Image description

দুই বছর ধরেই খুনোখুনি, হামলা, চাঁদাবাজি ও কিশোর অপরাধীদের দৌরাত্ম্যে দক্ষিণ পশ্চিমের বিভাগীয় শহর খুলনা অশান্ত হয়ে উঠেছে। চলতি আগস্টের পরিস্থিতি আরও খারাপ। চাঁদাবাজদের অত্যাচারে বড় বড় ব্যবসায়ীরা তাদের মোবাইল ফোন পর্যন্ত বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, কথায় কথায় ‘মব’ বা দলবদ্ধ সন্ত্রাস সৃষ্টি করে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো হচ্ছে। এ ধরনের ‘মব’ সন্ত্রাসের কারণে মাঠপর্যায়ে পুলিশ কর্মকর্তারাও সাহস দেখাতে পারছেন না। এসব কারণেই খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হচ্ছে না।

পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের একার পক্ষে এই বিশৃঙ্খলা দমন করা সম্ভব নয়। তারা পরিস্থিতির উন্নয়নে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পেশাজীবী সংগঠনসহ সমগ্র নাগরিক সমাজকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার তাগিদ দিয়েছে।

পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের একার পক্ষে এই বিশৃঙ্খলা দমন করা সম্ভব নয়। তারা পরিস্থিতির উন্নয়নে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পেশাজীবী সংগঠনসহ সমগ্র নাগরিক সমাজকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার তাগিদ দিয়েছে।

খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘৫ আগস্টের (২০২৪ সালের) পর এ অঞ্চলে খুন, মাদকে সয়লাব হয়ে গেছে। গত কয়েকদিনের সন্ত্রাসী ঘটনা উদ্বেগজনক। শহর জুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে বলেছে যে- তারা চাঁদাবাজদের ভয়ে ফোন ধরতে পারছেন না। এ অবস্থা চলতে পারে না।’

রক্তাক্ত আগস্ট

খুলনা মহানগর পুলিশের অপরাধ শাখা বলছে, চলতি বছরের ৭ মাস ২০ দিনে কেবল নগরীতে ২৪টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, শুধুমাত্র মাদককাণ্ডেই ঘটেছে নয়টি। এ সময়ে ২ হাজার ৮১৯ জন সন্দেহভাজন অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে জেল হাজাতে পাঠানো হলেও বেশিরভাগই জামিনে বেরিয়ে ফের অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে।

গত ১৯ আগস্ট নগরীর লবণচরা থানাধীন শিশু বাগান আশি বিঘা এলাকায় মাত্র তিন ঘণ্টার ব্যবধানে নাজমুল ও মো. মনজুরুল ইসলাম নামে দুইজনকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়।

আগের দিন রাতে উপজেলার নৈহাটি ইউনিয়নের দেবীপুর গ্রামের আবু সালেহীন প্রতিবন্ধী স্কুলের সামনে খুলনার তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রেনেড বাবুর ‘বি কোম্পানি’র সদস্য মীর মামুনকে গুলি করা হয়।

একই দিনে নগরীর রায়েরমহল বাজারের বড় মসজিদের কাছে রাজু নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
১৫ আগস্ট রাতে রূপসা উপজেলার আইচগাতি ইউনিয়নের দুর্জনী মহল গ্রামে জয় ঢালীকে নামে একজনকে জবাই করে হত্যা করা হয়। ১২ আগস্ট রাতে রূপসা উপজেলার শ্রীরামপুরে ফখরুল শেখ নামে এক যুবদল কর্মীকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

একই দিনে নগরীর মুজগুন্নী আবাসিক এলাকায় খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল বিভাগের অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় অস্ত্রধারীরা।

১০ আগস্ট নগরীর সোনাডাঙ্গায় বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি- ওজোপাডিকো কার্যালয়ের সামনে শিমুল নামের এক গৃহবধূকে গুলি করা হয়।

