Image description

মাঠে নেই অপরাধ জগতের পরিচিত সেই সব ‘সম্রাট’। তারপরও টিকে আছে তাদের অপরাধ সাম্রাজ্য। চট্টগ্রামের ‘অপরাধের আখড়া’ খ্যাত জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর ‘সফল’ অভিযানের পরের চিত্র এটি। জঙ্গল সলিমপুরের গডফাদার ইয়াসিন, মশিউর কিংবা রোকনরা আত্মগোপনে থাকলেও তাদের সাজানো ছকেই চলছে পাহাড়ের অন্ধকার জগতের রাজত্ব। শুধু নেতৃত্বের স্তর পরিবর্তন করে সামনে আনা হয়েছে দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় সারির সন্ত্রাসীদের। গডফাদারদের আড়ালে থাকার সুযোগে নতুন করে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে অন্তত ১২টি ভয়ংকর গ্যাং।

পুরোনো গ্যাংদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নতুন করে গজিয়ে ওঠা গ্যাংগুলোর কাছে জিম্মি এখন জঙ্গল সলিমপুরের ৩০ হাজার পরিবার। তাদের সামনে রেখে অবৈধ বিদ্যুৎ, পানি বাণিজ্য আর খাসজমি বিক্রির নামে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করছে। জঙ্গল সলিমপুরের অলিগলি ঘুরে মিলেছে অপরাধীদের এমন নতুন ছক ও উত্থানের চাঞ্চল্যকর তথ্য। চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি (ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট) নাজমুল হাসান বলেন, ‘মার্চের অভিযানের পর জঙ্গল সলিমপুরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। টানা অভিযানের মুখে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীগুলো গা ঢাকা দিয়েছে। চিহ্নিত অপরাধীরা যাতে সক্রিয় হতে না পারে সেদিকে নজর রাখছে প্রশাসন।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরে কোনো সন্ত্রাসী কার্যক্রমকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। নতুন কোনো বাহিনী কিংবা সন্ত্রাসী গজিয়ে উঠে যাতে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে সেদিকেও নজর রয়েছে আমাদের। যদি কেউ এ ধরনের চেষ্টা করে তাহলে চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

সন্ত্রাসীদের এক কৌশলকে ‘অপরাধ রাজনীতি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ স্টাডিজ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও সহকারী অধ্যাপক মো. শাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, ‘নিজেদের ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখতেই নেতৃত্বের পরিবর্তন সন্ত্রাসীদের এক ধরনের কৌশল। এর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করছে দুর্ধর্ষ অপরাধী বাহিনীগুলো। জঙ্গল সলিমপুরের ক্ষেত্রেও অভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে।’

জঙ্গল সলিমপুর সরেজমিন পরিদর্শনে কথা হয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে। নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি আলাপ হওয়া ব্যক্তিদের কেউ। তারা জানান, যৌথ বাহিনীর অভিযানের পর সন্ত্রাসী বাহিনীগুলোর সদস্যরা কিছু দিন গা ঢাকা দেওয়ার পর আবার সক্রিয় হয়েছে। শীর্ষ সন্ত্রাসীরা আড়ালে থেকে নিজনিজ বাহিনীকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এরই মধ্যে নতুন কয়েকটি সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। সাধারণ চোখে জঙ্গল সলিমপুরের আইনশঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক মনে হলেও ভিতরের চিত্রটা ঠিক আগের মতোই। চাঁদাবাজি, দখলবাজিসহ সব ধরনের অপরাধ চলছে আগের মতো। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মাসোহারার পরিমাণ বেড়েছে।’

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, জঙ্গল সলিমপুরের প্রবেশ মুখে রয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর তল্লাশি চৌকি। ভিতরে স্থাপন করা হয়েছে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্প। গত মার্চে যৌথ বাহিনীর স্মরণকালের বৃহৎ সাঁড়াশি অভিযান এবং ক্যাম্প স্থাপনের পর অনেকেই ভেবেছিলেন, চট্টগ্রামের কুখ্যাত এই ‘অপরাধ সাম্রাজ্যের’ বুঝি চিরতরে পতন ঘটেছে। কিন্তু পাহাড়ের গহিনে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে ভিন্ন গল্প।

সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, জঙ্গল সলিমপুরে অপরাধীদের পতন হয়নি, কেবল ‘খোলস’ আর ‘রাজত্বের হাতবদল’ হয়েছে। শীর্ষ গডফাদাররা আত্মগোপনে থাকলেও পরিবর্তন এনেছে তাদের কৌশলের। তৃতীয় সারির ক্যাডারদের দিয়ে তারা নাড়ছেন অন্ধকার জগতের কলকাঠি। বাহিনীগুলোর প্রধানরা নেপথ্যে থেকে তৃতীয় স্তরের বাহিনী নিয়ে পরিচালনা করছে সন্ত্রাসী বাহিনীগুলোকে। কৌশল পরিবর্তন করা সন্ত্রাসী বাহিনীগুলো এর মধ্যে রয়েছে- জঙ্গল সলিমপুরের অঘোষিত সম্রাট ও ‘আলীনগর বহুমুখী সমবায় সমিতি’র নিয়ন্ত্রক ইয়াসিন মিয়া, ‘চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল (সমন্বয়) সংগ্রাম পরিষদ’ নিয়ন্ত্রক শীর্ষ সন্ত্রাসী কাজী মশিউর রহমান এবং ‘চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমাজকল্যাণ সমিতি’র নিয়ন্ত্রক রোকন উদ্দিন মেম্বার।

এ তিন বাহিনীর প্রধান আত্মগোপনে থেকে তৃতীয় স্তর দিয়ে বাহিনী পরিচালনা করছে। লাল বাদশা বাহিনী, ফারুক বাহিনী, গফুর মেম্বার বাহিনী, গাজী সাদেক বাহিনীর প্রধানরাও রয়েছে আড়ালে। তারা দ্বিতীয় স্তরের সদস্যদের দিয়ে পরিচালনা করছে নিজনিজ বাহিনী। কয়েক বছর নিষ্ক্রিয় থাকার পর জঙ্গল সলিমপুরে সম্প্রতি সক্রিয় হয়েছে আলোচিত দুই বাহিনী গিট্টু জাহাঙ্গীর বাহিনী, সিঙ্গাপুর নাছির বাহিনী। চলতি বছরের মার্চের পর থেকে জঙ্গল সলিমপুরে পুরোনো রূপে ফিরেছে এ দুই বাহিনী। 

জঙ্গল সলিমপুরের শীর্ষ বাহিনীর আড়ালের সুযোগে নতুন করে গজিয়ে উঠেছে আরও অন্তত ১২টি নতুন গ্যাং। তারা সক্রিয় বাহিনীগুলোর পদানুসরণ করে বিস্তার করছে প্রভাব। এ বাহিনীগুলোর মধ্যে রয়েছে- লুৎফর বাহিনী, নয়ন বাহিনী, হানিফ বাহিনী, শাকিল বাহিনী, বার্মা সায়েম বাহিনী, ডা. ইমন বাহিনী, রুমেল বাহিনী, বড় রাজু বাহিনী, বোমা রাজু বাহিনী, আর্মি শফিক বাহিনী। এ অপরাধ আখড়ায় পুরোনো বাহিনীগুলোর নেতৃত্বে চলছে সরকারি খাসজমি দখল করে প্লট বিক্রি বাণিজ্য, এলাকার উন্নয়নের নামে ঘরপ্রতি মাসোহারা গ্রহণ, কথিত বিচারের নামে চাঁদাবাজিসহ বড় ধরনের অপরাধ। 

চলতি বছরের মার্চের পর গজিয়ে ওঠা সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে অবৈধ বিদ্যুৎ এবং পানির ব্যবসা। জঙ্গল সলিমপুরের প্রায় ২৫-৩০ হাজার পরিবারকে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ২২টি মিটারের মাধ্যমে। এর মধ্যে তিনটি মিটারই হচ্ছে ‘পলাতক’ ইয়াসিন মিয়ার নামে। তার আত্মগোপনের পর বিদ্যুৎতের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন লুৎফর বাহিনী, আর্মি শফিক বাহিনী, হানিফ বাহিনী, নোয়াখালী আবসার বাহিনী। তাদের সঙ্গে রয়েছে এমদাদ, সাত্তার, শরীফ, সরওয়ার, নয়ন, তাজুসহ কয়েকজন উঠতি সন্ত্রাসী বাহিনী।

এ বাহিনীগুলো প্রতি পরিবার বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে এককালীন নিচ্ছে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা চাঁদা। সার্ভিস চার্জ হিসেবে পরিবারপ্রতি নেওয়া হচ্ছে মাসিক ২ হাজার টাকা এবং সাইট মিটারপ্রতি ১ হাজার টাকা। এর বাইরে সাধারণ ঘরপ্রতি ইউনিট বিদ্যুতের টাকা আদায় করা হচ্ছে ১২ টাকা এবং  দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ইউনিটপ্রতি নেওয়া হচ্ছে ১৫ টাকা। জঙ্গল সলিমপুরের পানি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে করছে নতুন করে গজিয়ে ওঠা গ্যাংগুলো। সলিমপুরের ১১টি সমাজে রয়েছে অন্তত  ছোট-বড় ১২০টি পানি বিক্রির সিন্ডিকেট।

এ সিন্ডিকেটগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিচরণ রয়েছে আর্মি শফিক বাহিনী, নাজমা, নাজিম, সুমন, সাত্তার, মুজিব এবং কুদ্দুস। তারা পানির চার্জ বাবদ ছোট পরিবারগুলো থেকে নেয় মাসিক ৬০০ টাকা। বড় পরিবারগুলো থেকে ৮০০ টাকা এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে রকম ভেদে নেয় ১ হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত। চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী বাহিনীগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে যৌথ বাহিনী। এটা আমাদের বড় সাফল্য। এখানে আর কোনো সন্ত্রাসী বাহিনীকে মাথা তুলে দাঁড়াতে দেওয়া হবে না।’ 

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরী বলেন, ‘প্রশাসনের কতিপয় লোকজনের সহযোগিতা ছাড়া অপরাধ রাজ্য ধরে রাখা কোনো সন্ত্রাসী বাহিনীর পক্ষে সম্ভব নয়। জঙ্গল সলিমপুরেও বিভিন্ন সংস্থার সদস্যদের সহযোগিতায় টিকে আছে বাহিনীগুলো। একই সঙ্গে গজিয়ে উঠছে নতুন নতুন বাহিনী। সন্ত্রাসী বাহিনীগুলোকে সমূলে নিধন না করা পর্যন্ত জঙ্গল সলিমপুরে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হবে না।’