ভোরের আলো ফোটার আগেই রাজধানীর সড়কগুলোতে নামে মানুষের ঢল। কেউ ঢাকা ছাড়ে, কেউ ফেরে।
জানা যায়, রাজধানীর মূল ৩০৫ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তালিকায় ছিনতাইয়ে জড়িত হিসেবে চিহ্নিত এক হাজার ৩৮৭ জন।
তালিকাভুক্ত সক্রিয় ছিনতাইকারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩০৮ জন রয়েছেন ওয়ারী বিভাগে। তেজগাঁও ও উত্তরা বিভাগে ২৪০ জন করে। এ ছাড়া মতিঝিলে ১৬৮, লালবাগে ১৫৯, রমনায় ১৫২, গুলশানে ৬৭ এবং মিরপুরে ৫৩ জন তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারী রয়েছে। এদের ৮০ শতাংশের বেশি একাধিক মামলার আসামি এবং গ্রেপ্তার হয়ে জামিনে বের হয়ে আবারও অপরাধ কর্মে সক্রিয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীদের বাইরে আরো অনেক ছিনতাইকারী সক্রিয়, যাদের অনেকেই ভাসমান কিশোর ও মাদকাসক্ত। সুযোগ পেলেই ছুরি, চাপাতি অথবা সামুরাই নিয়ে ছিনতাইয়ে নামে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, কোনো এলাকায় তালিকাভুক্তদের সংখ্যা বেশি হলেই সেখানে ছিনতাইয়ের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি—এমনটি সঠিক নয়। কারণ জনসংখ্যার ঘনত্ব, যানবাহনের চাপ, বাণিজ্যিক কার্যক্রম, রাতের জনচলাচল, পরিবহনকেন্দ্র ও অপরাধপ্রবণ এলাকার ঘনত্ব—সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই ঝুঁকি নির্ধারণ করতে হয়।
সূত্র বলছে, সর্বশেষ সংসদ ভবন এলাকায় শিক্ষিকার মৃত্যুর পর থেকে বিশেষ নজরদারি এবং অভিযানে গুরুত্ব দিয়েছে ডিএমপি। এরই অংশ হিসেবে ৫০টি থানা এলাকায়ই টহল টিম বাড়ানোসহ বিশেষ পদক্ষেপ নিতে গত শনিবার নির্দেশনা দিয়েছে ডিএমপি সদর দপ্তর।
ভুক্তভোগী অনেকে আইনের দ্বারস্থ হন না : ডিএমপির হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত রাজধানীর ৫০ থানায় ছিনতাইয়ের ঘটনায় ১৭৮টি মামলা হয়েছে। তবে পুলিশের নথিতে থাকা ১৭৮টি মামলা রাজধানীর ছিনতাইয়ের পূর্ণ চিত্র নয় বলে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। তাঁদের পর্যবেক্ষণ, ছিনতাইয়ের শিকার হওয়ার পর অনেকেই মামলা করতে চান না। কেউ সাধারণ ডায়েরি করেন, আবার কেউ ঝামেলা বা হয়রানির আশঙ্কায় থানায় অভিযোগই করেন না। ফলে নথিভুক্ত মামলার বাইরে আরো অনেক ঘটনা থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দুই শতাধিক হটস্পটে বিশেষ ঝুঁকি : রাজধানীতে দুই শতাধিক ছিনতাইপ্রবণ হটস্পট চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় পুলিশি টহল, চেকপোস্ট, সাদা পোশাকে নজরদারি এবং সন্দেহভাজনদের ওপর পর্যবেক্ষণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু পুলিশি উপস্থিতিতে ফাঁক পেলেই কৌশল বদলে ফেলছে অপরাধীরা। যানজটে আটকে থাকা গাড়ির জানালা দিয়ে মোবাইল টেনে নেওয়া, চলন্ত রিকশা থেকে ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া কিংবা পথচারীর হাতে থাকা ফোন কেড়ে মোটরসাইকেলে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে।
কখনো মোটরসাইকেলে দু-তিনজনের দল ঘুরে বেড়ায়। একজন থাকে চালকের আসনে, আরেকজন সুযোগ বুঝে টার্গেটে থেকে হাতে থাকা মোবাইল বা ব্যাগ টেনে নেয়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তারা ঘটনাস্থল থেকে সরে পড়ে। ট্রেনে যাত্রীরাও এ ক্ষেত্রে নিরাপদ নয়।
মোবাইল ফোন এখনো প্রধান টার্গেট : রাজধানীর ছিনতাইয়ের বড় একটি অংশের এখনো টার্গেট মোবাইল ফোন সেট। গাড়ি, রিকশা কিংবা ফুটপাতে চলার সময় হাতে থাকা মোবাইল সহজেই অপরাধীদের নজরে পড়ে। বিশেষ করে গাড়ির জানালা খোলা রেখে মোবাইল ব্যবহার, রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলা কিংবা রিকশায় বসে অসতর্কভাবে ফোন ব্যবহার করলে ঝুঁকি বেড়ে যায়। ‘দ্রুত আঘাত, দ্রুত পলায়ন’ কৌশল ব্যবহার করায় এসব চক্রকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা পুলিশের জন্যও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাত ও ভোরে বাড়ে ঝুঁকি : মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত রাজধানীর অনেক সড়ক তুলনামূলক ফাঁকা থাকে। গণপরিবহন কমে যায়, পথচারীও কম থাকে। এই সময়কেই সুযোগ হিসেবে নেয় ছিনতাইকারীচক্র। বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন, বিমানবন্দরমুখী সড়ক, মহাসড়কের প্রবেশপথ, বাজার ও হাসপাতালের আশপাশে ভোরের যাত্রীরা বিশেষ ঝুঁকিতে থাকে। হাতে ব্যাগ, সঙ্গে টাকা বা মূল্যবানসামগ্রী এবং অপরিচিত পরিবেশ—এই তিন কারণে তারা সহজ টার্গেটে পরিণত হয়। নির্জন সড়কে রিকশা থামিয়ে অস্ত্রের ভয় দেখানো কিংবা মোটরসাইকেলে এসে পথ আটকে দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
