দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বর্তমানে গভীর সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। একদিকে মশাবাহিত ডেঙ্গুর প্রকোপ, অন্যদিকে সংক্রামক রোগ হামের বিস্তার—এ দুইয়ে মিলে দেশের স্বাস্থ্য খাতে তৈরি হয়েছে দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ডেঙ্গু বর্তমানে এখন নির্দিষ্ট মৌসুম বা শহরের সীমানায় আটকে নেই। ফলে দেশজুড়ে এর প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। একই সমান্তরালে শহরের পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণেও লাগাম টানা যাচ্ছে না। ফলে প্রতিদিনই হাম ও ডেঙ্গুতে মৃত্যু ও আক্রান্তের হার জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। দ্বিমুখী ব্যাধির বিস্তার রোধে সমন্বিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তোলার পাশাপাশি সরকারকেও নিতে হবে জরুরি সিদ্ধান্ত। হাম ও ডেঙ্গুর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন লিখেছেন মাহমুদুল হাসান
হাম নিয়ন্ত্রণে বিশ্বজুড়ে সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে যে বাংলাদেশের নাম আসত সবার আগে—সেখানেই চলতি বছর হামে প্রাণ হারিয়েছে প্রায় এক হাজার শিশু। দেশের অভিভাবকদের কাছে হাম বর্তমানে এক আতঙ্কের নাম। এ রোগ প্রতিরোধে রয়েছে কার্যকর টিকা। কিন্তু দীর্ঘ সময় টিকাদান কর্মসূচির অভাব এবং রাজনৈতিক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকারের টিকা সংগ্রহের পদ্ধতি পরিবর্তনের ফলে হাম প্রতিরোধে তৈরি হয়েছে বড় ঘাটতি। বলা চলে অন্তর্বর্তী সরকারের গাফিলতির চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে ছোট্ট শিশুদের। এদিকে বর্তমান সরকার নির্বাচিত হওয়ার পরপরই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দেশব্যাপী লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ১০৩ শতাংশ বেশি জরুরি টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনার দাবি করলেও থামছে না হামের বিস্তার। প্রতিদিন হাম ও এর উপসর্গে ভুগে গড়ে ৫ থেকে ৬ শিশুর মৃত্যু হচ্ছে। একই সময়ে হামজনিত সমস্যা নিয়ে প্রতিদিন প্রায় এক হাজারের বেশি শিশু ভিড় করছে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, অবস্থার উন্নতি শিগগিই হচ্ছে না। হামের প্রাদুর্ভাব দেশজুড়ে থাকবে আরও কয়েক মাস।
গত ১৫ মার্চ থেকে নিয়মিত হাম পরিস্থিতির প্রতিবেদন প্রকাশ শুরু করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। দৈনিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, গত সাড়ে পাঁচ মাসের বেশি সময়েও সংক্রমণের ধারায় স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ আসেনি। বরং জুন ও জুলাইয়ে কিছুটা কমার পর আগস্ট মাসে ফের বেড়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত সর্বশেষ হিসাব বলছে, দেশে হাম উপসর্গে মোট মৃত্যু দাঁড়িয়েছে ৯৮৭ জনে। এর মধ্যে পরীক্ষায় নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যু ৯৯ এবং সন্দেহজনিত মৃত্যু ৮৮৮। একই সময়ে সন্দেহজনক রোগী শনাক্ত হয়েছে ১ লাখ ৬২ হাজার ২৬২ জন। এ ছাড়া পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম শনাক্ত ১৯ হাজার ৫৬৭ জনের। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ৪২ হাজার ৪৫৩ জন; সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৩৫০ জন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু একবার জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এ জন্য নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি প্রয়োজন। পাশাপাশি কমিউনিটি লেভেলে রোগটির বিস্তার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে হবে এবং টিকার আওতায় নিয়ে আসতে হবে দেশের অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে। এ জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের তালিকা তৈরি করে টিকা প্রয়োগের পাশাপাশি দ্রুত পরিস্থিতির পরিবর্তনের জন্য অন্তত ১৫ বছর বয়সী শিশুদের টিকার আওতায় আনতে হবে।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, দেশে হামের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু টিকাদানের ঘাটতির ফল নয়; এর পেছনে দীর্ঘদিনের ইমিউনিটি গ্যাপেরও বড় ভূমিকা আছে। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে কোনো শিশু বাদ পড়লে কয়েক বছর পর সেই শিশুর পাশাপাশি একই বয়সী আরও অনেক টিকাবঞ্চিত শিশু মিলে একটি বড় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী তৈরি হয়। তখন হাম ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায়। জাতীয় পর্যায়ে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু একটি ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। প্রকৃতপক্ষে কত শিশু টিকার বাইরে রয়েছে, তা নির্ভুলভাবে শনাক্ত করে তাদের টিকার আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিও শক্তিশালী করতে হবে। পাশাপাশি টিকার সরবরাহে কোনো ঘাটতি রাখা যাবে না। সেই সঙ্গে মাইক্রো লেভেলে খুঁজে খুঁজে শিশুদের টিকার আওতায় আনতে হবে। এবং ৫ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত শিশুদের হাম প্রতিরোধে টিকার আওতায় নিয়ে আসতে হবে।
