বাংলাদেশের আদালতে ইতোমধ্যেই পাঁচ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন হাসিনাকন্যা সিঙ্গেল মাদার সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। ২০২৫ সালে এপ্রিলে পূর্বাচল নিউ টাউন প্রকল্পে প্লট বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগে পুতুলের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করার আদেশও দিয়েছিলেন আদালত। শুধু তিনিই নন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পরে হওয়া প্লট বরাদ্দে দুর্নীতির এসব মামলায় তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ভাই সজীব ওয়াজেদ জয়, খালা শেখ রেহানা এবং তার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিকেরও নানা মেয়াদে কারাদণ্ড হয়েছে। এছাড়াও গত বছরের এপ্রিলে দুর্নীতির অভিযোগে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের নামে গুলশানে থাকা একটি ফ্ল্যাট জব্দ করার আদেশ দিয়েছিলেন আদালত। এর বাইরেও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়ের ঘটনায়ও তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে।
এদিকে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের সূচনা ফাউন্ডেশনের ১৪টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ রয়েছে। ১৪টি ব্যাংক হিসেবে মোট অর্থের পরিমাণ ৪৮ কোটি ৩৫ লাখ ৫৫ হাজার ৭৮০ টাকা। দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত এসব ব্যাংক হিসাবে জমা ছিল ৪৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিবন্ধিত সূচনা ফাউন্ডেশনের ঠিকানা হচ্ছে ধানমন্ডির পুরোনো ৩২ নম্বর রোডের ৮ নম্বর বাড়ি। এটি বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টের বিল্ডিং। দুদক সূচনা ফাউন্ডেশনের ১৪টি ব্যাংক হিসাবের বিস্তারিত তথ্য আদালতের কাছে তুলে ধরে সেগুলো অবরুদ্ধ করার আবেদন করে। দুদকের পক্ষ থেকে আদালতকে বলা হয়েছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সায়মা ওয়াজেদ তার মায়ের ক্ষমতাকে ব্যবহার করে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করে শত শত কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছেন।
এর আগে সূচনা ফাউন্ডেশনের ব্যাংক হিসাব স্থগিতের (জব্দ) নির্দেশ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা বিভাগ বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।
যুক্তরাষ্ট্রে মনোবিজ্ঞান ও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নেয়া সায়মা ওয়াজেদ স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান সূচনা ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশে অটিস্টিক শিশুদের নিয়ে সচেতনতামূলক কাজ শুরু করেন।
শেখ হাসিনা সব সময় স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানের পরিবারকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতেন। বেগম খালেদা জিয়া মেট্রিক পাস, অংকে ফেল, তারেক রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখ দেখেননি; অথচ তার ছেলেমেয়ে বিদেশে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত বড়াই করতেন। তার অলিগার্করা প্রচার করতেন শেখ হাসিনার জন্ম না হলে ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্র’ আসতো না; মানবতার মা হচ্ছেন শেখ হাসিনা। সেই শেখ হাসিনা মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। হিন্দুত্ববাদী ভারতের অনুকম্পায় বাঁচার চেষ্টা করছেন। তার তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত ছেলেমেয়েরা ডিভোর্সি। সংসারের দুখ-শান্তি বলে তাদের জীবনে কিছু নেই। ফ্যাসিস্ট হাসিনা নিজেকে এবং নিজের ছেলেমেয়েদের বাংলাদেশের মালিক হিসেবে চিন্তা করতেন; কিন্তু কি নির্মম পরিহাস ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ উপন্যাসের ‘একজন আড়ালে বসে খেলাচ্ছেন’। অহঙ্কার পতনের মূল সেটা শেখ হাসিনা ও তার ছেলেমেয়েরা হারে হারে টের পাচ্ছেন। উচ্চ শিক্ষার বড়াই করতেন; অথচ তার কন্যা সার্টিফিকেট জাল-জালিয়াতির অপরাধে চাকরি হারালো। একেই বলে ধর্মের কল বাতাসে নড়ে।