৯ আগস্ট ফরাজীপাড়ার আকবর স্টোরের সামনে বটিয়াঘাটা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা অনিন্দ্য কুমার দাসকে কুপিয়ে জখম করা হয়। তার আগের দিন বটিয়াঘাটা উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব বাহদুর মুন্সির বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি করে অস্ত্রধারীরা।

৯ আগস্ট ফরাজীপাড়ার আকবর স্টোরের সামনে বটিয়াঘাটা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা অনিন্দ্য কুমার দাসকে কুপিয়ে জখম করা হয়। তার আগের দিন বটিয়াঘাটা উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব বাহদুর মুন্সির বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি করে অস্ত্রধারীরা।

১ আগস্ট রাতে নগরীর টুটপাড়া এলাকায় ইসমাইল নামে এক যুবককে গুলি করে হত্যা করা হয়।

অস্ত্রের চালান আসে যেভাবে

খুলনায় ইদানীংকালের হত্যাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে প্রায় একই ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করছে সন্ত্রাসীরা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো বলছে, অস্ত্রগুলো বেশিভাগ যশোর ও সীমান্তবর্তী জেলাগুলো থেকে খুলনায় আসছে।

র‍্যাব-৬-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নিস্তার আহমেদ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, যশোরের একটি অভিযানে অস্ত্রসহ তিনজনকে আটকের পর অবৈধ অস্ত্র চোরাচালানের এক অভিনব কৌশল সম্পর্কে তথ্য জানা গেছে।

তিনি বলেন, অপরাধী চক্রগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে আস্ত অস্ত্র না এনে তা খুলে বিভিন্ন ধাপে ধাপে যন্ত্রাংশ পাঠায়। একদিন ব্যারেল, অন্যদিন ম্যাগাজিন, আরেকদিন রিসিভার কভার বা ট্রিগার মেকানিজম পাঠানো হয়। পরে সেগুলোকে জোড়া লাগিয়ে পূর্ণাঙ্গ অস্ত্র প্রস্তুত করা হয়।

অ্যাপ দিয়ে পুলিশকে টেক্কা

খুলনার বিভিন্ন সন্ত্রাসী দল বিভিন্ন মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে অঘটন ঘটিয়ে দ্রুত এলাকা ছাড়ছে। তারা একে অপরকে ‘এনক্রিপটেড তথ্যও দিচ্ছে বলে জানান গোয়েন্দারা। এই অ্যাপগুলোর উপর পুলিশের পূর্ণনিয়ন্ত্রণ না থাকায় বেগে পেতে হচ্ছে সরকারি বাহিনীর।

অ্যাপ দিয়ে পুলিশকে টেক্কা

খুলনার বিভিন্ন সন্ত্রাসী দল বিভিন্ন মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে অঘটন ঘটিয়ে দ্রুত এলাকা ছাড়ছে। তারা একে অপরকে ‘এনক্রিপটেড তথ্যও দিচ্ছে বলে জানান গোয়েন্দারা। এই অ্যাপগুলোর উপর পুলিশের পূর্ণনিয়ন্ত্রণ না থাকায় বেগে পেতে হচ্ছে সরকারি বাহিনীর।

খুলনা মহানগর পুলিশের ডেপুটি কমিশনার ও ডিবি প্রধান মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া টাইসকে বলেন, সন্ত্রাসীরা এমন কিছু নম্বর ব্যবহার করে যা অনুসরণ করা দুরূহ হয়ে পরে। কিছু মাস্কিং অ্যাপ ব্যবহারের কারণে তাদের ফোন নম্বর প্রকাশ হয় না।

‘এরা এক এলাকায় ঘটনা ঘটিয়ে আরেক এলাকায় চলে যায়। ফলে এদের খুঁজে পেতে বেগ পেতে হয়। এই বিষয়গুলোকে মাথায় রেখে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত করলে এদেরকে শনাক্ত করে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে’, বলেন তিনি।

উত্থান কবে থেকে

আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও আইন বিশেষজ্ঞরাই মনে করেন ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সুযোগ নিয়েছে সন্ত্রাসী দলগুলো।

