ব্যাংক খাতে নবায়ন ও পুনর্গঠনে বড় বড় ছাড়ও খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি থামাতে পারছে না। খেলাপির পাগলা ঘোড়া ছয় মাস কিছুটা স্তিমিত থাকার পর ফের দৌড়াতে শুরু করেছে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে ফের ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর আগে গত বছর ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকার নিচে নেমে এসেছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক খাতে নজিরবিহীন লুটপাটের মাধ্যমে ঋণের আড়ালে যেসব টাকা বের করে নেওয়া হয়, সেগুলোই এখন খেলাপি হচ্ছে। এছাড়া দেশে ও বিদেশের বিদ্যমান পরিস্থিতির কারণেও কিছু ঋণ খেলাপি হচ্ছে।
জুন পর্যন্ত খেলাপি ঋণের হালনাগাদ প্রতিবেদন বুধবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান অনুমোদন করেছেন। ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, ব্যাংক খাতে জুনে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। মার্চে খেলাপি ঋণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। খেলাপির হার ছিল ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। এ হিসাবে মার্চের তুলনায় জুনে তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। গত বছরের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। এ হিসাবে গত বছরের ডিসেম্বর থেকে গত জুন পর্যন্ত ছয় মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪৯ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। একীভূত পাঁচ ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ৮০ শতাংশের বেশি, যা এখন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক হিসাবে পরিচালিত হচ্ছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে ব্যাংক খাতে অনিয়ম, জালিয়াতি, প্রতারণা ও দুর্নীতির উচ্চমাত্রার প্রভাবেই খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পায় বলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকাররা জানান।
২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। তারা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে ২০২৪ সালের জুনে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। সেই সরকারের মেয়াদে ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র দেখানো শুরু হয়। আবার আওয়ামী লীগ-সমর্থিত অনেক গ্রাহককে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। ফলে খেলাপি ঋণ হু-হু করে বেড়ে যায়। এ অবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকার বিশেষ ছাড়ে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেয়। তাতে খেলাপি ঋণ কমে আসে।
খেলাপি ঋণ বাড়ার কারণে ব্যাংক খাতে বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগযোগ্য তহবিল আটকে যাচ্ছে এবং বেড়ে যাচ্ছে প্রভিশন ঘাটতি, যা মূলধন খেয়ে ফেলছে। বর্তমানে সার্বিকভাবে ব্যাংক খাত বড় অঙ্কের মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে। ব্যাংকগুলোর আয় কমে গেছে। সম্পদের মান কমেছে। সার্বিকভাবে ব্যাংক খাত দুর্বল হয়ে পড়েছে। এছাড়া বৈশ্বিকভাবেও নেতিবাচক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
এদিকে খেলাপি ঋণ কমাতে ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংকগুলোকে খেলাপি ঋণ আদায় বাড়াতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ঋণ আদায় বাড়েনি, বরং কমে গেছে। ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে নতুন করে আর খেলাপি ঋণ না বাড়ে, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে। কিন্তু এখনো নতুন ঋণ খেলাপি হচ্ছে। এছাড়া খেলাপি ঋণ কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নবায়ন ও পুনর্গঠনে বড় ছাড় দিয়েছে। ব্যাপক হারে খেলাপি ঋণ নবায়নের পরও তা কমছে না। এমনকি নিয়মিত ঋণ খেলাপি হওয়ার আগেই পুনর্গঠন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তারপরও নতুন করে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। এর বাইরে নানাভাবে নীতি সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে। এতসব পদক্ষেপের পরও খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি কমানো যাচ্ছে না।
খেলাপি ঋণ কমানোর পদক্ষেপ সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, মূলত সুদযুক্ত হওয়ায় খেলাপি ঋণ বেড়েছে। খেলাপি কমাতে পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এতে সামনে খেলাপি কমে আসবে।
সূত্র জানায়, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ প্রথমবার ৬ লাখ কোটি টাকার ঘর অতিক্রম করে ২০২৫ সালের জুনে। ওই সময়ে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ৬ লাখ ৮ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা। ওই বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬ লাখ কোটির ঘরেই ছিল। ডিসেম্বরে এসে খেলাপি কমে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটিতে নামে। গত মার্চেও খেলাপি ঋণ ৫ লাখ কোটির ঘরেই ছিল। জুনে তা ফের ৬ লাখ কোটির ঘর অতিক্রম করে।
এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, খেলাপি ঋণ কমাতে বুহুমুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোকেও খেলাপি ঋণ কমাতে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ফলে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এর হার কমে আসবে।