নির্বাচনি ইশতেহারে বিএনপির প্রশংসনীয় উদ্যোগের মধ্যে অন্যতম ছিল খাল খনন প্রকল্প। সরকার গঠনের পর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৫ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ৬ মাসে প্রায় ১২শ কিলোমিটার খাল খনন করা হয়েছে। তবে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও কতিপয় নেতার অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে খাল খনন প্রকল্পটি শুরুতেই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। প্রকল্পে ভাগ বসিয়েছেন আওয়ামী সমর্থিত ইউপি সদস্য এবং চেয়ারম্যানরাও। সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী, অন্তত ৫০ শতাংশ কাজ শ্রমিকের হাতে সম্পন্ন করার বাধ্যতামূলক শর্ত থাকলেও তা পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। অধিকাংশ এলাকায় এক্সকেভেটর (ভেকু) দিয়ে খাল খনন করা হয়েছে। শুভংকরের ফাঁকি দিয়ে চলছে অর্থ লোপাটের আয়োজন। বেশ কয়েক স্থানে খালের অস্তিত্ব নেই, তবুও দেওয়া হয়েছে বরাদ্দ। অনেক এলাকায় প্রাক্কলন অনুযায়ী খালের গভীরতা ও প্রশস্ততা না বাড়িয়ে কেবল পাড়ের ঘাস চেঁছে এবং আগাছা পরিষ্কার করে পুরো কাজ সমাপ্ত দেখানো হয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে এমন কাজের কারণে খাল খননের পরই ভরাট হয়ে যাচ্ছে। তড়িঘড়ি করে খননের কারণে পাড় ধসে হুমকিতে পড়েছে বসতবাড়ি ও সড়ক। অনেক স্থানে খাল খনন প্রকল্প কৃষকের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে দুর্নীতি ঢাকতে সরকারি কোষাগারে টাকা ফেরতের নামে চলছে আই ওয়াশ (Eye wash বা লোকদেখানো কাজ)। ইতোমধ্যে প্রায় ৮০ উপজেলা থেকে বরাদ্দের অব্যয়িত টাকা কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে। কোষাগারে টাকা ফেরতের আড়ালেও রয়েছে শুভংকরের ফাঁকি। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট অনেক এলাকা থেকে অনিয়ম-দুর্নীতির খবর পাওয়া গেছে। ভুয়া শ্রমিক দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা ইতোমধ্যে লুটে নেওয়া হয়েছে। বেশ কয়েক স্থানে ভুয়া শ্রমিকের নামে ব্যাংক হিসাব খুলে বরাদ্দের টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের যোগসাজশে ভাগবাঁটোয়ারা করে নেওয়া হয়েছে টাকা। এর পাশাপাশি সরকারদলীয় স্থানীয় নেতারা প্রকল্পে ভাগ বসানোয় প্রশংসনীয় এ উদ্যোগটি ভেস্তে যেতে বসেছে। নামমাত্র খননের কারণে প্রান্তিক কৃষক কতটুকু সুফল ভোগ করবেন, এ নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। স্থানীয় প্রতিনিধিদের সরেজমিন পাঠানো খবর অনুযায়ী এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
সাশ্রয় দেখাতে টাকা ফেরত যেন শুভংকরের ফাঁকি : রাজশাহী থেকে তানজিমুল হক জানান, বাগমারায় দুই খাল পুনঃখননে ঘটেছে নজিরবিহীন লুটপাট। ভয় দেখিয়ে প্রকল্পের সুবিধাভোগী শ্রমিকদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে স্বাক্ষর করা চেকের পাতা। এরপর ব্যাংক থেকে উত্তোলন করে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে সিংহভাগ টাকা। মাত্র আধা কিলোমিটার খাল খনন করে তিন কিলোমিটার কাগজে-কলমে দেখিয়ে লুট করা হয়েছে বরাদ্দের মোটা অঙ্কের টাকা। লুটপাট আড়াল করতে স্বচ্ছতা প্রমাণে সাশ্রয় দেখিয়ে কিছু টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে। এটিকে ‘শুভংকরের ফাঁকি’ বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। শ্রমিকদের প্রাপ্য মজুরি থেকে বঞ্চিত করার ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও নেওয়া হয়নি ব্যবস্থা। অভিযোগ উঠেছে, এ লুটপাটের সঙ্গে জড়িত বাগমারার প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তা (পিআইও), রাজনৈতিক দলের নেতা, জনপ্রতিনিধিসহ সংঘবদ্ধ একটি শক্তিশালী চক্র। আর এ চক্রটি নানা অনিয়ম-দুর্নীতি আর প্রতারণার কৌশল নিয়ে দুটি খাল পুনঃখননে সবমিলিয়ে হাতিয়ে নিয়েছে কোটি টাকারও বেশি। ঝিকরা ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক দ্বীন ইসলাম বলেন, ‘ফাঁকা চেকে শ্রমিকদের স্বাক্ষর নিয়ে অন্তত অর্ধকোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে ১২ ও ২৩ জুলাই বাগমারার ইউএনও এবং জেলা প্রশাসকের কাছে শ্রমিকরা লিখিত অভিযোগ দিলেও প্রতিকার পাননি।
এদিকে শুভডাঙ্গা ইউনিয়নেও সাত কিলেমিটার খাল খননের পরিকল্পনা থাকলেও বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার কারণে সেটি সম্ভব হয়নি। সেখানে কাগজে-কলমে তিন কিলোমিটার খাল খনন করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে দেখা গেছে ভিন্নচিত্র। আধা কিলোমিটার খাল খনন করে আত্মসাৎ করা হয়েছে টাকা। খাল খনন প্রকল্পে সাশ্রয় দেখাতে টাকা ফেরতেও রয়েছে ‘শুভংকরের ফাঁকি’। ঝিকরা ইউনিয়নে খননে এক্সকেভেটরের (ভেকু) জন্য বরাদ্দ ছিল ৯০ লাখ ৭১ হাজার ৮৪৩ টাকা। সেখানে এক্সকেভেটর কাজ করেছে বড়জোর ছয় থেকে সাতটি। প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটারে এক্সকেভেটর বাবদ বরাদ্দ ছিল সাড়ে ১২ লাখ টাকা। অথচ এক্সকেভেটর মালিকদের দেওয়া হয়েছে মাত্র ছয় থেকে সাত লাখ টাকা। শুধু খননেই সাশ্রয় হওয়ার কথা ২৮ থেকে ৩০ লাখ টাকা। এছাড়া শ্রমিক বাবদ সাশ্রয় হওয়ার কথা ৪৮ থেকে ৫০ লাখ টাকা। অথচ পিআইও সাশ্রয় দেখিয়েছেন মাত্র ১৮ লাখ ৭৪ হাজার ৮০০ টাকা। এ প্রকল্পে অন্তত ৭০ লাখ থেকে ৭৫ লাখ টাকা তছরুপ করা হয়েছে।
বরাদ্দে নয়ছয়, যোগসাজশে আত্মসাৎ : যশোর থেকে তৌহিদ জামান জানান, এ জেলায় খাল খনন কর্মসূচিতে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। খাল নির্বাচনে ব্যর্থতা ও পরিমাপে অসামঞ্জস্যসহ বেশকিছু অনিয়ম ছাড়াও টাকা ফেরতের ঘটনা ঘটেছে। যশোর সদর, শার্শা, বাঘারপাড়া, মণিরামপুর ও কেশবপুরে ১৮০ দিনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ত্রাণ ও পুনর্বাসন অধিদপ্তরের আওতায় এই তিন উপজেলার ছয়টি খাল সম্পূর্ণরূপে খনন করতে না পারায় বড় অঙ্কের টাকা ফেরত গেছে। কেশবপুরে ব্যাসডাঙ্গা খাল খননের বরাদ্দ অর্থের বেশির ভাগই প্রকল্প চেয়ারম্যান এবং ইউপি চেয়ারম্যান আলাউদ্দীন আলা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যেনতেনভাবে খনন করে ২২ লাখ ৭২ হাজার ৪৪৩ টাকা উত্তোলন করেন প্রকল্প চেয়ারম্যান। শুধু এক্সকেভেটর ড্রাইভার জয়নাল গাজীকে ৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা এবং শ্রমিকদের মজুরি বাবদ আড়াই লাখ টাকা কাজের বিল দিয়েছেন। অবশিষ্ট টাকা ভাগবাঁটোয়ারা হয়েছে। একই উপজেলার বাঁশবাড়িয়া খালটি খননেও অনিয়ম হয়েছে। মনিরামপুরে নকশা পরিকল্পনা অনুযায়ী খাল পুনঃখনন করতে না পেরে ১৪ লাখ ৭৮ হাজার ৬৫৮ টাকা ফেরত পাঠানো হয়েছে।
ভুয়া ব্যাংক হিসাবে শ্রমিকের টাকা আত্মসাৎ : নোয়াখালী প্রতিনিধি মনিরুজ্জামান চৌধুরী জানান, সোনাইমুড়ীর শিমুলিয়া-গজারিয়া দুই কিলোমিটার খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে শ্রমিকের পরিবর্তে এক্সকেভেটর (ভেকু) দিয়ে খাল খনন করা হয়েছে। ভুয়া শ্রমিকের নামে ব্যাংক হিসাব খুলে বরাদ্দের টাকা উত্তোলন করে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া খালের পাড়ের মাটি বিক্রি এবং বৃক্ষরোপণ না করারও অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সরকারি সাহায্যের কথা বলে নদনা ইউনিয়নের কালুয়াই, বোরপিটসহ কয়েকটি গ্রামের নারীদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি দিয়ে সোনাইমুড়ী সোনালী ব্যাংক পিএলসি শাখায় ব্যাংক হিসাব খোলা হয়। হিসাব খোলার পর চেক বইয়ের পাঁচটি করে পাতায় হিসাবধারীদের স্বাক্ষর নিয়ে তা নিজেদের কাছে রেখে দেন পিআইও অফিসের কর্মচারীরা। শ্রমিক হিসাবে তালিকাভুক্ত আছিয়া, রহিমা, আনোয়ারা বেগমসহ কয়েকজন জানান, তাদের এককালীন পাঁচ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়ার কথা বলে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছিল। পরে তারা জানতে পারেন, সরকারি বরাদ্দ থেকে তাদের হিসাবে ২১ হাজার ৫০০ টাকা করে জমা হয়েছে। কিন্তু স্বাক্ষর করা চেকের মাধ্যমে সেই টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে।
বোরপিট গ্রামের শাহেদা আক্তার জানান, ১৭ মে ব্যাংক থেকে চেকবই সংগ্রহের পর তাদের আবার পিআইও অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চেকবইয়ের পাঁচটি পাতায় স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়া হয়। কয়েকজন নারী ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর দিতে আপত্তি জানালে তাদের কোদাল-ঝুড়ি হাতে ছবি তোলার কথা বলা হয়। এমন অভিযোগ আরও শ্রমিকের। প্রকল্প সভাপতি ও নদনা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজগর হোসেন সোহেল জানান, তিনি ২৯ জন শ্রমিকের নাম দিয়েছেন। পাঁচবাড়িয়া ও হাটগাঁও থেকেও শ্রমিক নেওয়া হয়েছে। তবে শ্রমিকের পরিবর্তে এক্সকেভেটর দিয়ে খনন সম্পন্ন হয়েছে বলে স্বীকার করেন তিনি। সরেজমিন শিমুলিয়া-গজারিয়া দুই কিলোমিটার খাল ঘুরে দেখা যায়, কোথাও প্রকল্পের বরাদ্দ ও বাস্তবায়নসংক্রান্ত তথ্যসংবলিত সাইনবোর্ড নেই। ভেকু দিয়ে খাড়া করে মাটি কাটায় খালের পাড়ের বিভিন্ন স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। খালের দুই পাড়ে বৃক্ষরোপণের কথা থাকলেও তা দৃশ্যমান নয়। প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মেশকাতুর রহমান দাবি করেন, প্রকল্পের তথ্যসংবলিত সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছিল, পরে সেটি চুরি হয়ে গেছে। ১১৯ জন শ্রমিক দিয়ে কাজ করানো হয়েছে এবং শ্রমিকরা হাজিরা অনুযায়ী টাকা পেয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি। খালের পাড়ে লাগানো গাছের চারা ছোট হওয়ায় সেগুলো প্রতিবেদকের চোখে পড়েনি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কাগজে শ্রমিক, বাস্তবে এক্সকেভেটর : নওগাঁ থেকে আব্বাস আলী জানান, অপরিকল্পিতভাবে খাল পুনঃখনন ও বরাদ্দ অর্থ সঠিকভাবে ব্যয় না করে টাকা ফেরত পাঠানো হয়েছে। আবার কাগজে-কলমে শ্রমিক দেখিয়ে এক্সকেভেটর (ভেকু) দিয়ে খাল খনন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের রাজস্ব শাখার তথ্যমতে, জেলার ১১টি উপজেলার মধ্যে ১০টিতে ১৬টি খাল পুনঃখনন করা হয়েছে। যেসব খাল পুনঃখনন করা হয়েছে, সবই পুরোনো। ৫-৭ বছরে ভরাট হয়ে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। খালগুলো কোনো নদীর সঙ্গে সংযোগ নেই। বর্ষা শুরু হওয়ায় পানির মধ্যে খনন করতে হয়েছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আশেকুর রহমান বলেন, প্রতিটি খাল পুনঃখননের আগে সংশ্লিষ্ট উপজেলা থেকে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে। পরিপত্রে ৫০ ভাগ শ্রমিক ও ৫০ ভাগ এক্সকেভেটর দিয়ে খনন করার কথা আছে। কাজ শেষে ১ কোটি ৩৯ লাখ ৮৫ হাজার ৮ টাকা বেঁচে গেছে।
ভুয়া শ্রমিক দেখিয়ে অর্থ লোপাট : জয়পুরহাটের কালাই প্রতিনিধি এটিএম সেলিম সরোয়ার জানান, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বাস্তবায়নাধীন ‘টেকসই ক্ষুদ্রাকার পানিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় ১ কোটি ৮২ লাখ টাকার কানমনা-হারাবতী খাল পুনঃখনন প্রকল্পে লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করছে স্থানীয় ‘কানমনা-হারাবতী পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতি লিমিটেড’। কানমনা-হারাবতী খালের রোয়াইর স্লুইসগেট থেকে বানদীঘি গ্রাম পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার অংশ পুনঃখননে কাগজে-কলমে ১৮০ জন দিনমজুর প্রতিদিন ঘাম ঝরিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে খালের মাটিতে একজন শ্রমিকেরও পা পড়েনি। সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী, অন্তত ৫০ শতাংশ কাজ শ্রমিকের হাতে সম্পন্ন করার বাধ্যতামূলক শর্ত থাকলেও তা পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। দরিদ্রদের কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত করে ৬টি এক্সকেভেটরে চালানো হয়েছে খননকাজ। প্রাক্কলন অনুযায়ী খালের গভীরতা ও প্রশস্ততা না বাড়িয়ে কেবল পাড়ের ঘাস চেঁছে এবং আগাছা পরিষ্কার করা হয়েছে। নথিপত্রের সঙ্গে বাস্তবে কাজের বিশাল গরমিল পাওয়া গেছে।
কাগজে শতভাগ বাস্তবায়ন, বাস্তবে ভিন্ন : ফেনী থেকে নুরুজ্জামান সুমন জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় বাস্তবায়িত সাতটি খাল পুনঃখনন প্রকল্প নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। কোথাও খালের পাড়ধসে বসতঘর ও সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কোথাও নির্ধারিত গভীরতা ও প্রস্থ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আবার কাগজে হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থানের কথা থাকলেও বাস্তবে খননকাজে ব্যবহার করা হয়েছে এক্সকেভেটর বা ভেকু। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে প্রকল্পের অর্থব্যয় ও কাজের গতি নিয়ে। ফেনী জেলায় সাতটি খাল পুনঃখননে ১২ কোটি ২ লাখ ৭৫ হাজার ৪৭৮ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও এর মধ্যে ৭ কোটি ৮১ লাখ ৫১ হাজার ৩৪৩ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ বরাদ্দের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই অব্যয়িত রয়েছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার হিসাবে, প্রকল্পগুলোয় ব্যয় হয়েছে ৪ কোটি ২১ লাখ ২৪ হাজার ১৩৫ টাকা। অথচ কাগজে-কলমে অধিকাংশ প্রকল্পেই কাজের অগ্রগতি দেখানো হয়েছে ৮৬ থেকে ১০০ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, খাল পুনঃখননে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় যথাযথ জরিপ, নকশা ও প্রকৌশলগত পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি।
খননের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন : মাগুরা প্রতিনিধি আবু বাসার আখন্দ জানান, মাগুরায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর সদর উপজেলার কাপাশহাটি খালের ১ দশমিক ৭ কিলোমিটার পুনঃখনন করতে ব্যয় করেছে ৭ লাখ ৩৪ হাজার ৮০০ টাকা। অথচ পাশের গ্রামেই কামারপাড়া খালের ১ কিলোমিটার অংশ পুনঃখননে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের ব্যয় ২৩ লাখ ৯৭ হাজার ২৬৬ টাকা। এখানেই শেষ নয়, জেলার মহম্মদপুরে ১ কিলোমিটার খাল খননে ৩৮ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় দেখানো হয়েছে। এভাবে বিভিন্ন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের মাধ্যমে জেলার ১৯ কিলোমিটার ১০৩ মিটার খাল পুনঃখননে সরকারি অর্থ নয়ছয়ের খবর পাওয়া গেছে। কোথাও বরাদ্দের বড় অংশ অব্যয়িত দেখিয়ে ফেরত দেওয়া হলেও তুলনামূলক বেশি ব্যয়ে খাল পুনঃখনন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সরেজমিন দেখা যায়, পাউবো খননকাজে ঠিকাদারের মাধ্যমে মূলত এক্সকেভেটর (ভেকু) ব্যবহার করেছে। অন্যদিকে এলজিইডি প্রকল্প কমিটির মাধ্যমে এক্সকেভেটর ও শ্রমিক ব্যবহার করে নির্ধারিত সময়ের আগেই কাজ শেষ করেছে। তবে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের আওতায় একই কর্মসূচিতে শ্রমিক ও এক্সকেভেটর ব্যবহার করেও কোনো কোনো খালে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় তুলনামূলকভাবে কয়েক গুণ হয়েছে। কাজের মান নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন।
কোষাগারে টাকা ফেরতের আড়ালে আত্মসাৎ : বরগুনার আমতলী প্রতিনিধি মো. জসিম উদ্দিন সিকদার জানান, এ উপজেলায় খাল খনন কর্মসূচিতে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এক বছর আগের কাটা খাল পুনরায় খনন করে সদ্য বিদায়ি আমতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ জাফর আরিফ চৌধুরী অর্ধকোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, ইউএনও শ্রমিকদের মজুরি না দিয়ে নাম কুড়াতে সরকারি কোষাগারে টাকা ফেরতের আড়ালে আত্মসাৎ করেছেন। এছাড়া খাল খননে ৩৯৭ জন হতদরিদ্র শ্রমিকের কাজ করার কথা থাকলেও বাস্তবে করেছেন ১৫৯ জন। ওই শ্রমিকরা এখনো তাদের দৈনিক মজুরির পুরো টাকা পাননি। খাল খনন শেষে ইউএনও সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য দুই পাড়ে বিভিন্ন প্রজাতির চারা রোপণ করেছেন; কিন্তু বাস্তবে অস্তিত্ব নেই। এক বছর আগে কেওয়াবুনিয়া খালের এক পাশ কেটে রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। ওই খালই এ বছর পুনরায় খনন করা হয়েছে।
