Image description

রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ও অলিগলিতে উন্নয়নকাজের নামে মাসের পর মাস চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। কোথাও ড্রেন সংস্কারের জন্য রাস্তা কেটে গভীর গর্ত করে রাখা হয়েছে, কোথাও বসানো হচ্ছে কংক্রিটের পাইপ ও আরসিসি রিং। ফলে কাদা-মাটি, ইট, খোয়া ও নির্মাণসামগ্রীতে সংকুচিত হয়ে পড়েছে রাস্তা। ফলে এসব রাস্তায় চলাচল দায়। এতে প্রতিদিনই দুর্ভোগে পড়ছেন পথচারী ও যানবাহন চালকরা। সরেজমিন রাজধানীর রামপুরা, ধানমন্ডি, মিরপুর, উত্তরা, খিলক্ষেত, খিলগাঁও, বাসাবো, পল্টন, গুলিস্তান, কাজিপাড়া, শ্যাওড়াপাড়া, মোহাম্মদপুর, গ্রিনরোড, তেজগাঁও, মহাখালী, মিরবাগ, মিরেরটেক, মগবাজার, পশ্চিম হাজীপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি দেখা গেছে। কোথাও ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, স্যুয়ারেজ পাইপলাইন স্থাপন, গ্যাস ও পানির লাইন সংস্কার এবং ভূগর্ভস্থ ক্যাবল লাইনের কাজের জন্য এ খননকাজ চালানো হচ্ছে। কোনো কোনো স্থানে কাজ শেষ হলেও রাস্তা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি। সড়কের বড় অংশজুড়ে মাটি খুঁড়ে রাখা হয়েছে। নির্মাণসামগ্রী রাখার কারণে অনেক জায়গায় যানবাহন চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়ে গেছে। খোঁড়া অংশের পাশে পর্যাপ্ত ব্যারিকেড বা সেফটি নেট নেই।

খোঁড়াখুঁড়িতে রাস্তায় চলা দায়

রাজধানীর মিরবাগের আরেক সড়কেও বেহাল দশা

অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর চরম ধীরগতি এবং উদাসীনতার কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হচ্ছে না। ফলে দীর্ঘদিন ধরে কাজ চলমান থাকায় খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ নগরবাসীকে। পশ্চিম হাজীপাড়া থেকে হাতিরঝিলের ওয়াপদা নতুন রাস্তাটি এক বছর ধরে যান চলাচল বন্ধ। রাস্তাটির দুই জায়গায় ওয়াসার ‘ঢাকা স্যানিটেশন ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্পের’ আওতায় পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নির্মাণ-পুনর্নির্মাণের জন্য রাস্তা কেটে গভীর গর্ত করা হয়েছে। চারপাশে টিন দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে। ফলে হাতিরঝিল-রামপুরার গুরুত্বপূর্ণ সড়কটিতে যান চলাচল একেবারে বন্ধ হয়ে রয়েছে। যান চলাচল কম থাকায় ও মানুষের হাঁটা চলার স্বাভাবিক পরিস্থিতি না থাকায় এ রাস্তার দুই পাশের অনেক দোকানদার ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন। স্থানীয় থাইগ্লাস ব্যবসায়ী রফিক আজাদ বললেন, এক বছর ধরে রাস্তা কেটে রাখায় ব্যবসায় লালবাতি জ্বলছে। একই অবস্থা এ সড়কের মিরবাগ মোড়েও। বাস্তা কেটে গভীর গর্ত করে মিরবাগ মোড়ে চারপাশ টিন দিয়ে ঘেরাও করে রাখা হয়েছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন কাউকে কাজ করতে দেখা যাচ্ছে না। ফলে ভোগান্তি বাড়ছে।

জানা গেছে, ওয়াসার ‘ঢাকা স্যানিটেশন ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্পের’ আওতায় দুই সিটিতে ৫০০ কিলোমিটারের বেশি সড়ক কাটার কাজ শুরু করেছে ঢাকা ওয়াসা। খিলগাঁওয়ের সিপাহিবাগ টেম্পোস্ট্যান্ড এলাকার ব্যস্ত সড়কের মাঝখানেই খোঁড়া হয়েছে গর্ত। ওয়াসা খুঁড়ে রেখেছে এ রাস্তাটি। চারপাশ টিন দিয়ে ঘেরা। বন্ধ প্রায় সব ধরনের যান চলাচল। একই অবস্থা নবাববাড়ী মোড়েও। খোলা গর্তে পড়ে নিয়মিতই আহত হচ্ছেন পথচারী। জীবনের ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করছেন স্থানীয়রা। একদিন শ্রমিক এলে, পরের ১০ দিন বন্ধ কাজ। রাতে অল্প বিস্তর আনাগোনা থাকলেও দিনে দেখা মেলে না ঠিকাদারের। কাজ কবে শেষ হবে জানেন না কেউ, বসানো হয়নি কোনো সাইনবোর্ডও। রাজধানীর মিরবাগ এলাকায় একই রাস্তা তিন দফা খোঁড়া হয়েছে। এক সংস্থা কেটে যায়, আবার আরেক সংস্থা এসে কাজ শুরু করে। মিরবাগ মোড় থেকে মিরেরটেক পর্যন্ত রাস্তার দুপাশে কংক্রিট, ইট ফেলে রাখায় রাস্তা একেবারে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। রিকশা ভ্যান তো দূরে থাক, মানুষ চলাচলই দায় হয়ে পড়েছে। বৃষ্টি হলে চরম দুর্ভোগে পড়েন এলাকাবাসী। একই অবস্থা রাজধানীর মগবাজার এলাকাতেও। রাস্তার একপাশ কেটে রাখা হয়েছে। দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও রাস্তা ঠিক করা হয়নি। ফলে যানজট বাড়ছে।

