Image description

সম্প্রতি সরকারের ৩০ মন্ত্রী ও হুইপকে নিজ জেলার বাইরে সার্বিক কার্যক্রম তদারকি এবং সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য সাংবিধানিক সংস্থার আইনগত ক্ষমতা খর্ব না করার বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

মূলত সংশ্লিষ্ট জেলায় অপরাধ দমন এবং সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সমন্বয় করবেন তারা। এতে স্থানীয় প্রশাসনের কাজের গতি বাড়ার পাশাপাশি সরকারের সঙ্গে মাঠ প্রশাসনের দূরত্বও কমবে বলে মনে করছে সরকার। উচ্চ পর্যায়ের তদারকি থাকলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সমস্যা দ্রুত চিহ্নিত করা এবং প্রশাসনিক কাজে গতি বাড়ানোর পাশাপাশি জনসেবায় নজরদারি জোরদার হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

অবশ্য এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মন্ত্রীদের অবৈধ হস্তক্ষেপের আশঙ্কা করছেন বিরোধী দলীয় এমপিরা। তাদের দাবি, এমনটি আগেও করার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু হাইকোর্ট  বিষয়টিকে আগে থেকেই অবৈধ ঘোষণা করে রেখেছে। তারপরও এখন আবার সরকার কেন এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সেটি বোধগম্য নয়। সে কারণেই বিষয়টিতে আপত্তি তুলেছেন তারা।

বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা মনে করেন, তদারকি ও সমন্বয়ের পরিবর্তে বিষয়টিতে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর্যায়ে চলে গেলে এর ফল উল্টো হতে পারে। এমন আশঙ্কা থেকেই সেই প্রজ্ঞাপনকে বিধিবহির্ভূত আখ্যায়িত করে তা বাতিলের দাবি জানিয়ে হাইকোর্টে রিট করেছেন তারা।

আবার অনেকে বিষয়টিকে স্বাভাবিক হিসেবেই দেখছেন। তারা মনে করেন, অতীতেও এই নিয়ম ছিল। এটি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য করা হয়েছে বলে মনে হয় না।

জানতে চাইলে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক ও রাজনীতি বিশ্লেষক বজলুর রশিদ ফিরোজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও উন্নয়ন তদারকির জন্য মন্ত্রী-হুইপদের দায়িত্ব দেওয়ার নিয়ম আগেও ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এবার এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। এ কমিটিতে তো শুধু মন্ত্রী বা হুইপরাই থাকেন না। সরকার ও বিরোধী দলের স্থানীয় এমপিরাও থাকেন। বিষয়টি নতুন কিছু নয়। ফলে বিরোধী দলের আপত্তির বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয়। তারা হাইকোর্টের যে দোহাই দিচ্ছে, সেটাও পুরোপুরি আমলে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ সব পর্যবেক্ষণই মানতে হবে এমন কোনও কথা নেই। তারপরও  বিরোধী দলীয় এমপিরা আগে বিষয়টি দেখুক। সেখানে সত্যিই যদি কোনও অন্যায় হস্তক্ষেপের শিকার হন, তাহলে তো কথা বলার সুযোগ আছে।’’

সরকারি প্রজ্ঞাপন ও বিরোধী দলের রিটে কী আছে?

গত ২৭ আগস্ট মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের হুইপদের জেলাভিত্তিক সরকারি কার্যাবলি তদারকি ও সমন্বয়ের জন্য দায়িত্ব প্রদান–সম্পর্কিত প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এতে ৬৪ জেলায় সরকারি কার্যক্রম তদারকি ও সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ৩০ মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের হুইপকে। এর মধ্যে কেউ একটি, কেউ দুই থেকে তিনটি জেলার দায়িত্ব পেয়েছেন।

প্রজ্ঞাপনে সংবিধানের ৫৫(২) অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বা তার কর্তৃত্বে প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়। এ ছাড়া রুলস অব বিজনেসের ৩৩ নম্বর বিধি অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী প্রয়োজন মনে করলে যেকোনও ক্ষেত্রে ওই বিধিমালা থেকে বিচ্যুতির অনুমতি দিতে পারেন।

রুলস অব বিজনেসের সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী বিষয়টি মন্ত্রিসভায় পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে হাইকোর্ট বিভাগের রিট পিটিশন মামলা নম্বর ৩৫১২-২০০৩-এর রায়ের আলোকে এ ধরনের দায়িত্ব বণ্টন সরকারের এখতিয়ারের মধ্যে রয়েছে বলে জানানো হয়। অপরদিকে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে বিধিবহির্ভূত বলে দাবি করা হচ্ছে। এ নিয়ে তারা হাইকোর্টে রিটও করেছেন।

তাদের দাবি, ২০০১ সালে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও হুইপদের জেলাভিত্তিক তদারকি বা দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তকে হাইকোর্ট বিভাগ থেকে অসাংবিধানিক বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাই বর্তমান সংবিধান, রুলস অব বিজনেস এবং হাইকোর্টের সেই পূর্ববর্তী রায়ের আলোকে এ ধরনের সিদ্ধান্ত আইনি এখতিয়ারবহির্ভূত।

এ কারণে প্রজ্ঞাপনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রবিবার (৩০ আগস্ট) হাইকোর্টে রিট দায়ের করেছেন প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী থেকে নির্বাচিত পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দলটির ১১ জন সংসদ সদস্য। এতে জারি করা দায়িত্ব বণ্টন-সম্পর্কিত প্রজ্ঞাপনটি কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, এ বিষয়ে রুল চাওয়া হয়েছে।

কেন অনীহা বিরোধী দলের?

