ডেঙ্গু সংক্রমণ এখন আর ক্যালেন্ডারের পাতার হিসাব মানছে না। মৌসুমি রোগটি এখন বছরজুড়েই ভয় আর আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। এ বছরও ব্যতিক্রম নয়। বছরের প্রথম কয়েক মাস পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বর্ষা শুরুর পর দ্রুত বদলে যেতে থাকে চিত্র। গত জুন মাসে বাড়তে থাকা সংক্রমণ জুলাইয়ে পায় গতি। আর আগস্টে এসে রীতিমতো ঊর্ধ্বমুখী। চলতি সেপ্টেম্বরের প্রথম চার দিনের প্রতিদিনই হাজারের বেশি ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছে হাসপাতালে। ফলে পুরো সেপ্টেম্বর মাস নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম উদ্বেগ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গতকাল শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৪০ হাজার ছাড়িয়েছে। মারা গেছে ১১১ জন। চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছে ৩৭ হাজার ১৯৩ জন। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৭২৬ জন। অন্যদিকে, গত কয়েক দিনের ধারাবাহিকতায় আগস্টেই মৃত্যুর সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাওয়া মাসভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী—জানুয়ারিতে ২, ফেব্রুয়ারিতে ২, মে মাসে ১, জুনে ১৩, জুলাইয়ে ৩৬ এবং আগস্টে ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ শুধু আগস্টেই মৃত্যু হয়েছে ৪৩ জনের, যা চলতি বছরের মোট মৃত্যুর বড় অংশ।
রোগতত্ত্ব ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু মোকাবিলা হবে সব পক্ষের জন্য পরীক্ষার মাস। এ মাসের শুরুতে যদি এডিসের প্রজননস্থল ধ্বংস, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ, হাসপাতালের প্রস্তুতি এবং জনসম্পৃক্ততা জোরদার করা যায়, তাহলে সম্ভাব্য বড় ঢেউ ঠেকানো সম্ভব হবে। রোগটি মোকাবিলায় ব্যবস্থা নিতে আরও দেরি হলে সেপ্টেম্বরের শেষ ভাগ এবং অক্টোবরে বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নতুন সংকটের মুখে পড়বে।
এ অবস্থায় সরকার ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সেই পুরোনো ধারাই অবলম্বন করছে। এতে সীমিত পরিসরে মশক নিধন হলেও ডেঙ্গুতে প্রাণহানি ও রোগের কর্মক্ষমতা নষ্ট প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। ডেঙ্গু মোকাবিলায় জরুরি একটি সমন্বিত কর্মকৌশল প্রণয়ন। একই সঙ্গে জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশজুড়ে একযোগে কাজ করা সম্ভব হলে আগামী কয়েক বছরে কলকাতার আদলে এ দেশেও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। নয়তো প্রতি বছর মশার উপদ্রপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়বে সংক্রমণ আর প্রাণহানি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, শুধু সেপ্টেম্বর নয়, আগামী অক্টোবরেও ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ার যথেষ্ট ঝুঁকি রয়েছে। গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, আগস্টের পর রোগী ও মৃত্যুর চাপ বাড়তে থাকে। এই চাপ সেপ্টেম্বর, অক্টোবর এমনকি নভেম্বর পর্যন্ত চলতে থাকে।
এবারও আগস্টে সংক্রমণ ও মৃত্যুর যে ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে, সেটি উদ্বেগের। কোথায় এডিস মশার ঘনত্ব বাড়ছে এবং কোন এলাকায় রোগী বাড়ছে—এ দুটি বিষয় একসঙ্গে নজরদারিতে আনতে হবে। মশক নিধনে কমিউনিটিকে যুক্ত করা প্রয়োজন। ভলান্টিয়ারের মাধ্যমে গোটা কমিউনিটিকে সচেতন করার পাশাপাশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে হবে।
এ ছাড়া ডেঙ্গু শনাক্তের পরীক্ষা বিনামূল্যে ব্যবস্থা করতে হবে। এতে করে সাধারণ মানুষ জ্বর হলেও দ্রুত পরীক্ষা করবে এবং জটিলতা দেখা দিলে দ্রুতই হাসপাতালে যেতে পারবে।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু রাজধানীকে গুরুত্ব দিলে হবে না; ডেঙ্গু এখন দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। তাই জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও রোগী শনাক্ত, চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে স্থানীয় জনগণকেও সম্পৃক্ত করতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের মূল কাজ হাসপাতালের বাইরে—বাড়ি, পাড়া-মহল্লা ও কর্মস্থল থেকেই শুরু করা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, আগস্টের শেষ দিকে ডেঙ্গুর সংক্রমণ যেভাবে বেড়েছে, তাতে সেপ্টেম্বর নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও জমে থাকা পানিতে এডিস মশার প্রজনন—এ তিনটি বিষয় সংক্রমণ বৃদ্ধির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সবচেয়ে জরুরি হলো দ্রুত প্রজননস্থল ধ্বংস এবং স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর মশক নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা। শুধু কীটনাশক ছিটিয়ে কিংবা হাসপাতালের শয্যা বাড়িয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া এডিস নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