ধানমন্ডির ৮/এ লেকসাইড এলাকায় প্রায় দুই মাস ধরে ফুটপাত সংস্কারের কাজ চলছে। নির্মাণসামগ্রী পড়ে থাকায় ফুটপাত ব্যবহার করতে না পেরে অনেককে মূল সড়ক দিয়ে হাঁটতে হচ্ছে। ধানমন্ডি ১৩/এ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চলছে ড্রেনেজ উন্নয়নকাজ। মোহাম্মদপুরের ইত্যাদির মোড় ও রহিম ব্যাপারীর ঘাট এলাকাতেও একই চিত্র। স্থানীয় বাসিন্দা হাসিবুল সরকার বলেন, একটি রাস্তার কাজ শেষ না করেই প্রায় ৫০০ মিটার দূরে অন্য এলাকায় খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করা হয়েছে।

রাজধানীর উত্তরায় রাস্তায় কাজ চলার কারণে এক লেনের রাস্তা দুই লেন হিসেবে ব্যবহার করছে যানবাহন চালকরা। সড়কের কোথাও পানি জমে আছে, কোথাও ইটের খোয়া ব্যবহার করে সড়কটি কোনোমতে সচল রেখেছে। আবদুল্লাহপুর ফিলিং স্টেশনের সামনে দেখা যায়, মাটি কেটে অল্প একটু জায়গা সমান করা হয়েছে। এর সামনেই রয়েছে বিশাল একটি গর্ত। এতে পানি জমে আছে। উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টর মসজিদ থেকে ১০ নম্বর ব্রিজ পর্যন্ত সড়কটি কয়েক মাস আগেও ছিল নতুন। কিন্তু ওয়াসার পানির পাইপ বসাতে হবে এজন্য সড়কটির এক পাশ কাটা হয়েছে। পাইপ বসানো শেষ হলেও রাস্তা আর আগের অবস্থায় নেই। রাজলক্ষ্মী মার্কেটের সামনের ঢাকা মহাখালী মহাসড়কের সার্ভিস রোডটিরও একই অবস্থা। প্রায় তিন বছর ধরে অচল অবস্থায় পরে আছে।

স্থানীয় বাসিন্দা সোলাইমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, রাস্তা অচল হলে কেউ এর খোঁজ নিতে আসে না। রাস্তাও ঠিক করে না।

ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত সড়ক প্রগতি সরণি। প্রতিদিন এ সড়ক দিয়ে বিমানবন্দর, কুড়িল, নতুনবাজার, বাড্ডা, রামপুরা, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা ও পূর্বাঞ্চলের লাখো মানুষের চলাচল। বর্তমানে এ সড়কে যানজট আরও বাড়িয়ে তুলেছে এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের ইউটিলিটি হস্তান্তরের কাজ এবং একই এলাকায় ঢাকা ওয়াসার পাইপলাইন স্থাপন প্রকল্পের খোঁড়াখুঁড়ি। এতে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে সড়কটির স্বাভাবিক গতি। পুরো এলাকায় দেখা দিয়েছে এক ধরনের অচলাবস্থা। প্রতিদিন সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থেকে চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন এই সড়কে চলাচলকারী যাত্রী, চালক ও পথচারীরা।

এ ব্যাপারে নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, প্রতিটি উন্নয়নকাজের নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকা উচিত। কিন্তু দীর্ঘসূত্রতার কারণে জনভোগান্তি বাড়ছে। কাজ ঝুলিয়ে রাখার প্রবণতা বন্ধ করতে জবাবদিহি, কার্যকর তদারকি ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। তাঁর মতে, সমন্বিত ও পর্যায়ক্রমে কাজ করা হলে রাজধানীবাসীর দুর্ভোগ অনেকটাই কমানো সম্ভব।

রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির ফলে মানুষের ভোগান্তি হচ্ছে বিষয়টি স্বীকার করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, অপরিকল্পিত খোঁড়াখুঁড়ির কারণে মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে ঠিকাদারদের সর্তক করা হয়েছে। রাস্তা খুঁড়তে সড়ক আইন মানতে বলা হয়েছে। কেউ যদি সেটা না মানে তাহলে আমরা ব্যবস্থা নিব।