খেলাপি ঋণ আদায়, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে পাঁচ বছর মেয়াদি ব্যাংকিং খাত সংস্কারের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। পরিকল্পনার আওতায় উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকগুলোতে কঠোর তদারকি, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা, পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, আমানত সুরক্ষা তহবিল কার্যকর করা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। ‘ফাইভ-ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক ফর রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (জুলাই ২০২৬-জুন ২০৩১)’ শীর্ষক পরিকল্পনাটি তৈরি করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)। চলতি বছরের ১৮ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি) এটি অনুমোদন করে। গত শুক্রবার পরিকল্পনাটি প্রকাশ করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সরকার তিনটি ধাপে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করবে। প্রথম বছরে তাৎক্ষণিক ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ, পরবর্তী দুই বছরে ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন এবং তৃতীয় থেকে পঞ্চম বছরে গভীরতর কাঠামোগত সংস্কার করা হবে।
প্রথম বছরে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংক, খেলাপি ঋণ এবং আমানতকারীদের সুরক্ষায়। এ সময় অন্তর্বর্তী ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনাগত স্বায়ত্তশাসন কার্যকর করা হবে। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ বাড়ার প্রবণতা ঠেকাতে ঋণ শ্রেণীকরণ ও প্রভিশন সংরক্ষণের নিয়ম কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। ব্যাংকিং খাতের সুশাসন প্রতিষ্ঠায় পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় দায়িত্ব পালনের উপযুক্ততা যাচাইয়ে ‘ফিট অ্যান্ড প্রপার’ মানদণ্ড প্রয়োগ করা হবে। যেসব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এ মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হবে, সেগুলো পুনর্গঠন করা হবে। আমানতকারীদের সুরক্ষায় ডিপোজিট প্রোটেকশন ফান্ড বা আমানত সুরক্ষা তহবিল কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর মূলধন শক্তিশালী করার পাশাপাশি আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করবে সরকার। সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোর আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাও চালু করা হবে।
পরবর্তী দুই বছরে ব্যাংকগুলোর সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং ঋণ আদায় ব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংককে পূর্ণ পরিচালনাগত স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার পাশাপাশি ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ও স্ট্রেস টেস্টিং চালু করা হবে। ঋণ পুনঃ তফসিলের নিয়ম কঠোর করা হবে এবং বড় ঋণগ্রহীতাদের ওপর নিবিড় নজরদারি বাড়ানো হবে। ব্যাংকগুলোকে ঋণ দেওয়ার নিয়ম আরও কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। একই সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদে সদস্য নিয়োগের প্রক্রিয়া মানসম্মত করা হবে। পর্ষদ সদস্যদের মেয়াদ এবং একই পরিবারের সদস্যদের প্রতিনিধিত্বের ওপরও সীমা আরোপ করা হবে।
ব্যাংকগুলোকে পৃথক ব্যাংকভিত্তিক আর্থিক তথ্য প্রকাশ এবং বাসেল-৩ এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রতিবেদনের মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে। এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা ও ঝুঁকির প্রকৃত চিত্র প্রকাশে স্বচ্ছতা বাড়বে বলে আশা করছে সরকার। সংস্কারের শেষ ধাপে ব্যাংকগুলোকে আরও দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলার পাশাপাশি পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ঝুঁকি কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এজন্য সুশাসন ও স্বচ্ছতা বাড়ানো, তথ্য ব্যবস্থা উন্নত করা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা শক্তিশালী করা হবে।
সরকার বলছে, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে দেশের ব্যাংকিং খাতকে শক্তিশালী করা জরুরি। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর স্বল্পসুদে ঋণ ও বৈদেশিক তারল্য সহায়তা পাওয়ার সুযোগ কমতে পারে। ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বাড়বে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমানতকারীদের আস্থা ফেরানোর পাশাপাশি সুশাসন নিশ্চিত করা ও খেলাপি ঋণ আদায় কার্যক্রম জোরদার হবে।