দেশের ৬৪ জেলার উন্নয়ন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তদারকির জন্য সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও হুইপকে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টিকে নেতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। তাদের অভিযোগ, এমনিতেই বিরোধী দলীয় এমপিদের আসনে উন্নয়ন বরাদ্দ কম দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে আবার সরকার দলীয় নারী এমপিদের খবরদারি করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এখন যদি অন্য জেলার মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও হুইপরা তাদের ওপর কর্তৃত্ব করে, তাহলে এটি আরও জটিলতা তৈরি করতে পারে। তাদের আশঙ্কা, এসব কমিটিতে জেলার সরকারি দলের সদস্যরাও থাকলেও মূল ছড়ি ঘুরানো হবে বিরোধী এমপিদের ওপর।

এ বিষয়ে জানতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) যুগ্ম-আহ্বায়ক ও কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. আতিকুর রহমান মোজাহিদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমরা যতটুকু জানি, আসলে মন্ত্রীরা কোনও নির্দিষ্ট জেলার হতে পারেন না। তাদের মন্ত্রী বানানো হয় সারা বাংলাদেশের জন্য। আর একটি নির্দিষ্ট এলাকার মানুষ একজনকে এমপি বানিয়েছে সেই এলাকার উন্নয়ন এবং  মানুষের কথা তুলে ধরার জন্য।’’

তিনি বলেন, ‘‘কিন্তু এখানে আবার ৩০ জন মন্ত্রীকে জেলাগুলোতে ভাগ করে দেওয়া হলে এলাকার সংসদ সদস্যদের আসলে কোনও কাজ থাকে না। এতে তাদের ক্ষমতা আরও খর্ব করা হয়। এ নিয়ে  হাইকোর্টের একটা রায় আছে এবং এর আগেও এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার  চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে আদালত থেকে সেটি বাতিল এবং অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়েছে। আমরা মনে করি, আইনশৃঙ্খলার বিষয়ে তদারকির দরকার হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই এলাকার সংসদ সদস্য স্টেকহোল্ডার সবাইকে নিয়ে আলাদা কমিটির গঠন করে এক্সারসাইজ করতে পারে।’’

তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘‘এটি কোন ধরনের প্যাটার্ন? মানে হচ্ছে, ৩০ জন ব্যক্তিই বাংলাদেশ হয়ে যাবে। তাহলে আল্টিমেটলি ওই যে ইনক্লুসিভ সবাই মিলে বাংলাদেশ গড়ার যেটা মোশন, সেটা এখানে থাকবে না। এটা আরও বেশি অন্যায্য। যারা প্রতিনিধি তাদের  ক্ষমতা অনেক কমে যাবে এবং জনগণের অনেক বেশি ভোগান্তি হবে। এতে দলীয়করণটা আরও বেশি এক্সট্রিম হবে।’’

একই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের এমপি সাইফুল আলম খান মিলন। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘সরকার বিরোধী দলীয় এমপিদের কার্যক্রম ও ক্ষমতাকে সংকুচিত করতে চায়। আমাদের মাথার ওপর সরকার দলীয় নারী এমপিদের বসিয়ে দিয়েছে। তারা নানাভাবে অনৈতিক হস্তক্ষেপ করছে। আমরা মনে করি, এখন আবার নতুন করে এ ধরনের প্রজ্ঞাপন মরার ওপর খড়ার ঘা।’

ক্ষমতাসীনদের ব্যাখ্যা

জেলার উন্নয়ন ও আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক কর্মকাণ্ড তদারকিতে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও হুইপদের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টিকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। তারা মনে করেন, অতীতেও এমনটি ছিল। পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে আদালতের পর্যবেক্ষণ বিবেচনায় রেখেই নতুন প্রজ্ঞাপন দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

বিষয়ে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি সাংবাদিকদের জানান, সরকারের কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো এবং সরকার যেসব বিষয়ে প্রত্যাশা করছে—সেগুলো বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও হুইপরা স্থানীয় প্রশাসনকে সহযোগিতা করবেন। ডিসি, ইউএনও ও এসপিসহ স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়াই তাদের মূল দায়িত্ব।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান এমপি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘মন্ত্রিপরিষদের পক্ষ থেকে যে প্রজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে, তা নতুন কিছু নয়। অতীতেও জেলার অবকাঠামো উন্নয়ন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তদারকি করার জন্য এ ধরনের উদ্যোগ ছিল। আমরা মনে করি, এর মাধ্যমে এক ধরনের সমন্বয় তৈরি হবে।’’

তিনি বলেন, ‘‘এতে তো শুধু ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী বা এমপিরা থাকবেন না। সংশ্লিষ্ট জেলার বিরোধীদলীয় এমপিরাও তো থাকবেন। তাই বিষয়টি নিয়ে অহেতুক বিতর্ক তৈরি করা সমীচীন নয়।’’