ঢাকার সড়কে ছুটছে এমন এক যান, যার গতি ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত উঠতে পারে। চারটি ১২ ভোল্টের ব্যাটারি, উচ্চক্ষমতার মোটর ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রাংশ যুক্ত করার পর এর খালি ওজনই দাঁড়ায় ১০০ কেজির বেশি। চালক ও যাত্রী উঠলে মোট ওজন ছাড়িয়ে যায় প্রায় ৩০০ কেজি। অথচ ভারী ও দ্রুতগতির এই যান থামাতে ব্যবহার করা হয় সাধারণ প্যাডেলচালিত রিকশার ঠুনকো ব্রেক প্যাড, যার খুচরা বাজারমূল্য মাত্র ৩০ টাকা। দেশে এ ধরনের প্রায় ৮০ লাখ ব্যাটারি ও মোটরচালিত রিকশা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আর এর পেছনে চলছে হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা। এ বিপদের সর্বশেষ উদাহরণ মিলেছে সোমবার জামালপুরে। সদর উপজেলার লাহেরীকান্দা এলাকায় বাস ও ব্যাটারিচালিত রিকশার সংঘর্ষে চারজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ১৬ জন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যায় স্কুলগামী শিশুদের বহনে ব্যবহৃত ভ্যানগুলোয়। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় স্কুল ছুটির পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা বাবা-মায়ের ভাড়া করা ভ্যানে ১০ বছরের কম বয়সী শিশুদের বহন করা হচ্ছে। দুই পাশে বেঞ্চ ও লোহার খাঁচার মতো কাঠামো দিয়ে তৈরি এসব ভ্যানে রয়েছে ১২ ভোল্টের চার ব্যাটারি ও ইলেকট্রিক মোটর।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে অটোরিকশা ও অটোভ্যান দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৭ হাজার ৬০৩ জন। একই সময়ে নছিমন, ভটভটি, আলমসাধু, মাহিন্দ্র ও টমটমসহ বিভিন্ন যানবাহনের দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২ হাজার ৪৬৫ জন। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, দেশে বর্তমানে ৮০ লাখের বেশি অটোরিকশা রয়েছে এবং এর সঙ্গে বিপুলসংখ্যক পরিবারের জীবিকা জড়িত।
ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান কালবেলাকে বলেন, ব্যাটারিচালিত ই-রিকশা নিয়ন্ত্রণে সরকারের উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখা গেলেও এর বাস্তবায়নে কারিগরি কমিটির সমন্বয় এবং মাঠপর্যায়ে জরিপ প্রয়োজন। তার মতে, অটোরিকশার জন্য নিরাপদ ও অভিন্ন নকশা নিশ্চিত করা জরুরি। নিবন্ধনের ক্ষেত্রে যাতে কোনো ধরনের দুর্নীতি না হয় এবং চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
সাইদুর রহমানের অভিযোগ, একদিকে মহাসড়কে অটোরিকশা বন্ধের চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে এসব যান ও এর যন্ত্রাংশ আমদানির জন্য এলসি খোলা এবং কারখানাগুলোও সচল রয়েছে। নীতির এই সমন্বয়হীনতার কারণে অনেক চালক ঋণ নিয়ে অটোরিকশা কিনে পরে বিপদে পড়ছেন।
বনানী ১১ নম্বর ব্রিজ এলাকায় রোববার দুপুরে কথা হয় ৩৮ বছর ধরে রিকশা চালানো কুমিল্লার জামাল হোসেনের সঙ্গে। জীবনের অর্ধেকের বেশি সময় ঢাকায় কাটিয়েছেন তিনি। তার আক্ষেপ, আগে মানুষের মধ্যে প্রাণ ও পরিবারের প্রতি দরদ ছিল। এখন ১০ থেকে ২০ টাকা কম খরচের জন্য অনেকেই মোটরচালিত রিকশায় উঠে পড়েন। কিন্তু এ যাত্রা শেষে নিরাপদে ঘরে ফেরা হবে কি না, সে চিন্তা অনেকেই করেন না।
একই ধরনের কথা বলেন কুড়িগ্রামের ষাটোর্ধ্ব আবুল বাশার। প্রায় ১০ বছর প্যাডেলচালিত রিকশা চালাচ্ছেন তিনি।
জমায় মালিকের ব্যবসা ব্যাটারিচালিত রিকশার বিস্তারের পেছনে একটি বড় ভাড়াভিত্তিক ব্যবসাও তৈরি হয়েছে। ঢাকার চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্যাডেলচালিত রিকশার জন্য দৈনিক জমা প্রায় ১৮০ টাকা হলেও অটোরিকশার জমা ৪০০ টাকা।
জামাল হোসেন যে মালিকের রিকশা চালান, তার নাম সিদ্দিক। ১০টি অটোরিকশা থেকে তার দৈনিক আয় প্রায় ৪ হাজার টাকা। অন্যদিকে আবুল বাশারের মহাজন জসিমের রয়েছে ৪০টি প্যাডল রিকশা। সেখান থেকে তার দৈনিক আয় প্রায় ৭ হাজার ২০০ টাকা। দুই মালিকের গ্যারেজই মহাখালীর ওয়্যারলেস এলাকায়।
দীর্ঘদিন ধরে এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত সেন্টু বেপারি কালবেলাকে জানান, আঞ্চল ভেদে রিকশা চলাচলের নিয়মনীতি ও পুলিশি কড়াকড়িতে বড় পার্থক্য রয়েছে। তিনি জানান, এ ব্যবসায় স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র ও ট্রাফিক পুলিশকে নির্দিষ্ট হারে মাসিক মাসোহারা বা ‘মান্থলি’ দিয়ে বিশেষ ‘টোকেন’ সংগ্রহ করতে হয়। এই টোকেন থাকলে নির্দিষ্ট এলাকায় অটোরিকশা চলাচলের সুযোগ আছে। টোকেন না থাকলে রিকশা ধরে ডাম্পিং স্টেশনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
ব্যাটারি ব্যবসায় শতকোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি:
ব্যাটারিচালিত রিকশার বিস্তারের সঙ্গে ব্যাটারি উৎপাদন ব্যবসারও বড় বাজার তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে একটি ব্যাটারি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ৩১৭ কোটি ৯২ লাখ ৫১ হাজার ৩৭৮ টাকা ভ্যাট ফাঁকির তথ্য দিয়েছে ভ্যাট গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর।
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ‘জিউঝু ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড’ ২ হাজার ৪৯৩ কোটি ২৬ লাখ ৪ হাজার ৩৪৩ টাকার বিক্রি কম দেখিয়েছে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে প্রতিষ্ঠানটির মূল কারখানা। ইজি বাইক, রিকশা ও অটোভ্যানের জন্য ড্রাই ও ওয়াটার ব্যাটারি উৎপাদন করে প্রতিষ্ঠানটি।
গ্যারেজ মালিক এবং চালকদের তথ্য অনুযায়ী ঢাকার তুরাগ থানার রানাভোলা, টঙ্গীর চেরাগালি এবং জয়দেবপুর কোর্ট কাঁচারি এলাকার অননুমোদিত কারখানা থেকে সারা দেশে ব্যাটারি সরবরাহ করা হয়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস ট্যারিফ শিডিউল ও অফিসিয়াল শুল্ক ক্যালকুলেটর বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিদেশ থেকে তৈরি ব্যাটারি আমদানিতে প্রায় ৯৩ শতাংশ কর দিতে হলেও ব্যাটারির কাঁচামাল বা কাঁচা সিসা আমদানিতে কর প্রায় ৩৪ শতাংশ। এ ব্যবধানের কারণে দেশীয়ভাবে কম খরচে ব্যাটারি উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ফলে সস্তা ব্যাটারির বাজারও বড় হচ্ছে।
জাতিসংঘের বাণিজ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী (ইউনিসেফ এবং পিওর আর্থ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা), প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার টন পুরোনো ব্যাটারি বর্জ্য তৈরি করে। যার বড় একটি অংশ ব্যাটারিচালিত রিকশার সঙ্গে সম্পর্কিত।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী প্রায় ৩৮ শতাংশ শিশুর রক্তে বিপজ্জনক মাত্রায় সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ঢাকা বিভাগে এই হার ৬৫ শতাংশের বেশি।
বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় সিসা দূষণের কারণে শিশুদের বুদ্ধিমত্তা বিকাশে বড় ধরনের ক্ষতির কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্কদের উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগজনিত অকাল মৃত্যুর সঙ্গেও সিসা দূষণের সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে।
আদালতের নির্দেশ, মাঠে ভিন্ন চিত্র: ২০১৪ সালের জুলাইয়ে হাইকোর্ট ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় ব্যাটারিচালিত ও মোটরচালিত রিকশার চলাচল নিয়ে রায় দেন। এরপর ২০২৪ সালের মে মাসে সরকার ঢাকা থেকে ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান অপসারণের উদ্যোগ নেয়। তবে চালকদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে ওই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়।
২০২৪ সালের নভেম্বরে হাইকোর্ট ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন। সরকার ওই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করলে পরবর্তী সময়ে আপিল বিভাগ এক মাসের জন্য স্থিতাবস্থা জারি করেন।
এরপর ২০২৫ সালের মে মাসে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ব্যাটারিচালিত রিকশা অভ্যন্তরীণ ও সার্ভিস সড়কে সীমাবদ্ধ রাখার উদ্যোগ নেয়। এ সময় পরিচালিত অভিযানে শতাধিক রিকশা জব্দ করা হয়। তবে চালকদের প্রতিবাদ, সড়ক অবরোধ ও আন্দোলনের কারণে উদ্যোগটি বাস্তবায়নে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়।
সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুন প্যাডেল রিকশা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে নিরাপদ ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমোদন ও নীতিমালা প্রণয়ন এবং জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জাতীয় অর্থনীতি রক্ষায় প্রাইভেট কারের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের দাবি জানিয়ে সরকারকে একটি আইনি নোটিশ পাঠান।
বিষয়টি সংশ্লিষ্ট আইনজীবী কালবেলাকে নিশ্চিত করে বলেন, ঢাকার সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশার তুলনায় প্রাইভেট কারের সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে এবং মানবিক দিক বিবেচনা করেই তিনি এ নোটিশ পাঠিয়েছেন।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. এম শামসুল হক কালবেলাকে বলেন, ‘এটি আসলে সরকারের সক্ষমতার বিষয়। মন্ত্রীরা জোনভিত্তিক রিকশা চালানোর কথা বলছেন। কিন্তু ঢাকা সেভাবে পরিকল্পিত শহর নয়।
তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন অল্প কিছু রিকশার লাইসেন্স দিলেও বাস্তবে এর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি রিকশা চলছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা সিটি করপোরেশন বা পুলিশের নেই। তাই প্রথমে রিকশার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নির্দিষ্ট রং বা ভেস্ট, রেজিস্ট্রেশন ও আইডি কার্ডের মাধ্যমে চালকদের একটি শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে। পাশাপাশি তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
সামসুল হক বলেন, ‘ঢাকা শহরকে বাঁচাতে হলে এবং বাস সার্ভিসকে জনপ্রিয় করতে হলে প্রধান সড়কে কোনোভাবেই অটোরিকশার মতো ছোট যান চালানো যাবে না। প্রধান সড়কে বাসের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রাখতে হবে। তবে শাখা সড়ক বা গলির ভেতরে যাতায়াতের জন্য ১৬ আসনের মিনিবাস বা মাইক্রোবাসের মতো নিয়ন্ত্রিত যানবাহনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।’
তার মতে, অটোরিকশার সমস্যার মূল কারণ এর অবাধ উৎপাদন ও ব্যাটারি সরবরাহ। যারা ব্যাটারি আমদানি বা গাড়ি তৈরি করছে, তারা ডাম্পিং বা উচ্ছেদ অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। তাই উৎপাদন পর্যায়েই নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ চুরি করে চার্জ দেওয়ার কারণে এসব গাড়ির পরিচালন ব্যয় কম থাকে। বিদ্যুৎ চুরি বন্ধ করা গেলে লাভের পরিমাণ কমবে এবং এর প্রসারও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসবে।
তিনি বলেন, ‘শুধু ডাম্পিং বা বুলডোজার দিয়ে উচ্ছেদ করে সমস্যার সমাধান হবে না। এতে মানুষের আবেগ জড়িয়ে থাকে এবং উচ্ছেদের কয়েকদিন পরই পরিস্থিতি আগের মতো হয়ে যায়। সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নিলে তা ধরে রাখার মতো সক্ষমতাও থাকতে হবে।’
পাশাপাশি কৃষি খাতের জন্য ভর্তুকিতে আমদানি করা ব্যাটারি যেন বাণিজ্যিক কাজে বা অটোরিকশায় ব্যবহার না হয়, সেদিকেও নজর দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।