রাজধানীর উপকন্ঠ সাভার যেন অপরিকল্পিত এক নগরীর প্রতিচ্ছবি। প্রায় কোটি মানুষের এই উপজেলায় নাগরিক সুযোগ সুবিধার অভাব যেমন প্রকট, তেমনি এটি অপরাধের আরেক রাজ্য বলা চলে।
খুন, ধর্ষণ, মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, জঙ্গি আস্তানা, দখল এখানকার প্রতিদিনকার ঘটনা। বিশাল এলাকায় দুটি থানা, একটি ফাঁড়ি ও পাঁচটি পুলিশ ক্যাম্প জনবল ও যানবাহনের সংকটে হাঁপিয়ে উঠেছে।
জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকতা, নাগরিক ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা বলছেন, তিন দশক আগে থেকে যেভাবে স্থাপনা, মিলকারখানা স্থাপন করা হয়েছে তা তদারকি করা হয়নি। এভাবে চলতে থাকলে সাভার শিঘ্রই বসবাস অযোগ্য নগরীতে পরিণত হবে।
২৮০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের উপজেলাটি একটি পৌরসভা ও ১২টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। তিনটি সংসদীয় আসনের সীমানা অন্তর্ভুক্ত উপজেলায় ভোটার সংখ্যা সোয়া ৯ লাখ হলেও এখানকার বাসিন্দা সরকারি হিসাবে প্রায় ৯০ লাখ। এর একটি বড় অংশ শ্রমজীরী।
সম্প্রতি সাভারে জঙ্গি আস্তানা এবং দুটি পেশার কুকার বোমা উদ্ধারের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলার নাজুক চিত্র নতুন করে সামনে এসেছে।
স্থানীয়রা বলছেন, সাভারের যে নিরাপত্তা দুর্বলতা, সেটাকেই কাজে লাগাচ্ছে উগ্রপন্থিরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও বলেন, পুলিশের দেওয়া ভাড়াটিয়া ফরম পূরণ না করে অপরাধীরা সেখানে নির্বিঘ্নে বসবাস করছে।
সাভার সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাকিবুল হাসান ঈশান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেছেন, ‘জঙ্গি আটক ও বোমা উদ্ধারের পর ভাড়াটিয়া নিবন্ধন ফরম পূরণ বাধ্যতামূলক করতে জোর দেওয়া হয়েছে।’
পুলিশ বলছে, তদন্ত, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে ভিআইপি প্রটোকলে তাদের বাহন ও জনবল ব্যস্ত থাকে প্রতিদিন। রাতে কিছুটা থাকলেও দিনে টহল থাকে না। এই সুযোগে অপরাধীরা অঘটন ঘটিয়ে সরে যায় নির্বিঘ্নে।
আবার ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক ছাড়াও সাভারে চারদিক দিয়ে ঢোকা ও বের হওয়া যায়। এর মধ্যে নবীনগর-চন্দ্রা সড়ক, আশুলিয়া, বিরুলিয়া রুট, হেমায়েতপুর সিংগাইর রুট, তেঁতুলঝোড়া ও ভাকুর্তার রুট দিয়ে যাতায়াতের পথ রয়েছে। আছে নদীপথে চলাচলের সুযোগ। একাধিক রুট থাকায় অপরাধীরা নির্বিঘ্নে চলে যেতে পারে।
কুটুরিয়া গ্রামের বোরহান উদ্দিন টাইমসকে বলেন, ‘দিনের বেলাতেই মাদক কারবারি, বখাটে ও কিশোর গ্যাংয়ের আনাগোনা থাকে। রাতের কোনো নিশ্চয়তা নেই। নিরাপত্তা নিয়ে উৎকন্ঠা তৈরি হয়েছে।’
সাভার নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক সালাহ উদ্দিন খান নঈম বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে জনসংখ্যার অনুপাতে আরও থানা, ফাঁড়ি ও তদন্ত কেন্দ্র করা প্রয়োজন।’
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাকিবুল হাসান ঈশান নিজেই বলেছেন, ঢাকায় অপরাধ করে অনেকে সাভারে আত্মগোপন করে। তার মতে, জনসংখ্যার তুলনায় পুলিশ ও যানবাহন খুবই কম, যেটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় একটি বড় বাধা।
তিনি বলেন, ‘ঘনবসতির এই এলাকায় একজন পুলিশ ১২-১৪ ঘণ্টা টানা ডিউটি করে, যা অমানবিক।’
আশুলিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম বলেছেন, ‘এখানে অপরাধের শেষ নেই। মাদক ও সংশ্লিষ্ট অপরাধ, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে।’
মাসে গড়ে দেড়শরও বেশি মামলা হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এর মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, পারিবারিক সহিংসতা এবং বাল্য বিয়ের অভিযোগ বেশি। গত জুন মাসে মামলা হয়েছে ১৭১টি।’
সাভার মডেল থানার ওসি মো. সাইফুল আলম জানিয়েছেন, তাদের থানায় মাসে গড়ে ১০০ থেকে ১২০টি মামলা হয়। এর অর্ধেক মাদক সংক্রান্ত।
নাগরিক সুবিধাও অপ্রতুল
দুটি রপ্তানি প্রক্রিয়া অঞ্চল ছাড়াও সাভারে তিন হাজার শিল্প কারখানার শ্রমিকই আছে প্রায় ৫০ লাখ। আবাসিক এলাকাতেও যত্রতত্র কারাখানা গড়ে উঠছে। দুর্ভোগে নতুন যোগ হয়েছে চামড়া শিল্পনগরী। এখান থেকে পরিশোধন ছাড়াই বর্জ্য যাচ্ছে নদীতে।
পৌরসভা, রাজউক ও ইউনিয়ন পরিষদ থেকে অনুমোদন নিয়ে বা অনুমোদন ছাড়া গড়ে উঠা আবাসন প্রকল্প, বাসাবাড়ি, বহুভবন, কারখানা নির্মাণেও নেই কোনো তদারকি।
বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা, নদী দখল, আবর্জনার ভাগাড়, ভাঙা রাস্তা, ড্রেনেজ ও সড়ক বাতির স্বল্পতাসহ নানা অভিযোগ বাসিন্দাদের।
নাগরিক কমিটির সালাহ উদ্দিন খান নঈম বলেছেন, নাগরিক সুবিধা বাড়াতে সাভার সিটি কর্পোরেশন এবং সাভার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ দরকার।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, নাগরিক সেবার মান বাড়াতে সাভার পৌরসভার পরিধি বাড়ানো, আমিন বাজার ও আশুলিয়ায় পৃথক পৌরসভা করার কথা সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।
ব্যাংক কলোনি মহল্লার বাসিন্দা আব্দুর রহমান বলেন, ‘প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হলেও নাগরিক সুবিধা খুবই নিম্নমানের। রাজধানীর উপকণ্ঠের এই এলাকা যেন বাতির নিচে অন্ধকার এক শহর।’
তৈয়বপুর গ্রামের বাসিন্দা বজলুর রহমান বলেন, ‘৬৪ জেলার মানুষই জীবিকার প্রয়োজনে সাভারে বসবাস করে। তাদের চাপে আদি বাসিন্দারা এখানে সংখ্যালঘু।’
পাথালিয়ার পানধোয়া গ্রামের আব্দুল মালেক বলেন, ‘সব কয়টি ইউনিয়নে কৃষি জমি ছিল। ধান, গম, সরিষাসহ বিভিন্ন ধরনের সবজির খ্যাতি ছিল সাভারের। গত তিন দশকে কৃষিপণ্য উৎপাদন প্রায় বিলুপ্তির পথে। জমি ভরাট করে আবাসিক ভবন ও মিল কারখানা গড়ে উঠেছে।’
সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম টাইমসকে বলেন, ‘কয়েক দশক আগেই অপরিকল্পিতভাবে সাভার গড়ে উঠেছে। যার খেসারত এখন দিতে হচ্ছে।’
তিনি জানান, রাজউকের ডিটেইলস এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) এর আওয়ায় এখন ভবন নির্মাণে অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। তবে এর আগেই হাজার হাজার অপরিকল্পিত স্থাপনা গড়ে উঠেছে।
ইউএনও নিজেই বলেন, ‘বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ দূষণ, কৃষি জমিতে আবাসন প্রকল্প, নদী-নালা দুষণ ও দখল, জলাবদ্ধতা, হকার, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি, বাল্যবিবাহসহ নানাবিধ সমস্যা এখানকার নিত্যদিনের চিত্র। সবকিছু সামলাতে প্রশাসনকে বেগ পোহাতে হয়।’
সাভার নদী ও পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদ-এর সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শামসুল হক বলেন, ‘ইটিপি থাকলেও ব্যয়বহুল হওয়ায় ব্যবহার নেই। ট্যানারি দূষণ করছে ধলেশ্বরী নদী, বংশী নদী দখল করে স্টেডিয়াম বানানো হয়েছে। কোনো প্রতিকার নেই।’
সাভার পৌরসভার সাবেক মেয়র রেফাত উল্লাহ বলেন, ‘এখানে সমস্যার অন্ত নেই। কোনটা রেখে কোনটা বলব?’
তার মতে, সংকট নিরসনে স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক দল ও প্রশাসনের সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার।
বিচ্ছিন্ন জনপদ কাউন্দিয়া
তুরাগ-বুড়িগঙ্গা নদীর সংযোগ স্থলে গড়ে উঠা কাউন্দিয়া সাভারের একটি ইউনিয়ন। এখানকার বাসিন্দাদের যোগাযোগ মিরপুরকেন্দ্রিক। জমি নিবন্ধন, থানায় মামলা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাজ ছাড়া সাধারণত তারা সাভারে যান না।
ইউনিয়নের বাইরে চলাচলের একমাত্র বাহন নৌকা। সেখানে যোগাযোগের জন্য সেতু নির্মাণে প্রকল্প নিয়ে একাধিক সমীক্ষা যাচাই হলেও তা আর আলোর পথ দেখেনি।
ইউনিয়নের সাবেক একজন চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘তুরাগ নদীতে সংযোগ সেতু এলাকাবাসীর প্রাণের দাবি।’
আরেকজন সাবেক চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘বাসিন্দারা ঢাকার মধ্যে ঢুকে যেতে চান। সাভার থানার বদলে ইউনিয়ন দারুস সালামের অন্তর্ভুক্ত হলে নাগরিক সুবিধা সহজ হবে, অপরাধীরাও সাহস হারাবে।’