ঢাকার চারপাশের নদীগুলোকে দখলমুক্ত করে নগরবাসীর জন্য পরিবেশবান্ধব বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা আট বছরেও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়নি। নদী চারটি হলো— বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদী।
পরিকল্পনার মধ্যে ছিল নদীর তীর রক্ষা, ওয়াকওয়ে (হাঁটার পথ), বসার স্থান, ইকোপার্ক ও সবুজায়ন করা। প্রকল্পটির বাস্তবায়ন মেয়াদ আবারও বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। এর আগে প্রকল্পটির মেয়াদ তিন দফা এবং ব্যয় দুই দফা সংশোধন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। ২০১৮ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া ‘বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীর তীরভূমিতে পিলার স্থাপন, তীররক্ষা, ওয়াকওয়ে (হাঁটার পথ) ও জেটিসহ আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণ (দ্বিতীয় পর্যায়)’ শীর্ষক প্রকল্পটির প্রাথমিক প্রাক্কলিত ব্যয় ছাড়িয়ে সর্বশেষ ব্যয় দাঁড়িয়েছে এক হাজার ২৭৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরেও প্রকল্পটির জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালকের দাবি, প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি এরই মধ্যে ৯৩ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে এবং অবশিষ্ট কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শেষ হবে। তবে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকল্পটির ৯৩ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে—প্রকল্প পরিচালকের এমন দাবির বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করে বলেন, শুধু অবকাঠামোর নির্মাণকাজ শেষ হলেই প্রকল্পের সফলতা নিশ্চিত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যাবে না। নির্মিত ওয়াকওয়ের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ, দখলমুক্ত রাখা এবং নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
সরেজমিন চিত্রও বলছে ভিন্ন কথা। বিভিন্ন এলাকায় নির্মিত ওয়াকওয়ে অবৈধ দখল, অননুমোদিত গাড়ি পার্কিং, নির্মাণসামগ্রী ও বর্জ্য ফেলার কারণে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সেই সঙ্গে দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রায় ৫২ কিলোমিটার ওয়াকওয়ের মধ্যে জনবহুল মিরপুর বেড়িবাঁধ এলাকার ছয় কিলোমিটার অংশে সোলার লাইট স্থাপনের কাজও এগোচ্ছে ধীরগতিতে। ফলে প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি সেগুলোর ব্যবহার, সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে।
গত বুধ ও শুক্রবার প্রকল্প এলাকার তুরাগের তালতলা, প্রত্যাশা ব্রিজ ও সাহেব আলী মাদ্রাসা, বালু নদী এলাকার হরদি বাজার, তেরমুখ ব্রিজ এলাকা সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, কোথাও খণ্ড খণ্ড ভাবে কাজ হলেও বিস্তীর্ণ অংশে নির্মাণকাজের তেমন দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এ ছাড়া কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
তুরাগের তালতলা এলাকার বাসিন্দা লোকমান মাদবর বলেন, প্রত্যাশা ব্রিজ এলাকায় খণ্ড খণ্ডভাবে কিছু কাজ হয়েছে। ডমিনোর পরিত্যক্ত ভবন এলাকা থেকে কালুমিয়া ঘাট পর্যন্ত অংশের কাজ কয়েক বছর ধরে বন্ধ রয়েছে।
আরেক বাসিন্দা রাফি আহমেদ বলেন, প্রত্যাশা ব্রিজ এলাকায় সম্প্রতি কিছু কাজ হয়েছে। তবে বড় ধরনের নির্মাণকাজ বলতে দুটি বসার বেঞ্চ স্থাপন এবং প্রায় ১০০ গজ অংশে টাইলস ও রেলিংয়ে রং করার কাজই দেখা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীর প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ ও দখলমুক্ত করার চেয়ে যেখানে তুলনামূলক সহজে কাজ করা যায়, কোথাও কোথাও সেসব অংশকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, যেসব জায়গায় মাটি রয়েছে, সেখানে সহজেই সীমানা পিলার ও ওয়াকওয়ে নির্মাণের চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে নদীর প্রকৃত সীমানা এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির দাবি নিয়ে বিরোধ তৈরি হচ্ছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা এককালীন এবং মাসোহারাভিত্তিক অর্থ নিচ্ছে দখলদারদের কাছ থেকে।
এমন বিরোধের পাশাপাশি ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ ঘিরেও কয়েকটি এলাকায় নদীর সীমানা পিলার সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। দৌড় এলাকার ২৪ নম্বর পিলার থেকে ভাটুলিয়া হয়ে আব্দুল্লাহপুরের অবৈধ মাছ বাজার পর্যন্ত প্রায় ৪ দশমিক শূন্য ৮ কিলোমিটার অংশে এমন পরিবর্তন দেখা গেছে। এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক আবু জাফর মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ কবিরের দাবি, এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের সঙ্গে এ বিষয়ে সমন্বয় রয়েছে। তুরাগের সাহেব আলী মাদ্রাসা এলাকায় নির্মিত ওয়াকওয়ের একটি অংশ এখন পরিবহন শ্রমিকদের ময়লা ফেলার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে।
সরেজমিন দেখা যায়, মনজিল পরিবহন জায়গা ভাড়া নিয়ে হাঁটার পথেই (গ্যারেজ ও পার্কিং) বাস মেরামতের কাজ করছে। সেই সঙ্গে ডিপোর বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ওয়াকওয়ে এবং নদীতে ফেলা হচ্ছে। যে কোনো মুহূর্তে এ অংশ নদীতে তলীয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আব্দুল্লাহপুর থেকে দৌড় পর্যন্ত অংশে উচ্ছেদ অভিযান সম্পন্ন না করেই কোথাও কোথাও ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে নির্মিত অবকাঠামো দখলমুক্ত রাখা এবং জনসাধারণের ব্যবহার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
পাশাপাশি দীর্ঘদিন ওয়াকওয়ের একটি অংশ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড (এনডিই) নির্মাণকাজের জন্য ব্যবহার করছে। দ্বিতীয় প্রত্যাশা ব্রিজের নির্মাণস্থলের রড কাটার মেশিনসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী সেখানে রাখা হয়েছে। নির্মাণস্থলে উপস্থিত এনডিইর নিরাপত্তা কর্মকর্তা নাইম ইসলাম কালবেলাকে বলেন, জায়গাটি খালি থাকায় নির্মাণকাজের জন্য তারা ব্যবহার করছেন। এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির প্রকৌশলী সৌরভের মন্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রকল্পের এসব বাস্তবতার বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক আবু জাফর মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ কবির বলেন, প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি বর্তমানে প্রায় ৯৩ শতাংশ। এখন মূলত ফিনিশিং, রং করা এবং বাকি থাকা বিভিন্ন কাজ শেষ করার পর্যায়ে রয়েছে। তিনি বলেন, প্রকল্পটির মেয়াদ কয়েক দফা বাড়াতে হয়েছে। বর্তমানে এর মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত। এ সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করা সম্ভব হবে এবং নতুন করে সময় বা অর্থের প্রয়োজন হবে না।
প্রকল্প পরিচালক বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি ছিল স্থানীয় বিরোধ ও মামলা। কোথাও নদীর তীর বা ফোরশোরের জায়গা নিয়ে মামলা হয়েছে, কোথাও স্থানীয়রা কাজে বাধা দিয়েছেন। এসব কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, টঙ্গী নদীবন্দর থেকে পাগার পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার অংশে নোমান গ্রুপের একটি মামলার কারণে প্রায় দুই বছর কাজ আটকে ছিল। মামলা নিষ্পত্তির পর সেখানে উচ্ছেদ ও নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে।
প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ছিল প্রায় ৮৪৮ কোটি টাকা। সংশোধনের পর ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৪২৭ কোটি টাকা। সর্বশেষ ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২৭৫ কোটি টাকা। ব্যয় বৃদ্ধির কারণ হিসেবে নকশা ও কাজের পরিধি পরিবর্তনের কথা বলেন প্রকল্প পরিচালক। তার ভাষ্য, কোনো কোনো জায়গায় প্রাথমিকভাবে সাধারণ তীররক্ষা কাজের পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে সেখানে আরসিসি রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ করতে হয়েছে। এতে কাজের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
প্রত্যাশা ব্রিজ এলাকায় ওয়াকওয়ের সংযোগ ও নির্মাণকাজে বাধার বিষয়ে তিনি বলেন, সেখানে মামলা থাকায় কাজ ও সংযোগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নির্মিত ওয়াকওয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগও তারা খতিয়ে দেখবেন। পানির উচ্চতার কারণেও বর্তমানে কিছু কাজ সীমিত রয়েছে বলে জানান তিনি। প্রকল্প এলাকায় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের দখল থাকলে সেগুলোও উচ্ছেদের আওতায় আসবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক। ডমিনোসহ বড় প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে তিনি বলেন, গত দুই বছরে বড় ধরনের উচ্ছেদ কার্যক্রম হয়নি। তবে সরকারি নির্দেশনা পেলে এসব স্থাপনাও সরাতে হবে। তিনি একাধিকবার সংশ্লিষ্ট বন্দর বিভাগকে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেছেন বলেও জানান।
সার্বিক বিষয়ে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) সভাপতি ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, ঢাকার চারপাশের নদীর তীর রক্ষায় ওয়াকওয়ে নির্মাণ সরকারের একটি ভালো উদ্যোগ। তবে এ উদ্যোগ টেকসই করতে হলে শুধু বিআইডব্লিউটিএ নয়, সিটি করপোরেশন থেকে শুরু করে স্থানীয় জনগণকেও দায়িত্ব নিতে হবে। কাজ শেষ হওয়ার পর সরকারের সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থা, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং জনগণকে এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিতে হবে। তিনি বলেন, বালু নদী অংশে এখনো কোনো কাজ হয়নি। ফলে পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। একই সঙ্গে নদীর তীরে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা দ্রুত উচ্ছেদ করতে হবে।