একই সঙ্গে ঢাকার বাইরে চিকিৎসাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে। কারণ আক্রান্ত বাড়লেও ঢাকায় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা তুলনামূলক ভালো থাকায় মৃত্যু কম হচ্ছে। কিন্তু জেলা পর্যায়ে সেই সক্ষমতার ঘাটতি থাকলে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হতে পারে।
সেপ্টেম্বরেই কেন চূড়ায় ওঠে ডেঙ্গু সংক্রমণ ডেঙ্গুর মৌসুমি প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে সাধারণত আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে ডেঙ্গুর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়। কেননা, বর্ষায় বৃষ্টির পানি বিভিন্ন পাত্র, ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, ড্রেন, পরিত্যক্ত টায়ার ও অন্যান্য স্থানে জমে থাকে। বৃষ্টি থামার পর এসব জমে থাকা পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তার বাড়ে। ফলে বৃষ্টির পরপরই নয়, বরং কিছুটা সময়ের ব্যবধানে সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সেপ্টেম্বরকে শুধু আরেকটি মাস হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জুলাই-আগস্টে তৈরি হওয়া প্রজননস্থল থেকে উৎপন্ন এডিস মশার বিস্তার এবং মানুষের মধ্যে এরই মধ্যে চলমান সংক্রমণ—দুটি বিষয় একসঙ্গে সেপ্টেম্বরের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
এ ছাড়া গত তিন বছরের ডেঙ্গু পরিসংখ্যানও এ বছরের সেপ্টেম্বর নিয়ে উচ্চঝুঁকির বার্তা দিচ্ছে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে রেকর্ড ৭৯ হাজার ৫৯৮ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়। একই সময়ে ৩৯৬ জনের মৃত্যু হয়। ওই বছরই সেপ্টেম্বর ছিল সংক্রমণ ও মৃত্যুর সর্বোচ্চ মাস। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর প্রকোপ তুলনামূলক কম থাকলেও সংক্রমণ মৌসুমের শেষ দিকে গড়ায় এবং বছরজুড়ে রোগী ১ লাখ ছাড়িয়ে যায়। ওই বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয় ৫৭৫ জনের। গত বছর সেপ্টেম্বর ভয়াবহ রূপ নেয়। মাসটিতে ১৫ হাজার ৮৬৬ জন হাসপাতালে ভর্তি এবং ৭৬ জনের মৃত্যু হয়। মাসের হিসাবে, ওই বছরের সর্বোচ্চ সংক্রমণ ও মৃত্যুর রেকর্ড।
আগস্টের গতি, শঙ্কা বাড়াচ্ছে সেপ্টেম্বরে চলতি বছরের প্রবণতা বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, মূলত জুনের পর থেকেই পরিস্থিতি দ্রুত বদলেছে। জুলাইয়ে মৃত্যু ৩৬ জনে ওঠে, আগস্টে তা বেড়ে হয় ৪৩। অর্থাৎ এক মাসে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে সাতজন। অন্যদিকে আগস্টের শেষদিকে এবং সেপ্টেম্বরের শুরুতে দৈনিক হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যাও হাজারের ওপরে অবস্থান করছে। ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক দিনে ১ হাজার ২৫২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল, যার মধ্যে মৃত্যুবরণ করে চারজন। পরদিন নতুন ভর্তি আরও বেড়ে হয় ১ হাজার ৫১২ জন। যদি দৈনিক শনাক্ত ও হাসপাতালে ভর্তির বর্তমান ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তাহলে মাসের হিসাবে মোট রোগীর সংখ্যা আগস্টকে ছাড়িয়ে যাওয়ার শঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
কালবেলার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও তাই সেপ্টেম্বরকে চলতি বছরের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ সংক্রমণের মাস হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
নতুন সেরোটাইপও বাড়াচ্ছে উদ্বেগ ২০২৬ সালের পরিস্থিতিতে আরেকটি বিষয়ও বিশেষভাবে উদ্বেগ তৈরি করছে—সেটি হলো ডেঙ্গু ভাইরাসের সেরোটাইপের পরিবর্তন। বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে—২০২৩ থেকে ২০২৫ সালে ডেন-২-এর আধিপত্যের পর ২০২৬ সালে ডেন-৩-এর বিস্তার দেখা যাচ্ছে। একজন ব্যক্তি আগে এক ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে থাকলে পরবর্তী সময়ে ভিন্ন সেরোটাইপে সংক্রমিত হলে কিছু ক্ষেত্রে গুরুতর ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হলেই গুরুতর রোগ হবে—এমন সরল সিদ্ধান্তও বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক নয়।
জ্বর কমলেই বিপদ শেষ নয় ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো—দেরি না করা। ডেঙ্গুর গুরুতর পর্যায় অনেক সময় জ্বর কমার সময় শুরু হয়। তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, অতিরিক্ত দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, প্রস্রাব কমে যাওয়া বা অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব; এসব উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার বিকল্প নেই। ২০২৫ সালের তথ্য বিশ্লেষণেও ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ক্ষেত্রে হাসপাতালে দেরিতে আসার বিষয়টি বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছিল।