Image description

তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) কার্গো সংকটের কারণে গ্যাস সরবরাহ আরও কমেছে। এতে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে; অন্যদিকে চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু কয়লা ও জ্বালানি তেল সংকট, রক্ষণাবেক্ষণ ও যান্ত্রিক ত্রুটিতে উৎপাদন কম হওয়ায় বেড়েছে লোডশেডিং। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে গ্যাস সরবরাহের উন্নতি হবে না। আর গরম না কমলে কমবে না লোডশেডিং।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য, গত বৃহস্পতিবার বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ৬৯৯ মেগাওয়াট। গড় চাহিদা ছিল ১৬ হাজার থেকে সাড়ে ১৬ হাজার মেগাওয়াট। ওইদিন সর্বোচ্চ ৩৬৬৪ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়। গতকাল শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় চাহিদা প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াটের মতো কমে যায়। এরপরও মধ্যরাতে ৩২৪৪ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়। পরে দিনের বেলায় চাহিদা কমার সঙ্গে সঙ্গে লোডশেডিং কিছুটা কমে। বেলা ৩টায় ১৪ হাজার ৬৮৪ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে লোডশেডিং ছিল ১৪৮৩ মেগাওয়াট।

গত বুধবার ছুটির দিন মধ্যরাতে লোডশেডিং ২৮২৮ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। এর আগে গত ১০ আগস্ট রেকর্ড ৩৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়। আর চাহিদা ছাড়িয়ে যায় ১৭ হাজার মেগাওয়াট।

৯ আগস্ট থেকে এক সপ্তাহ টানা সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে গড়ে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট। এরপর এটি কিছুটা কমলেও গরম বৃদ্ধি পাওয়ায় তিন দিন ধরে আবার বাড়ছে লোডশেডিং।

দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ না থাকা, কোথাও কোথাও ঘন ঘন বিদ্যুতের আসা-যাওয়ার কারণে প্রচণ্ড গরমে মানুষ হাঁসফাঁস করছেন। বিশেষ করে নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষ বড় বিপাকে পড়েছেন। কারখানার মালিক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাও পড়েছেন মহাসংকটে। তাদের আয় রোজগার অনেক কমে গেছে। ঢাকার বাইরে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতের ভয়াবহ লোডশেডিং চলছে। মাঝেমধ্যে বৃষ্টি হলে কিংবা তাপমাত্রা কমলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা কমে, গরম পড়লে এটি বেড়ে যায়।

গ্রামে লোডশেডিং কিছুটা কমাতে গত ১২ আগস্ট রাত থেকে সরকারি নির্দেশনায় ঢাকাতেও লোডশেডিং করা হচ্ছে। প্রতিদিন ঢাকার কোনো একটি এলাকায় একবার এক ঘণ্টা করে লোডশেডিং করার কথা থাকলেও সেটি মানা হচ্ছে না।

পিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম আগামীর সময়কে জানালেন, গরমে চাহিদা বেড়ে গেছে। আবার শিল্পের কথা বিবেচনা করে সেখানে গ্যাস সরবরাহ বাড়িয়ে বিদ্যুতে গ্যাস কমেছে। এছাড়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকেও কমেছে উৎপাদন। এ কারণেই লোডশেডিং বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়িয়ে যতটা সম্ভব সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

দেশে গ্যাস থেকে সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও গ্যাস সংকটের কারণে কখনই পুরোপুরি উৎপাদন করা যায় না। তবে ৫ থেকে সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসে এখান থেকে। সম্প্রতি গ্যাস সরবরাহ আরও কমে যাওয়ায় গড়ে উৎপাদন হচ্ছে ৫ হাজার মেগাওয়াট।

বিদ্যুতের বড় নির্ভরশীলতার জায়গা হলো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। এখান থেকে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও গতকাল তা ৫ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমেছে।

কারিগরি ত্রুটির কারণে পটুয়াখালীর পায়রা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ। বড়পুকুরিয়া কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুটি ইউনিটে কারিগরি ত্রুটি আছে। এর বাইরে কয়লা সংকটের কারণেও কিছু উৎপাদন ব্যহত হচ্ছে।

এর বাইরে ভারতীয় প্রতিষ্টান আদানি প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করলেও বেশ কয়েকদিন ধরে কয়লা সংকটের কারণে গড়ে ৯০০-১০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে।

দেশে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা ৬ হাজার ৪শ মেগাওয়াট হলেও গড়ে ২ থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন হয়। লোডশেডিং বেড়ে গেলে বিশেষ করে রাতে বাড়ানো হয় তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন। ফার্নেস অয়েল দিয়ে ৪ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি নিলেও বেসরকারি কেন্দ্রের মালিকদের বকেয়ার কারণে তা পুরোপুরি করা সম্ভব হচ্ছে না।

তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানো হলে পিডিবির লোকসান ও সরকারের ভর্তুকি অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে এক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে।

তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি ও রাইজিং ফ্যাশনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদ হাসান খান আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘বিশ্ব বাজারে এলএনজি দাম এখন আকাশচুম্বী হওয়ায় এলএনজি এবং ফার্নেস ওয়েল দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম প্রায় কাছাকাছি। তবে ফার্নেস ওয়েল আমদানির জন্য ৩০ শতাংশ শুল্ক দিতে হয় আর এলএনজি আমদানিতে মাত্র ৫ শতাংশ। বর্তমান পরিস্থিতিতে আগামী ৬ মাস বা ১ বছরের জন্য এই শুল্ক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। এটা করা হলে ফার্নেস ওয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় আরও কমবে।

গ্যাস সরবরাহ আরও কমেছে: পেট্রোবাংলার তথ্য বলছে, এলএনজি সরবরাহ কমতে থাকায় মোট গ্যাস সরবরাহও কমছে। চারদিন আগে এলএনজি সরবরাহ ৭৭-৭৮ কোটি ঘনফুট হলেও গত কয়েকদিনে তা কমতে কমতে এখন গড়ে ৭২ কোটি ঘনফুটে নেমেছে। আর দেশীয় কূপ থেকে ১৬১-১৬২ কোটি ঘনফুটসহ সবমিলে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে ২৩৩ কোটি ঘনফুটের মতো।

বর্তমানে সরকারি হিসেবে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। বাস্তবে চাহিদা ৫০০ থেকে ৫৫০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে ২৬৫ কোটি ঘনফুটের মতো গ্যাস সরবরাহ করা হয়।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মহেশখালীতে এলএনজি’র দুটি টার্মিনালই সচল বেশ কয়েকদিন ধরে। কিন্তু এলএনজি আমদানি ব্যহত হওয়ায় সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে হঠাৎ করে সংকট বেশি না হয়। দুটি টার্মিনালের দৈনিক গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতা ১১০ কোটি ঘনফুটের মতো। কিন্তু সেখান থেকে গড়ে ৭৫ কোটি ঘনফুট সরবরাহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও নতুন কার্গো না আসায় সরবরাহ প্রতিদিনই কমছে।

আজ শনিবার একটি কার্গো আসার কথা থাকলেও তা আসবে না। পহেলা সেপ্টেম্বর এবং ৪ সেপ্টেম্বর ২টি কার্গোর নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে। এটি পাওয়া গেলে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়তে পারে। তবে সহসা সংকট কমার কোন সম্ভাবনা দেখছেন না জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা। কারণ উচ্চমূল্য আর সরবরাহকারীদের সাড়া কম মেলার কারণে এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। গ্যাস সংকট সামাল দিতে সরকারকে খোলাবাজার থেকে দ্বিগুনের বেশি দামে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে।

দীর্ঘদিনের এই সংকট রাতারাতি উত্তোরণের কোনো উপায় নেই বলে মনে করেন ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম। আগামীর সময়কে বললেন, ‘সরকারকে এখন সবক্ষেত্রে সাশ্রয়ী হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে বিগত সময়ে যেসব অযাচিত ও অপ্রয়োজণীয় ব্যয় বাড়ানো হয়েছে সেগুলো কমাতে হবে। কাঠামোগত সংস্কার দরকার না হলে অব্যবস্থাপনা, বিশৃঙ্খলা, চুরি বন্ধ হবে না; সংকটও কাটবে না।’ এই মুহূর্তে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধিসহ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে দ্রত উৎপাদন শুরু করারও পরামর্শ দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ।