Image description

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্তে নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার দাবি করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। ভিন্ন একটি মামলার তদন্ত করতে গিয়ে পাওয়া কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) এবং ইলেকট্রনিক নথি বিশ্লেষণ করে এক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বসহ কয়েকজনের সম্পৃক্ততার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তবে তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের নাম প্রকাশ করেননি তিনি। সূত্রে জানিয়েছে, ওই সাংস্কৃতিক ব্যক্তি বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের এক উপদেষ্টার সাবেক স্ত্রী। এদিকে ট্রাইব্যুনালের বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা ও প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা জানিয়েছেন, র‌্যাবের সাবেক এক মহাপরিচালকের কাছ থেকে পাওয়া জবানবন্দি ও জব্দ করা ইলেকট্রনিক নথিতেও সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। রোববার আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, ট্রাইব্যুনালে চলমান অন্য একটি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার তদন্ত করতে গিয়ে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি সূত্র পাওয়া যায়। ভিন্ন একটি মামলার সিডিআর পর্যালোচনার সময় হঠাৎ করেই এ ক্লু সামনে আসে। তিনি বলেন, নতুন পাওয়া তথ্য-উপাত্ত ও আলামত সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্তকারী সংস্থাকে দেয়া হবে। তবে এ হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রচলিত বিচারিক আদালতেই হবে।

গতকাল বিকালে চিফ প্রসিকিউটরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যান নিহত সাংবাদিক দম্পতির একমাত্র ছেলে মাহির সরওয়ার মেঘ। তার সঙ্গে ছিলেন মামলার বাদী ও মেহেরুন রুনির ছোট ভাই নওশের আলী রোমান। এ সময় তিনি সাংবাদিকেদের জানান, আজ সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডটি যেনো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তদন্ত করা হয় এ ব্যাপারে একটি আবেদন জমা দিবেন।

সাক্ষাৎ শেষে নওশের আলী রোমান বলেন, এতদিন ধরে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড নিয়ে নানা গল্প ও ফোনকলের তথ্য সামনে এসেছে, যার অনেকগুলোরই কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে এখন তারা আশাবাদী, প্রকৃত হত্যাকারীদের পরিচয় বেরিয়ে আসবে। তিনি বলেন, আমরা প্রকৃত খুনিদের নাম জানতে চাই। কারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তারা যেনো সামনে আসে। নওশের আরও বলেন, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর সাগর-রুনি হত্যা তদন্তে গঠিত টাস্কফোর্সকে ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দেয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সেই তদন্তের অগ্রগতি এখনো শূন্যের কোঠায় রয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তার ভাষ্য, আগে তদন্তের জন্য এক মাস পরপর সময় নেয়া হলেও এখন ছয় মাস পরপর সময় নেয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, মামলায় যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট সম্পৃক্ততার প্রমাণ নেই, তাদের অযথা কারাগারে রাখার প্রয়োজন নেই। একইসঙ্গে যাদের বিরুদ্ধে তদন্তে সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তারা যাতে দেশ ছেড়ে পালাতে না পারে, সে বিষয়েও ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান তিনি। এ সময় সাগর-রুনি হত্যা মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তদন্তের জন্য একটি আবেদন করার কথাও জানান নওশের।

এ সময় সাগর-রুনির ছেলে মাহির সরওয়ার মেঘ বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর প্রথম দিকে তিনি নীরব ছিলেন এবং কাউকে কিছু বলেননি। তবে এখন তিনি আশাবাদী যে, দীর্ঘদিনের এই হত্যাকাণ্ডের রহস্যের অবসান হবে। ইলেকট্রনিক নথিতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: এদিকে ট্রাইব্যুনালের বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা ও প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা বলেন, র‌্যাবের সাবেক মহাপরিচালকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি মামলা রয়েছে। ওই মামলায় তার বরিশালের বাসা থেকে বিভিন্ন সামগ্রী জব্দ করা হয়। এর মধ্যে থাকা ইলেকট্রনিক সামগ্রীর একটি অংশ ট্রাইব্যুনাল জব্দ করে। তিনি বলেন, এসব ইলেকট্রনিক নথির মধ্যে ২০০৭ সাল থেকে সামপ্রতিক সময় পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের ডকুমেন্ট পাওয়া গেছে। একটি সার্ভারও পাওয়া যায়। এর মধ্যে কিছু ফাইল ডিলিট করা থাকলেও সেগুলোর কয়েকটি উদ্ধার করা হয়েছে। আবার কিছু ফাইল প্রিন্ট আকারেও ছিল। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে তিন থেকে চারজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানান জোহা। তাদের একজনকে চিফ প্রসিকিউটরের অবগতির পর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তানভীর হাসান জোহা বলেন, প্রথম জিজ্ঞাসাবাদেই ওই ব্যক্তি কিছু গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের আগের রাতে র‌্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালককে পরদিন ভোরে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় উপস্থিত থাকার জন্য বলা হয়েছিল। তবে তখন সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তাকে কোনো আগাম তথ্য দেয়া হয়নি বলে ওই ব্যক্তি দাবি করেছেন।

জোহা বলেন, ওই বক্তব্যের পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দাবি করেছেন, তৎকালীন বিডিআর অথবা সরকারের কোনো স্পর্শকাতর নথি, ডিস্ক, টেপ বা মেমোরি-সংক্রান্ত বিষয়ের সঙ্গে ঘটনার যোগসূত্র থাকতে পারে। এ ছাড়া কিছু ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিখোঁজ থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য, টাস্কফোর্সসহ সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থাগুলোর কাছে থাকা তথ্যের সঙ্গে এসব নতুন আলামত মিলিয়ে দেখা হলে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার নিয়ে যা বললেন চিফ প্রসিকিউটর: সাগর-রুনি হত্যা মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তদন্ত বা বিচার করা যাবে কি না এ বিষয়ে আমিনুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩-এর ৩ নম্বর ধারায় ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার ও বিচারযোগ্য অপরাধের বিষয়গুলো নির্ধারণ করা আছে। তিনি বলেন, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড একটি বাসাবাড়িতে সংঘটিত হয়েছে। এটি ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারের মধ্যে কতোটুকু পড়ে, তা এই মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে কেউ এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করলে তা গ্রহণ করে যাচাই-বাছাই করা হবে বলে জানান তিনি। অভিযোগটি ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারের মধ্যে পড়লে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে; অন্যথায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হবে।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আমরা অনেকগুলো বিষয় নিয়ে ইনভেস্টিগেশন করি। আমাদের তদন্ত সংস্থা, প্রসিকিউশন টিম অনেক বিষয় নিয়ে কাজ করি যেহেতু, হয়তো একটা... আমাদের ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালের বিষয়বস্তু নিয়ে হয়তো আমরা একটি ইনভেস্টিগেশন করি, প্রাসঙ্গিক এই ইনভেস্টিগেশনের সূত্র ধরে হয়তো অন্য কোনো ঘটনা হয়তো বেরিয়ে আসে আমাদের কাছে। তানভীর জোহা যে কাজটি করেছেন তা তদন্ত সংস্থারই একটি কাজের অংশ। তিনি কোনো ক্লু হয়তো পেয়েছেন। তিনি যে ক্লুটা পেয়েছেন সেটি আমার সঙ্গে শেয়ারও করেছেন। একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের কোনো কানেকশন থাকতে পারে এর সঙ্গে। অথবা কোনো সামরিক কর্মকর্তা অথবা র?্যাবের কোনো কর্মকর্তা হয়তো এর মধ্যে কোনো কানেকশন থাকতে পারে।