বদলি বাণিজ্য, টেন্ডার কমিশন আর সনদ জালিয়াতি নিয়ে যেন অনিয়মের এক রাজত্ব গড়ে উঠেছে গণপূর্ত অধিদপ্তরে। এ রাজত্বের কেন্দ্রে রয়েছেন অধিদপ্তরের বিতর্কিত প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী। ভুয়া পিএইচডি সনদ ব্যবহার, জ্যেষ্ঠতার নিয়ম ভেঙে পদ বাগানো ও বেইলি রোডের ৪৬ জনের প্রাণহানির ঘটনায় বিতর্কিত ভবন গ্রিন কোজি কটেজের নকশা অনুমোদনে সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকার পরও তিনি রয়েছেন প্রধান প্রকৌশলীর গুরু দায়িত্বে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি অধিদপ্তরে শক্ত এক সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন, যার মাধ্যমে চালানো হয় বদলির খেলা। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে লটারির মাধ্যমে বদলির নিয়ম করা হলেও বাক্সে আগে থেকেই পছন্দের প্রার্থীর নাম রাখা এবং স্বজনপ্রীতি ও কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে প্রকৌশলীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
এমনকি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ আনা ও নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি ঠেকানোর নামেও ফান্ড সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে। এক প্রকল্পের একাধিক প্যাকেজ দেখিয়ে বাড়তি বিল উত্তোলন এবং নানা বিতর্কিত কাণ্ডের পাশাপাশি সাজানো মামলায় সহকর্মীদের ফাঁসানো ও অস্ট্রেলিয়ায় ১১ বছর প্রবাস জীবন কাটিয়েও পদোন্নতি বাগিয়ে নেওয়ার মতো অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি সাংবাদিকদের প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করে প্রধান প্রকৌশলী নিজের অপরাধের পাহাড় আড়াল করার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তথ্য বলছে, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে সহকারী ও উপসহকারী প্রকৌশলীকে লটারির মাধ্যমে বদলি করা হয়। কিন্তু গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপবিভাগীয় প্রকৌশলীদের বদলিতে প্রশ্ন ওঠে সেই স্বচ্ছতা নিয়েই। বিশেষ করে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ কেন্দ্র করে প্রকৌশলীরা তিন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন বলে জানা গেছে। এর মধ্যে একটি গ্রুপে রয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলীরা, যারা লটারির মাধ্যমে বদলি চান না। আরেকটি গ্রুপে আছেন উপবিভাগীয় প্রকৌশলীরা, যাদের স্বজনপ্রীতি ও বৈষম্য সৃষ্টি করে বদলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তৃতীয় গ্রুপটিতে রয়েছেন সহকারী ও উপসহকারী প্রকৌশলীরা, যে গ্রুপের সবাইকে বদলি করা হয়েছে ঢাকার বাইরে। বিশেষ করে যেসব প্রকৌশলী মাত্র কয়েক মাস আগে বদলি হয়েছেন ও দীর্ঘদিন পর ঢাকায় যোগদান করেছিলেন, কয়েক মাসের মাথায় তাদের আবার ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় বদলি করা হয়েছে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।
৫ আগস্টের পর বাগিয়ে নেন প্রধান প্রকৌশলীর পদ, গড়েন সিন্ডিকেট: জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের ডিঙিয়ে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব নেন মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী। এরপরই নিজের পছন্দের লোকজন নিয়ে গড়ে তোলেন সিন্ডিকেট। এ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তিনি বদলি বাণিজ্য, পদোন্নতি, টেন্ডার কমিশন আদায় ও ভাগবাটোয়ারা এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে কাজ আনতে ফান্ড সংগ্রহ ও ঘুষ আদান-প্রদান করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সিন্ডিকেটের সদস্যরা হলেন সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সারোয়ার জাহান, ঢাকা সার্কেল-১ থেকে সদ্য বদলিকৃত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বদরুল আলম খান এবং ঢাকা সার্কেল-২ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. আবু নাসের চৌধুরী।
তথ্য বলছে, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী বদলি শেষেই নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি হওয়ার কথা এবং প্রধান প্রকৌশলী নির্বাহী প্রকৌশলী পর্যন্ত বদলি করতে পারবেন। কিন্তু সেই ক্ষমতাবলে নির্বাহী প্রকৌশলীদের তিনি বদলি করতে চাচ্ছেন না, যা উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এবং সহকারী ও উপসহকারী প্রকৌশলীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছে। এ ছাড়া অনেক প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে এক প্রকল্পের একাধিক প্যাকেজ দেখিয়ে কাজের চেয়ে অতিরিক্ত টাকা বিল উত্তোলন, কাজ না করে বিল প্রদান, বিতর্কিত নারীঘটিত ঘটনা, ব্ল্যাক মেইল, দলীয় কারণ, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকার পরও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন না প্রধান প্রকৌশলী; বরং এসব ঘটনার কারণে যারা সাময়িক চাকরিচ্যুত হয়েছেন, তাদের বহালে নানা কৌশল করেছেন তিনি।
বদলির লটারিতে স্বজনপ্রীতি-বৈষম্য: বদলির লটারিতে বৈষম্যের শিকার প্রকৌশলীরা বলছেন, লটারির বদলির কার্যক্রম শুরুর আগেই পরিচিত ও তদবির করা অনেকের নাম রাখা হয় ঢাকার বাক্সে। স্বজনপ্রীতিতে নিজ জেলায় স্বপদে রাখতেও করা হয় আর্থিক লেনদেন। এ ছাড়া আরও সাতজনকে কোনো লটারির আওতায় আনা হয়নি, যাদের মধ্যে তিনজন সিভিল ও চারজন ই/এম বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী রয়েছেন।
তথ্য অনুযায়ী, আবু তাহের মোহাম্মদ খাইরুল বাশারকে রংপুর থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ উপবিভাগে; গোলাম রাব্বিকে লালমনিরহাট থেকে রক্ষণাবেক্ষণ উপবিভাগ ও ছাইফুল ইসলামকে নারায়ণগঞ্জ থেকে হাইকোর্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বদলি করা হয়েছে। এ এস এম সাখওয়াত ইসলাম ও রেজাউল করিম মিঠু ফের ঢাকায় পদায়ন পান। এ এস এম সাখওয়াত ইসলাম এর আগে রাজারবাগ গণপূর্ত উপবিভাগ-১, গণপূর্ত রেলওয়ে ডাইভারশন উপবিভাগ, শেরে-বাংলা উপবিভাগে ছিলেন; কিন্তু তাকে মিরপুর উপবিভাগে বদলি করা হয়েছে, অথচ তার বাড়ি বগুড়া। ফরিদপুরের রেজাউল করিম মিঠু মতিঝিল গণপূর্ত উপবিভাগ, শেরে-বাংলা উপবিভাগ-৩, মহাখালী উপবিভাগ, ঢাকা গণপূর্ত উপবিভাগ-৭ হয়ে পদায়ন পেয়েছেন ঢাকা সম্পদ উপবিভাগে। উপবিভাগীয় প্রকৌশলী জয় চৌধুরীর নাম চট্টগ্রাম রক্ষণাবেক্ষণ উপবিভাগ-১-এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে উঠলেও নিজ জেলার অজুহাত দিয়ে তাকে লটারি পরিবর্তন করে অন্যত্র বদলি করা হয়। অথচ ঢাকা নিজ জেলা হওয়া সত্ত্বেও মো. মেহবুবুর রহমান ও মোহাম্মদ জহিরুল ইসলামকে যথাক্রমে পিলখানা গণপূর্ত উপবিভাগ ও রমনা গণপূর্ত উপবিভাগ-৩-এ পদায়ন করা হয়। এর আগে মেহবুবুর রহমান ঢাকায় দায়িত্ব পালন করেন। অথচ প্রকৌশলী বরকত মজুমদার ও শেখ মোহাম্মদ এনামুল হকের নিজ জেলা ঢাকা বিভাগে হওয়া সত্ত্বেও তাদের যথাক্রমে চুয়াডাঙ্গা ও চট্টগ্রামে বদলি করা হয়েছে। অন্যদিকে, ময়মনসিংহের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আনোয়ার হোসাইনের নাম একই সঙ্গে লটারিতে ফরিদপুর ও নরসিংদী জেলায় ওঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে ফরিদপুর জেলায় পদায়ন করে বদলি আদেশ জারি করা হয়। চাকরি জীবনে কখনোই ঢাকার বাইরে চাকরি করেননি প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান সাদ। উত্তরা উপবিভাগ, ঢাকা গণপূর্ত উপবিভাগ-৩, ঢাকা গণপূর্ত উপবিভাগ-৬ (হাইকোর্ট) থেকে তেজগাঁও উপবিভাগে পদায়ন করা হয়েছে। মো. মামুনুর রশিদের নিজ জেলা রংপুর হলেও তিনি পাঁচ বছরের অধিককাল সময় সাভার গণপূর্ত উপবিভাগে কর্মরত ছিলেন। মাঝে তাকে চট্টগ্রামে বদলি করা হলেও বছর না ঘুরতেই তিনি গাজীপুর উপবিভাগে পদায়ন পান। লটারিতে অনিয়মের সুযোগ কাজে লাগিয়ে আবার ঢাকার উপবিভাগ পদায়ন হয় তার। নেত্রকোনার ইজাজ আহমেদ খানের লটারি ময়মনসিংহ বিভাগের আওতায় হওয়ার কথা থাকলেও লটারির আগে তাকে ঢাকার বাক্সে স্থানান্তর করা হয় এবং শেরেবাংলা নগর উপবিভাগ-৯ থেকে ধানমন্ডিতে পদায়ন পান।
এ বিষয়ে সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বদলির নানা অভিযোগ তুলে স্মারকলিপি দেন কিছু প্রকৌশলী। লটারি স্বচ্ছ না হওয়ার পাশাপাশি অনিয়ম ও কারসাজির অভিযোগও আনা হয় স্মারকলিপিতে।
এ প্রকৌশলীদের অভিযোগ, উপসহকারী প্রকৌশলী থেকে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পর্যন্ত বদলির ক্ষেত্রে নিজ জেলা বাদ দিয়ে নিজ নিজ প্রশাসনিক বিভাগের মধ্যে লটারির মাধ্যমে পদায়নের কথা। কোনো বিভাগে কর্মকর্তার সংখ্যা বেশি হলে অতিরিক্ত কর্মকর্তাকে অপেক্ষাকৃত কম কর্মকর্তা থাকা বিভাগে দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকা থেকে ঢাকায় পোস্টিং এড়িয়ে চলার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ‘অতিরিক্ত কর্মকর্তা’ দেখিয়ে লটারিতে আগে থেকেই নির্দিষ্ট প্রকৌশলীদের নাম ঢাকা জেলার বাক্সে ঢোকানো হয়। পরে ওই বাক্স থেকে তাদের নাম উঠিয়ে পোস্টিং দেওয়া হয় ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে। অভিযোগকারী এক প্রকৌশলীর ভাষ্য, পছন্দের পোস্টিং পাইয়ে দিতে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ নেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, বদলি প্রক্রিয়ায় ঢাকা বিভাগের জন্য দুটি লটারির বাক্স রাখা হয় ‘ঢাকা জেলা’ ও ‘ঢাকা বিভাগ’ নামে। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, ঢাকা জেলার বাক্সে শুধু ঢাকা জেলার বা সংশ্লিষ্ট যোগ্য কর্মকর্তাদের থাকার কথা হলেও সেখানে দেশের বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তাদের নাম কীভাবে এলো। লটারির আগে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সিভিলের ঢাকা জেলার বাক্সে ৪১ জনের নাম যুক্ত করার অভিযোগও উঠেছে।
বদলি বা পদায়নের বিপরীতে অর্থ লেনদেন: তথ্য বলছে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের অন্তত ৬৫ প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাকে পছন্দের কর্মস্থলে বদলি বা পদায়নের সুযোগ করে দিতে ১০ লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থ লেনদেনের ঘটনা ঘটেছে। এসব লেনদেনের মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী বা আওয়ামী লীগপন্থি হিসেবে পরিচিত কিছু কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে পুনর্বাসনের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। চলতি বছরের ৩ মার্চ পৃথক কয়েকটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এক দিনেই গণপূর্ত অধিদপ্তরের অর্ধশতাধিক নির্বাহী প্রকৌশলী, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ও উপসহকারী প্রকৌশলীকে বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়। এত বড় পরিসরে বদলি-পদায়নের আগে মন্ত্রণালয়কে অবহিত না করার অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক প্রকৌশলীকে বদলির সিদ্ধান্তের পেছনে প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তা ও প্রক্রিয়াগত নিয়ম যথাযথ অনুসরণ করা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। পরে খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে তলব করে গণপূর্তমন্ত্রী এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চান বলে জানা গেছে।
তবে প্রধান প্রকৌশলীর ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হওয়ায় ৫ ও ৮ মার্চ পৃথক আদেশে আগের গণবদলির অধিকাংশই বাতিল করা হয় বলে জানা গেছে। এরপরও ছোট পরিসরে বদলি-পদায়নের ক্ষেত্রে অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার অভিযোগ ওঠে। খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, জালিয়াতি, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন এবং দেশে-বিদেশে অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ জমা পড়েছে।
ভুয়া পিএইচডি সনদ ব্যবহার: নথি বলছে, ভুয়া পিএইচডি সনদ দেখিয়ে উচ্চতর শিক্ষা ছুটিতে প্রেষণ ভোগের ঘটনায় বিভাগীয় মামলা হয় গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে। বিভাগীয় তদন্তে জালিয়াতি ও অসদাচরণের বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ার পর তিনি দোষ স্বীকার করলেও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সাবেক সদস্য প্রয়াত সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর (যাকে তিনি ফুফু ডাকতেন) প্রভাবে নামমাত্র শাস্তি দেন তৎকালীন গণপূর্ত সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকার। লঘুদণ্ড বদলে এক বছরের জন্য বেতন বৃদ্ধি বন্ধের সাজা দেওয়া হয়। এর তিন বছরের মধ্যে খালেকুজ্জামান হন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং তার পর মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে পদোন্নতি বাগিয়ে নিয়ে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে বনে যান তিনি। এর মধ্য দিয়ে এক বছরে দুটি পদোন্নতি বাগিয়ে নেন। পরে আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য হিসেবে গোপালগঞ্জ গণপূর্ত জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পান। তবে ৫ আগস্টের পর ভোল পাল্টে বনে যান জামায়াতের বিশ্বস্ত সদস্য। সাবেক গণপূর্ত সচিব নজরুল ইসলামের হাত ধরে পাঁচজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীকে ডিঙিয়ে জামায়াতপন্থি হিসেবে পুরস্কার পান প্রধান প্রকৌশলীর (রুটিন দায়িত্ব) দায়িত্ব। এ দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তার বিরুদ্ধে টেন্ডার ও বদলি বাণিজ্যসহ নানা অনিয়মে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে এবং স্থবিরতা দেখা দেয় গণপূর্ত অধিদপ্তরের কাজে।
মন্ত্রণালয়ের নথি বলছে, জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের ডিঙিয়ে পদোন্নতির সংক্ষিপ্ত তালিকার শীর্ষে মো. খালেকুজ্জামান নিজের নাম দেন। বাকি জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের প্রতিযোগী ভেবে তাদের বিরুদ্ধে জুলাই গণহত্যার সাজানো মামলার তথ্য জমা দেওয়া হয় সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডে (এসএসবি)। একই সঙ্গে যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে তাদের গ্রামে এসব মামলার নথি পাঠানো হয়, যাতে মামলার বিষয়টি সামনে আসে। এ ছাড়া ১৯৮৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চাকরিজীবনে সরকারি প্রেষণ ও ছুটির সুযোগে খালেকুজ্জামান প্রায় ১১ বছর অস্ট্রেলিয়ায় প্রবাস জীবন কাটিয়েছেন। এর মধ্যে পদোন্নতির সুযোগ তৈরি হলেই দেশে ফিরে আসেন। বিভিন্ন অনিয়মের কারণে বিভাগীয় মামলা হলেও সাজেদা চৌধুরীর লিখিত সুপারিশে তিন বছরের মধ্যেই শাস্তির বদলে একই বছরে পান দুই দফায় পদোন্নতি।
সাজানো মামলায় সহকর্মীদের ফাঁসানোর অভিযোগ: পদোন্নতির সংক্ষিপ্ত তালিকায় থাকা জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানান, প্রতিযোগী মনে করে তালিকা থেকে সিনিয়রদের স্থায়ীভাবে বাদ দিতে জুলাই অভ্যুত্থানের পর রামপুরা থানার একটি মামলার আসামির তালিকায় কৌশলে ৪৭ প্রকৌশলীর নাম ঢোকানো হয় এবং মামলার নথি এসএসবি কমিটিতে জমা দেওয়া হয়। গত ৬ জুলাই গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় পাঁচজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর নামে তালিকা। অধিদপ্তরের দাপ্তরিক জ্যেষ্ঠতার তালিকায় শীর্ষে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আবুল খায়ের (ঢাকা জোন) ও উৎফল কুমার দের থাকলেও তিন নম্বরে থাকা খালেকুজ্জামান চৌধুরী নিজের নাম তালিকার ১ নম্বরে দেন। মো. শহিদুল আলম (স্বাস্থ্য উইং) এবং ড. মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন হায়দার (প্রেষণে মহাপরিচালক, এইচআরআই) নামও তালিকায় দেওয়া হয়।
গ্রিন কোজি কটেজের নকশা অনুমোদনে সম্পৃক্ততা: রাজধানীর বেইলি রোডে ২০২৪ সালের শুরুতে ভয়াবহ আগুনে পুড়ে যায় গ্রিন কোজি কটেজ। সাততলার এ বাণিজ্যিক ভবনে ওই অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছিল ৪৬ জন; দগ্ধ ও আহত হয় আরও ১৩ জন। প্রাণহানির ঘটনা পর বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে ভবনটি নকশার অনুমোদন নিয়ে। পরবর্তীকালে তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে ২০১১ সালে এ ভবনের নকশার অনুমোদন দিয়েছিলেন রাজউকের তৎকালীন অথরাইজড অফিসার মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীসহ কয়েকজন। কিন্তু ওই রেস্টুরেন্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের বছর না পেরোতেই ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী পদ বাগিয়ে নেন সেই খালেকুজ্জামান।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে আরও উঠে আসে, গ্রিন কোজি কটেজে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ভিড় করতেন, তবে ভবনটিতে কোনো জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা ছিল না। এমনকি ভবনে চলাচলের সিঁড়িও ছিল না। জরুরি নির্গমন পথ থাকলে বা সিঁড়িটা প্রশস্ত হলে এত প্রাণহানি হতো না। অভিযোগ আছে, তদন্ত প্রতিবেদনে যেন তাকে জড়ানো না হয়, এজন্য বিভিন্নভাবে তদবির করেন তিনি। যদিও অথরাইজড অফিসার হিসেবে এ ভবনের অনুমোদনের পুরো দায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।
কোনো অনিয়ম হয়নি, দাবি খালেকুজ্জামানের: নানা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী বদলিতে কোনো অনিয়ম হয়নি। বিষয়টি মন্ত্রণালয় জানে। নির্বাহী প্রকৌশলীদের লটারিতে বদলি করা হবে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, পূর্ত অধিদপ্তরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো নির্বাহী প্রকৌশলীরা। লটারি নয়, মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে বদলি হবে। অন্য সিনিয়র প্রকৌশলীদের প্রতিযোগী ভেবে ছাত্র হত্যা মামলার নথি মন্ত্রণালয় পাঠানোর বিষয়ে জানতে চাইলে খালেকুজ্জামান চৌধুরী বলেন, আমার কোনো প্রতিযোগী নেই।
যা বলছেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সচিব: গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সচিব মো. ওবায়দুর রহমান কালবেলাকে বলেন, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী বদলিতে অনিয়ম করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি করা হবে না, এ কথা বলার দায়িত্ব প্রধান প্রকৌশলীকে দেওয়া হয়নি।
প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার দৌড়ে যারা রয়েছেন, তাদের প্রতিযোগী ভেবে তাদের বিরুদ্ধে হওয়া ছাত্র হত্যা মামলার নথি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এবং বিভিন্নভাবে তাদের হয়রানির অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সচিব বলেন, গণপূর্ত অধিদপ্তরে একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে লাগে। বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন লেখালেখি হচ্ছে, আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। খালেকুজ্জামান ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী হয়েছেন গত বছর। তালিকা অনুযায়ী তিনি তিন নম্বরে আছেন। তার সিনিয়র রয়েছে। প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার জন্য গ্রেড-ওয়ান হওয়ার বিষয়ে যাচাই-বাছাই করার জন্য এসএসবিতে পাঠানো হয়েছে। তালিকা অনুযায়ী যিনি থাকবেন, তাকেই বানানো হবে।