সরকার পতনের আগে নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ব্যক্তিরা গ্যাংগুলো নিয়ন্ত্রণ করত, এলাকাও ভাগ করা ছিল। কিন্তু ২০২৪ সলের ৫ আগস্টের পর নিয়ন্ত্রকরা না থাকায় সন্ত্রাসী দলগুলো নিজেদের মধ্যে এলাকার কর্তৃত্ব দখলে নিজেদের মধ্যে ‘গ্যাং ওয়ার’ শুরু করে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের প্রধান পুনাম চক্রবর্তী টাইমসকে বলেন, ‘এটি শুধু খুলনা নয়, বরং পুরো বাংলাদেশেই একটি সাধারণ চিত্রে পরিণত হয়েছে। একসময়ের শান্ত শহর খুলনা আজ খুন ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে অশান্ত হয়ে উঠেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকা কিশোরদের একটি অংশ শক্তির সঠিক মূল্যায়ন না করে বেয়াদবি বা আস্ফালনকেই শক্তি হিসেবে ধরে নিয়েছে। অথচ তাদের নিয়ন্ত্রণ করার মতো পরিবার বা প্রশাসন কেউ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।’

অনেক সময় অপরাধী গ্রেপ্তারের পর তাদের ফুলের মালা দিয়ে ছাড়িয়ে নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটায় পুলিশও তাদের মনোবল হারাচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।

খুলনা জেলার সদ্য বিদায়ী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম টাইমসকে বলেন, ‘মাদক, আধিপত্যবিস্তার ও চাঁদাবজি ঘটনা খুলনা অস্থিতিশীলের পেছনে অনেকটাই দায়ী। এ অঞ্চলে ৯৫ শতাংশ খুনের ঘটনাই ঘটেছে মাদককাণ্ডে।’

কেন পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না- এই প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের ভীতি কাজ করছে। আমরা চেষ্টা করছি পুলিশের মনোবল ফিরিয়ে আনতে।’

রাজনৈতিক দলকে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে বলেও মত দিয়ে এই পুলিশ কর্তা বলেন, ‘কেউ না কেউ গোপনে অপরাধীদের সহযোগিতা করে। যার কারণে এ অঞ্চলে সন্ত্রাসী, চরমপন্থীদের অপতৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে।’

খুলনা মহানগর পুলিশের ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (সদর) এস এম শাকিলুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের কার্যক্রম থেমে নেই। অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার আছে। আসামিও ধরা হয়েছে।’

‘হরিণটানা এলাকার দুটি খুনের ঘটনায় সন্দেহের তালিকায় সাইফি নামের এক সন্ত্রাসীর নাম আসছে। তাকেও এর আগে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। কিন্তু সম্প্রতি হাইকোর্ট থেকে জামিনে বের হয়েছে সে’, বলেন তিনি।

খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের একটি তালিকা আছে, তাদের কাছে থাকা অস্ত্রেরও তালিকা আছে। কিন্তু সেগুলো উদ্ধার হচ্ছে না। তারা গ্রেপ্তার হচ্ছে না।’

খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি ও খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষর চেয়ারম্যান এসএম শফিকুল আলম মনা বলেন, ‘যে কোনো মূল্যে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থামাতে হবে। নগরবাসীর মধ্যে যে আতঙ্ক বিরাজ করছে তা নিরসন করতে পদক্ষেপ নিতে হবে।’

‘বিএনপি সরকার নাগরিকদের জান-মালের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্যই ক্ষমতায় এসেছে। কাজেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যথাযথ দায়িত্ব পালনের মধ্যদিয়েই কাজ করতে হবে’, বলেন তিনি।

খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ‘আমি ইতোমধ্যেই নতুন কেএমপি কমিশনারের সঙ্গে কথা বলেছি। তার কিছু পরিকল্পনা আছে। সন্ত্রাসকবলিত এলাকায় বিশেষ ক্যাম্প স্থাপন করা হলে অপরাধ কমবে। এক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন সবধরণের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।’