Image description

সারা দেশে লোডশেডিং তীব্র আকার ধারণ করেছে। আর এই লোডশেডিংয়ের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের চালের বাজারে। বিদ্যুতের ঘন ঘন আসা-যাওয়ায় ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে অটো রাইস মিলগুলোর উৎপাদন। বাধ্য হয়ে জেনারেটর দিয়ে মিল চালু রাখতে গিয়ে উৎপাদন খরচ বাড়ছে হু হু করে, যার পুরো দায়ভার এসে পড়ছে সাধারণ ক্রেতার কাঁধে। অথচ দেশে চাহিদার বিপরীতে উদ্বৃত্ত এবং সরকারি গুদামগুলোতে ২৩ লাখ টনেরও বেশি খাদ্যশস্যের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে বলে খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে চালের দাম আরও অস্থিতিশীল হতে পারে। তবে এই সংকটের সুযোগ নিয়ে মিল মালিক ও ব্যবসায়ীদের কোনো সিন্ডিকেট যেন কারসাজি করতে না পারে, সেজন্য বাজারে সরকারের তদারকি বাড়ানোর জোর দাবি জানিয়েছেন ভোক্তারা।

দেশের বেশির ভাগ চাল উৎপাদন হয় স্বয়ংক্রিয় বা অটো রাইস মিলগুলোতে। এসব অটো রাইস মিলগুলো বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। দেশের আধুনিক অটো রাইস মিল ও হাসকিং মিলগুলো বিদ্যুৎ এবং গ্যাস (বয়লার চালনা ও চাল শুকানোর কাজে) দিয়ে পরিচালিত হয়। ধান সিদ্ধ করা থেকে শুরু করে শুকানো এবং চাল ছাঁটাই-পুরো প্রক্রিয়াই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দরকার। ঘন ঘন লোডশেডিং হলে মিলের প্রসেসিং বা অটোমেশন খরচ বেড়ে যায়। ফলে মিল মালিকরা চালের পাইকারি দাম বাড়িয়ে দেন।

এ বিষয়ে চালকল মালিকরা জানান, দিনে-রাতে কয়েক ঘণ্টা পর পরই বিদ্যুৎ থাকছে না। বিদ্যুৎ চলে গেলে বয়লারে থাকা ধান অনেক সময় নষ্ট হয়ে যায়। ফলে মিল সচল রাখতে বাধ্য হয়ে ব্যবহার করতে হচ্ছে ডিজেলচালিত জেনারেটর। এতে চাল ছাঁটাই ও প্রক্রিয়াজাতকরণের খরচও বেড়ে গেছে। খরচ দ্বিগুণ হওয়ায় প্রতি কেজি চাল উৎপাদনে খরচ বাড়ছে ১.৫০ থেকে ২ টাকা পর্যন্ত। তাদের দাবি, বিদ্যুৎ না থাকলে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ঠিকই গুনতে হচ্ছে, যা সার্বিক উৎপাদন ব্যয়কে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

রাজধানীর কাওরান বাজারসহ বিভিন্ন পাইকারি ও খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত কয়েকদিনের ব্যবধানে প্রায় সব ধরনের চালের দাম কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মিনিকেট ও নাজিরশাইলের মতো চিকন চাল বিক্রি হচ্ছে বাড়তি দামে। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ভরসা মাঝারি মানের বিআর-২৮ এবং মোটা চালের দামও ঊর্ধ্বমুখী।
মালিবাগ বাজারের খুচরা চাল ব্যবসায়ী মমিন জানান, পাইকারি বাজারেই যদি ৫০ কেজি বস্তায় ২০০ টাকা বাড়ে, তবে কেজিপ্রতি ৪-৫ টাকা বাড়ানো ছাড়া আমাদের উপায় থাকে না। আমরা প্রতিদিন কেজি মেপে চাল বিক্রি করি, আমাদের তো সিন্ডিকেট করার সুযোগ নেই। বড় ডিলার আর মিলারদের কারসাজির দায় এসে পড়ে আমাদের ওপর।

রাজধানীর কাওরান বাজারসহ একাধিক বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মান ও জাতভেদে সব ধরনের চালের দাম কেজিতে ৩ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মোটা চাল ৫২ থেকে ৫৫ টাকা, বিআর-২৮ চাল ৬০ টাকা, মিনিকেট ৭২ টাকা, নাজিরশাইল ৮৮ টাকা ও কাটারি নাজির ৮৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে। তবে ব্র্যান্ড ও মানভেদে মিনিকেটের দামে পার্থক্য রয়েছে।

কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, দেশে চালের কোনো বাস্তব ঘাটতি নেই। অসাধু করপোরেট গ্রুপগুলোর নিয়মিত অডিট না হওয়া এবং সঠিক তদারকি না থাকায় সিন্ডিকেট তৈরি করে কয়েকগুণ বেশি মুনাফা হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে।

নিয়মিত বাজার তদারকি এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া না হলে চালের বাজার আরও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।