তিনি বলেন, হামে মৃত্যুর ক্ষেত্রে অপুষ্টি, নিউমোনিয়া ও অন্যান্য জটিলতাও বড় ভূমিকা রাখে। তাই টিকার পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত শনাক্তকরণ, যথাযথ চিকিৎসা ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ জরুরি। একই সঙ্গে এত বেশি মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে প্রতিটি সন্দেহজনক শিশুমৃত্যুর ডেথ রিভিউ বা হামজনিত মৃত শিশুর হাম শনাক্তকরণ পরীক্ষা করতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, হাম নিয়ন্ত্রণে এখন আর শুধু টিকা যথেষ্ট নয়। প্রথম কাজ হলো প্রকৃত শিশু জনসংখ্যার নির্ভুল তালিকা তৈরি করা। দ্বিতীয়ত, বাদ পড়া শিশুদের ঘরে ঘরে খুঁজে টিকা দিতে হবে। তৃতীয়ত, ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের জন্য সংক্রমণ প্রতিরোধে পরিবার ও হাসপাতালভিত্তিক বিশেষ ব্যবস্থা করা। একই সঙ্গে মাস্ক, হাত ধোয়া, আক্রান্ত শিশুকে দ্রুত আলাদা রাখা, হাসপাতালের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত পরীক্ষা এবং শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত অক্সিজেন-আইসিইউ নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, হামের গাফিলতি খুঁজতে রাজনৈতিক দোষারোপের বাইরে গিয়ে একটি স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন। কখন টিকার ঘাটতি তৈরি হলো, কে সতর্ক করেছিল, কেন ক্রয়প্রক্রিয়া বদলানো হলো, কেন সময়মতো টিকা আসেনি, প্রকৃত টিকা কভারেজ কত এবং এত শিশুর মৃত্যুতে চিকিৎসা ব্যবস্থার কোথায় ব্যর্থতা ছিল—প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর প্রকাশ্যে আসা জরুরি। কারণ হাম এমন একটি রোগ, যার বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা বহু বছর ধরেই রয়েছে।
অভিযোগের তীর অন্তর্বর্তী সরকারের দিকে বর্তমান হাম সংকটের ভিত্তি তৈরি হয়েছে কয়েক বছরের টিকাদান ঘাটতিতে। কভিড-১৯ মহামারি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিয়মিত টিকাদানে বিঘ্ন এবং দীর্ঘ সময় ধরে বড় আকারের ক্যাচ-আপ কর্মসূচি না হওয়া—সব মিলিয়ে বিপুল সংখ্যক শিশু টিকার সুরক্ষার বাইরে চলে গেছে। ফলে চলতি বছর হাম সংক্রমণের সংকট তীব্র হয়েছে। এদিকে হাম সংকট ঘনীভূত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে টিকা সংগ্রহের প্রক্রিয়া পরিবর্তন নিয়ে। দীর্ঘদিন বাংলাদেশ ইউনিসেফের মাধ্যমে হাম-রুবেলাসহ বিভিন্ন টিকা সংগ্রহ করত। কিন্তু ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহের পরিবর্তে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। অভিযোগ রয়েছে, এ পরিবর্তনের ফলে ক্রয়প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত এবং নিয়মিত টিকার সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়। এর ঝুঁকি সম্পর্কে সরকারকে আগেই সতর্ক করেছিল ইউনিসেফ। ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি পরে জানিয়েছেন, টিকার সম্ভাব্য সংকট নিয়ে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে পাঁচ থেকে ছয়টি চিঠি দেওয়া হয়েছিল এবং এ বিষয়ে প্রায় ১০টি বৈঠকও হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা সংকটের আশঙ্কা হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। সরবরাহ ব্যবস্থায় ঝুঁকির বিষয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থার পক্ষ থেকে সতর্কবার্তাও ছিল। সতর্কবার্তা পাওয়ার পরও সময়মতো ব্যবস্থা নেয়নি তৎকালীন সরকার।
কমতে থাকা সংক্রমণ ফের আগস্টে বাড়তে শুরু জুলাইয়ে সন্দেহজনক ও নিশ্চিত রোগী মিলিয়ে মোট আক্রান্ত ছিল ৩১ হাজার ৩২৭ জন। আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২ হাজার ৯৩৪ জনে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যাও ২৬ হাজার ৩৬০ থেকে বেড়ে হয়েছে ২৭ হাজার ৪৫৮। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, জুলাইয়ে ১১৯ জনের মৃত্যুর বিপরীতে আগস্টে মৃত্যু হয়েছে ১৩৬ জনের। টিকাদান কর্মসূচির পর সাময়িক স্বস্তি এলেও সংক্রমণের শৃঙ্খল পুরোপুরি ভাঙা যায়নি। আর সেপ্টেম্বরের শুরুতেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। গতকাল শুক্রবারও নতুন আরও ১ হাজার ১১৪ শিশু হামজনিত সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে এসেছে।
উপসর্গের মৃত্যু থাকছে পর্যালোচনার বাইরে পরীক্ষায় নিশ্চিত মৃত্যুকে হাম এবং উপসর্গ রয়েছে কিন্তু পরীক্ষায় নিশ্চিত না হওয়া মৃত্যুকে সন্দেহজনক হিসেবে দেখাচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গতকালের হিসাবেও ৯৯টি নিশ্চিত ও ৮৮৮টি সন্দেহজনক মৃত্যুকে আলাদা করে দেখানো হয়েছে। কিন্তু জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের প্রশ্ন, মহামারি পরিস্থিতিতে উপসর্গসহ মারা যাওয়া শিশুদের সবগুলোকে ‘সন্দেহজনক’ বললে প্রকৃত মৃত্যুর চিত্র আড়াল হতে পারে। আবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যুক্তি হলো, অনেক শিশু উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর অন্য জটিলতায় মারা যেতে পারে; তাই পরীক্ষার প্রমাণ ছাড়া সব মৃত্যুকে হামজনিত বলা ঠিক নয়। এই বিতর্কের সমাধান হতে পারে প্রতিটি সন্দেহজনক শিশুমৃত্যুর ডেথ রিভিউ। কিন্তু এ ধরনের পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা এখনো নিয়মিতভাবে হচ্ছে না বলে অভিযোগ বিশেষজ্ঞদের। তারা বলছেন, শিশুদের মৃত্যু বিশ্লেষণে ডেথ রিভিউ জরুরি। এতে বোঝা যাবে, হামই মৃত্যুর কারণ ছিল, নাকি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অপুষ্টি বা অন্য জটিলতা মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করেছে।
শুরু থেকেই গরমিলে হাম পরিসংখ্যান চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে হাম পরিস্থিতির নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে এর আগেই দেশে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিলের মধ্যেই ১৯ হাজার ১৬১টি সন্দেহজনক রোগী, ২ হাজার ৯৭৩টি পরীক্ষায় নিশ্চিত রোগী এবং ১৯৬টি হামসংশ্লিষ্ট মৃত্যু—এর মধ্যে ৩০টি নিশ্চিত নথিভুক্ত হয়েছিল। এপ্রিলের শুরুতে পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর হয়ে ওঠে যে, জরুরি ভিত্তিতে টিকাদানের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ৫ এপ্রিল প্রথম ধাপে ১৮টি উচ্চঝুঁকির জেলার ৩০টি উপজেলায় ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের এমআর টিকা কর্মসূচি শুরু হয়। পরে ধাপে ধাপে দেশের অন্যান্য অঞ্চল ও সিটি করপোরেশন এলাকায় সম্প্রসারণ করা হয়। বর্তমান সরকার যখন বড় আকারের টিকাদান শুরু করে, ততক্ষণে ভাইরাসটি দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে।
লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি টিকায়ও বাদ পড়েছে শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম নিয়ন্ত্রণে জনসংখ্যার অন্তত ৯৫ শতাংশকে টিকার আওতায় নিয়ে আসা জরুরি। জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির পর জুন ও জুলাইয়ে সংক্রমণের গতি কিছুটা কমেছিল। কিন্তু সেটি স্থায়ী হয়নি। আগস্টে ফের বাড়তে শুরু করে রোগীর সংখ্যা। সরকারি হিসাবে জাতীয় হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিতে প্রায় ১ কোটি ৮৪ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ। কাগজে-কলমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি শিশু টিকার আওতায় এসেছে। কিন্তু পরে উঠে আসে বাদ পড়া শিশুদের তথ্য। গত ২৮ জুনের ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা পাওয়া যায় প্রায় ২ কোটি ২৬ লাখ। এতে দেখা যায়, হাম টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা ও প্রকৃত যোগ্য শিশুর সংখ্যার মধ্যে প্রায় ৪৬ লাখের ব্যবধান ছিল। পরে বাদ পড়া শিশুদের ফের টিকার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত হয়। গত আগস্টে আরও ১৬ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
জনস্বাস্থ্যবিদরা বলেন, হাম নিয়ন্ত্রণে না আসার পেছনে বড় কারণ রুটিন টিকাদান ব্যবস্থার দুর্বলতা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ২০২৪-২৫ সালে দেশে এমআর টিকার মজুত সংকট, রুটিন টিকাদানে ঘাটতি এবং ২০২০ সালের পর নিয়মিত দেশব্যাপী অতিরিক্ত হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি না হওয়ায় বিপুল সংখ্যক শিশু টিকার বাইরে ছিল। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতায় নিয়মিত টিকাদান ব্যাহত হওয়া এবং বিশেষ ক্যাম্পেইন স্থগিত থাকা। এসব ব্যর্থতার কারণে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। এ ছাড়া হাম আক্রান্ত শিশুদের বড় অংশ অপুষ্টিতে ভুগছে। সংক্রমণের সঙ্গে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও অপুষ্টি যুক্ত হলে মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে। ফলে শুধু টিকা নয়, দ্রুত শনাক্তকরণ, আইসোলেশন, অক্সিজেন, আইসিইউ ও শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থাও জরুরি।