এক্সকেভেটর দিয়ে খাল খনন, বিলে ২৯৭ শ্রমিকের নাম : রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি প্রতিনিধি আনোয়ার হোসেন জানান, খাল খননের ২টি প্রকল্পে দরিদ্র শ্রমিকদের দিয়ে খননের কথা থাকলেও হয়েছে উলটোটা। এক্সকেভেটর দিয়ে খালের দুই পাশ ড্রেজিং করিয়ে ২৯৭ শ্রমিকের নাম তালিকায় বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। খালের প্রস্থ ও গভীরতা না বাড়িয়ে কেবল পাড়ের ঘাস চেঁছে এবং আগাছা পরিষ্কার করে কাজ সম্পন্ন করার অভিযোগ উঠেছে। সরেজমিন খামার মাগুড়া গ্রামের প্রকল্প এলাকায় গিয়ে জনসাধারণের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খালের গভীরতা সামান্য বাড়লেও প্রস্থ বাড়েনি। খালপাড়ে ৪০০ বৃক্ষরোপণ করা হলেও অধিকাংশ গাছের বেষ্টনী নেই। এছাড়া অনেক জায়গায় রোপণকৃত গাছের অস্তিত্বই নেই। ১৭ লাখ ১৩ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরতের বিষয়টি লোকদেখানো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দুর্নীতি আড়াল করতে টাকা ফেরতের কৌশল নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দরিদ্রদের কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত করে ভেকু দিয়ে চালানো হয়েছে খননকাজ। তবে সে কাজও নকশা অনুযায়ী করা হয়নি।
অপরিকল্পিত খাল খনন : টাঙ্গাইল থেকে জাফর আহমেদ জানান, কালিহাতীতে অপরিকল্পিত খাল খনন ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। পরিকল্পনা, কারিগরি নকশা ও বাস্তব প্রয়োজন বিবেচনা না করে খাল খনন করায় কাঙ্ক্ষিত সুফলের পরিবর্তে কৃষিজমি, বসতভিটা ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সূত্রমতে, ২৫ লাখ ৭৯ হাজার ১৪৭ টাকা ব্যয়ে উপজেলার ভিয়াইল কুমর্সী বিলের মাঝে খাল খনন করার বরাদ্দ আসে। খাল খননে অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় ৬ লাখ ২৬ হাজার ৫২৬ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, খালের তলদেশ খনন না করে শুধু খালের মাটি ফসলি জমির ওপর রাখা হয়েছে। খনন না করে শুধু বাড়ানো হচ্ছে প্রশস্ততা। বৃষ্টির পানি শুকিয়ে গেলে মাটিধসে আবার খালেই পড়বে।
খননের অল্পদিনেই ভরাট হয়ে যাচ্ছে খাল : রাঙামাটি থেকে সুশীল প্রসাদ চাকমা জানান, খননের কিছুদিন যেতে না যেতে অল্পদিনেই ভরাট হয়ে যাচ্ছে খালগুলো। খননে মানা হয়নি নিয়ম, গভীরতা একেবারে কম। ২ মিটার বা সাড়ে ৬ ফুট গভীরে খননের কথা বলা হলেও এর চেয়েও আরও কম দেখা গেছে। পানি রয়েছে ৩-৪ ফুট। খননকাজে শ্রমিকের বদলে বেশি ব্যবহার করা হয়েছে এক্সকেভেটর। এতে হালকাভাবে সরানো হয়েছে খালের মাটি। এছাড়া প্রকল্পে নয়ছয়ের অভিযোগও উঠেছে। নির্ধারিত মেয়াদে ব্যয় করা যায়নি বরাদ্দের সব টাকা। শ্রমিক অনুপস্থিতির কারণ উল্লেখ করে ফেরত পাঠানো হয়েছে বরাদ্দের সাড়ে ৮ কোটির মধ্যে ৫১ লাখ টাকা।
খালের অস্তিত্ব নেই, তবুও বরাদ্দ : চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ প্রতিনিধি প্রবীর চক্রবর্তী জানান, এ উপজেলায় ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ৫ কিলোমিটার খাল খনন সম্পন্ন হয়েছে। তবে খালের অস্তিত্ব না থাকলেও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খালের অস্তিত্ব বিলীন ও বর্ষায় পানি উঠে যাওয়ায় ৭ লাখ টাকা ফেরত দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। এদিকে পাইকপাড়া উত্তর ইউনিয়ন অংশে খাল খনন নিয়ে অনিয়ম ও অর্থ খরচে অসংগতির অভিযোগ উঠেছে। ওই ইউনিয়নের অংশে পড়া খাল খননের জন্য বরাদ্দের ৩৩ লাখ টাকার সঠিক ব্যবহার হয়নি। পূর্ব জয়শ্রী ব্রিজ থেকে ভাওয়াল ভূঁইয়াবাড়ি পর্যন্ত খাল খনন-এই নামে প্রকল্পে নথি অনুযায়ী এতে ১৬৭ জন শ্রমিকের কর্মসংস্থানের কথা উল্লেখ রয়েছে, যা বাস্তবে ছিল না। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আবু তাহের পাটোয়ারী।