গ্রামীণ জনপদের যোগাযোগব্যবস্থা সহজ করতে ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া ৮২টি সেতু নির্মাণ প্রকল্প এখন বাস্তবায়ন সংকটে। পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পের চার বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ভৌত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২২ দশমিক ০৯ শতাংশ। আর মোট বরাদ্দের বিপরীতে অর্থ ব্যয় হয়েছে ১৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ। ফলে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ হওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা।
পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে শর্তও কঠিন-এই সময়ের মধ্যে যেসব সেতুর কাজ শেষ করা সম্ভব হবে না, সেগুলো প্রকল্প থেকে বাদ দিতে হবে। এরপর আর কোনো মেয়াদ বা ব্যয় বাড়ানো হবে না। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষায় প্রকল্পটির এমন চিত্র উঠে এসেছে। সিলেট, সুনামগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, পঞ্চগড়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মাগুরা, কুমিল্লা, বরিশাল, নড়াইল, পাবনা ও সিরাজগঞ্জে সরেজমিন পরিদর্শনের ভিত্তিতে তৈরি প্রতিবেদনে নকশাগত ভুল, ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় বিধিভঙ্গের তথ্য উঠে এসেছে।
বরাদ্দের ঘাটতিও বড় বাধা : ‘পল্লী সড়কে গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ (দ্বিতীয় পর্যায়)’ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। ২০২২ সালের ২২ মার্চ একনেকে অনুমোদিত প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ৪ হাজার ৫০ কোটি টাকা। মূল মেয়াদ ছিল ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত। দেশের আট বিভাগের ৩৫ জেলার ৫৮টি উপজেলায় ৮২টি সেতু নির্মাণের পাশাপাশি ৩৮ হাজার ৮০০ মিটার সংযোগ সড়ক ও ৪ হাজার ২৩৫ মিটার নদীশাসন কাজও রয়েছে প্রকল্পে। আইএমইডি বলছে, ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত ৪৬ মাসে ব্যয় হয়েছে ৫৪১ কোটি ১০ লাখ টাকা। অথচ চলতি বছরের জুন পর্যন্ত আর্থিক লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭৬ দশমিক ১১ শতাংশ। মূল মেয়াদ অনুযায়ী বাকি সময়ে ৭৭ দশমিক ৯১ শতাংশ ভৌত কাজ ও ৮৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ অর্থ ব্যয় করার কথা ছিল, যা বর্তমান গতিতে প্রায় অসম্ভব। তবে অর্থ ব্যয়ের সক্ষমতায় বড় ঘাটতি নেই। প্রথম চার বছরে ডিপিপিতে বরাদ্দ ছিল ৩ লাখ ৭ হাজার ৮২০ দশমিক ৯০ লাখ টাকা। বিপরীতে এডিপিতে প্রকৃত বরাদ্দ মিলেছে মাত্র ৬১ হাজার ৮৮০ লাখ টাকা, যা চাহিদার ২০ দশমিক ১ শতাংশ। পাওয়া অর্থের প্রায় পুরোটাই ছাড় হয়ে ব্যয় হয়েছে। অর্থাৎ প্রকল্পের ধীরগতির পেছনে বরাদ্দের ঘাটতিও গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
৮২ সেতুর পথে ৮২ রকমের বাধা : আইএমইডির পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ৩১টি সেতুর মূল নির্মাণকাজ চলছে। এগুলোর অগ্রগতি ১১ থেকে ৮৫ শতাংশ। সবচেয়ে এগিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে মহানন্দা নদীর ৪২৮ দশমিক ৬০ মিটার সেতু-ভৌত অগ্রগতি ৮৫ শতাংশ। সিলেটের গোয়াইনঘাটের লুনি নদীর সেতুর অগ্রগতি ৭৫ শতাংশ। আরও ১২টি সেতুতে চলছে পাইলিং বা প্রি-কাস্ট পাইলের কাজ। তিনটি সেতু এখনো সয়েল টেস্ট ও ডিজাইন ভেটিং পর্যায়ে, নয়টি আটকে আছে দরপত্র বা প্রশাসনিক অনুমোদনে। ঢাকার নবাবগঞ্জের দুইটি সেতুর দরপত্রই এখনো আহ্বান করা যায়নি। জামালপুরের মেলান্দহের গোলেদোবা নদীর ২৮০ মিটার সেতুর কাজ স্থানীয় আইনগত ও সামাজিক জটিলতায় বন্ধ। ১৩টি সেতুর নকশা সম্প্রতি চূড়ান্ত হয়েছে, তিনটি পুনর্নকশাধীন এবং দুইটি সেতুকে বাস্তবায়ন-অযোগ্য বিবেচনা করা হয়েছে। অন্য প্রকল্পে নির্মিত হয়ে যাওয়ায় পাঁচটি সেতু বাদ পড়েছে। চলমান ৫৬টি সেতুর মধ্যে ২১টির আর্থিক অগ্রগতি এখনো শূন্য এবং চারটির চুক্তিই হয়নি। আইএমইডির আশঙ্কা, এসব জট দ্রুত না কাটলে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ করা সম্ভব হবে না।
নকশার ভুলে আটকে গুরুত্বপূর্ণ সেতু : প্রকল্পের সংকটের বড় অংশ তৈরি হয়েছে নকশা তৈরির সময়ই। নাটোরের বড়াইগ্রাম ও ময়মনসিংহের নান্দাইলের সেতুতে বিআইডব্লিউটিএর নৌ-চলাচল নির্দেশিকা অনুসরণ না করায় ভার্টিক্যাল ক্লিয়ারেন্স জটিলতা তৈরি হয়েছে। নান্দাইলের সেতুটি এখন বাস্তবায়ন-অযোগ্য। উচ্চতা বাড়াতে গেলে পাশের বাজার ভাঙতে হবে এবং সংযোগ সড়ক নির্মাণও কঠিন হয়ে পড়বে।
মেহেরপুরে একই জায়গায় সওজও সেতু নির্মাণ করছে। ডিপিপি তৈরির আগে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্যবিনিময় না হওয়ায় তৈরি হয়েছে ‘ডুপ্লিকেশন’। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে নদীভাঙনের ঝুঁকি বিবেচনায় না নেওয়ায় তৈরি হয়েছে নতুন জটিলতা। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের ২০০ মিটার সেতুর ভার্টিক্যাল ক্লিয়ারেন্সও পুনর্বিবেচনাধীন। আইএমইডি মেহেরপুরের ১৭৫ মিটার ও নান্দাইলের ১৬০ মিটার সেতু বাদ দিয়ে সেই অর্থ নাটোর ও রাজবাড়ীর সেতুর নকশা পরিবর্তনের বাড়তি ব্যয়ে ব্যবহারের সুপারিশ করেছে।
আদালতে ঠিকাদার, সেতুতে স্থবিরতা : গাজীপুরের কালিয়াকৈর ও নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের দুটি সেতুর চুক্তি হয়েছিল ২০২৪ সালের শুরুতে। দুই বছর পরও আর্থিক অগ্রগতি যথাক্রমে ৮ ও ৩ শতাংশ। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ঠিকাদারদের ব্যাংকঋণ ও আর্থিক সক্ষমতায় ধাক্কা লাগে। চুক্তি বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হলে তাঁরা আদালতে যান। ফলে চুক্তি বাতিলও আটকে যায়। সুনামগঞ্জের ছাতকের ইসলামপুরে ৪৫ মিটার সেতুর কাজ প্রায় ৪৫ শতাংশ এগোলেও দুই পাশের সংযোগ সড়ক দুটি ভিন্ন প্রকল্পের অধীনে থাকায় সেতুটি শেষ হলেও ব্যবহার উপযোগী না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তদারকিতেও ঘাটতি, উঠেছে অডিট আপত্তি।
২০২৮-ই শেষ সুযোগ : আইএমইডি অবাস্তব ও জটিল সেতু বাদ দিয়ে লক্ষ্যমাত্রা পুনর্নিধারণ, দ্রুতগতির ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’, অতিরিক্ত জনবল ও পরামর্শক পদায়ন, অস্বাভাবিক দর যাচাই, ঠিকাদারের বিরুদ্ধে জরিমানা বা চুক্তি বাতিল এবং অডিট আপত্তি নিষ্পত্তির সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি এলজিইডি, সওজ, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বিআইডব্লিউটিএর সমন্বয়ে জিআইএসভিত্তিক সমন্বিত প্রকল্প তালিকা তৈরির কথাও বলা হয়েছে।