বাধা দিলেই অস্ত্র ব্যবহার : ছিনতাইয়ের সঙ্গে সহিংসতার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ছুরি, চাকু, চাপাতিসহ বিভিন্ন ধারালো অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ আসছে। গত ২৭ জুন ধানমণ্ডিতে রিকশার গতিরোধ করে দুই ব্যক্তির কাছ থেকে দুটি দামি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। বাধা দেওয়ায় একজনকে চাপাতি দিয়ে আঘাত করা হয়। পরে ওই ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করে ধানমণ্ডি মডেল থানা পুলিশ। এ ধরনের ঘটনা জানান দিচ্ছে, ছিনতাই এখন শুধু অর্থ বা মূল্যবানসামগ্রী কেড়ে নেওয়ার অপরাধে সীমাবদ্ধ নেই। সামান্য প্রতিরোধও কখনো কখনো ভুক্তভোগীর জন্য প্রাণঘাতী ঝুঁকি।
মাদকের টাকার জন্য ছিনতাই : ছিনতাইয়ের সঙ্গে মাদকের যোগসূত্র নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ডিএমপির দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বক্তব্য, ছিনতাইয়ে জড়িতদের একটি অংশ অল্প বয়সী ও মাদকাসক্ত। মাদকের টাকা জোগাড় করতে কেউ কেউ ছোটখাটো চুরি বা ছিনতাই দিয়ে শুরু করে। পরে সংঘবদ্ধ চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আরো বড় অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। এ কারণে শুধু ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। মাদকের সরবরাহ, বিক্রি ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
তালিকায় থাকার পরও সক্রিয় কেন : পুলিশের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, যখন হাজারের বেশি চিহ্নিত ছিনতাইকারীর তথ্য রয়েছে, তখন তাদের অপরাধ ঠেকানো এত কঠিন কেন?
এ প্রশ্নে পুলিশের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের অনেকেই স্থান পরিবর্তন করে। কেউ গ্রেপ্তারের পর জামিনে বেরিয়ে আসে। আবার নতুন করে অপরাধে জড়ানো ব্যক্তিদের একটি অংশ পুলিশের তালিকার বাইরে থেকে যায়। ফলে শুধু তালিকা তৈরি করলেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। প্রয়োজন তালিকা নিয়মিত হালনাগাদ করা, অপরাধের ধরন ও এলাকা অনুযায়ী ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা এবং বারবার অপরাধে জড়ানো ব্যক্তিদের ওপর আইনি কাঠামোর মধ্যে কার্যকর নজরদারি রাখা।
চলমান অভিযানেও আতঙ্ক কাটছে না : ছিনতাই নিয়ন্ত্রণে ডিএমপি ও অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন এলাকা থেকে ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার এবং মোবাইল ফোন, স্বর্ণালংকার ও ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত ধারালো অস্ত্র উদ্ধারের খবরও পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু একদিকে গ্রেপ্তার, অন্যদিকে নতুন করে ছিনতাই—এই চক্র ভাঙাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. উমর ফারুক বলেন, হটস্পটভিত্তিক পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি প্রয়োজন রাতে রাস্তায় পর্যাপ্ত আলো, কার্যকর সিসিটিভি নেটওয়ার্ক, দ্রুত ফুটেজ বিশ্লেষণ, গোয়েন্দা নজরদারি ও দ্রুত তদন্ত। একই সঙ্গে ছিনতাইয়ের মামলার বিচারপ্রক্রিয়াও দ্রুততর করা জরুরি। ভুক্তভোগীদের থানায় অভিযোগ করতে উৎসাহিত করা এবং মামলার প্রক্রিয়া সহজ করাও দরকার। কারণ মামলা ও অভিযোগ নথিভুক্ত না হলে অপরাধের প্রকৃত চিত্র পুলিশের তথ্যভাণ্ডারে উঠে আসে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মামলা দায়ের থেকে শুরু করে জামিন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ার দুর্বলতা ও দীর্ঘসূত্রতা বন্ধ করা না গেলে ছিনতাইকারীদের লাগাম টানা সম্ভব হবে না।’
ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) প্রধান ও অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘এরই মধ্যে আমাদের টহল টিম রেলস্টেশন, বাসস্টেশনসহ গুরুত্বপূর্ণ কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দ্বিগুণ করা হয়েছে। ক্রাইম ডিভিশনসহ সবাই টহল এবং অভিযানের সংখ্যা বাড়িয়েছে। সবার সমন্বয়ে ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালানো হচ্ছে।’