গত ১০ আগস্ট প্রকাশিত ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় দেশের ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। এর মধ্যে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডেরই রয়েছে ২২৬টি প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের ৭২ শতাংশের বেশি মাদ্রাসা। শূন্য পাসের কারণ জানতে এসব মাদ্রাসার প্রধানদের বোর্ডে ডেকে পাঠানো হলে শিক্ষকসংকট, শিক্ষার্থীদের অনাগ্রহ, মোবাইল ও অনলাইন আসক্তি, দুর্বল শিক্ষার্থী, কারিকুলাম পরিবর্তনসহ নানা কারণ দেখিয়েছেন তারা। তবে বোর্ডের কর্মকর্তাদের মতে, এসব কারণের আড়ালে রয়েছে মূলত প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও শিক্ষার্থীদের প্রতি নজরদারির ঘাটতি।
শূন্য পাস ২২৬ মাদ্রাসার ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী ফেল করেছে আরবি বিষয়ে। এরপর ইংরেজি ও গণিতে। মাদ্রাসাপ্রধানদের দাবি, অনেক শিক্ষার্থী উপবৃত্তির জন্য পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলে পড়ে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে এসে মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ায় আরবিতে তাদের ভিত্তি দুর্বল। অন্যদিকে ইংরেজি ও গণিতের শিক্ষক না থাকায় অন্য বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে ক্লাস নেওয়ায় এসব বিষয়ে ফল খারাপ হয়েছে। শূন্য পাস মাদ্রাসার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি উত্তরাঞ্চলে। এর মধ্যে রাজশাহী অঞ্চলে ৭৪টি, রংপুরে ৪১টি, বরিশাল ও ঢাকায় ২৯টি করে, খুলনায় ২৭টি, ময়মনসিংহে ১৮টি, কুমিল্লায় সাতটি এবং চট্টগ্রামে একটি। সিলেট অঞ্চলে একটি মাদ্রাসাও শূন্য পাসের তালিকায় নেই। ফল প্রকাশের পরদিনই ২২৬ মাদ্রাসার প্রধানকে লিখিত বক্তব্যসহ বোর্ডে হাজির হয়ে কারণ ব্যাখ্যার নির্দেশ দেওয়া হয়।
গত ২৩ আগস্টের মধ্যে সারা দেশের শূন্য পাস মাদ্রাসাগুলোর প্রধানরা বোর্ডে উপস্থিত হয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। মাদ্রাসাপ্রধানদের লিখিত বক্তব্যের বাইরে মাদ্রাসা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর মো. ফারুক আহম্মেদসহ কর্মকর্তারা তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। লিখিত বক্তব্যের বাইরে নানা প্রশ্ন করেন তারা। সেখানে উঠে আসে আরও কিছু কারণ। কয়েকজন মাদ্রাসাপ্রধান জানান, মফস্বল ও দুর্গম এলাকার অনেক মাদ্রাসা ভালো শিক্ষার্থী পায় না। কোথাও শিক্ষার্থী এক থেকে পাঁচজন, তাও অনিয়মিত। অনেকে শিক্ষার্থীদের মোবাইল ও অনলাইন আসক্তির কারণে লেখাপড়া না করার কথা বলেছেন। কেউ বলেছেন, হঠাৎ কারিকুলাম পরিবর্তনের কারণে ফল খারাপ হয়েছে।
কয়েকজন মাদ্রাসাপ্রধান এই প্রতিবেদককে বলেন, কওমি মাদ্রাসা অনুমোদন পেলেও কর্মক্ষেত্র তৈরি না হওয়া ওই শিক্ষার্থীদের একটা অংশ দাখিলে রেজিস্ট্রেশন করে পরীক্ষা দেয়। তাদের বড় অংশ ফেল করে। গণ অভ্যুত্থানের পর অনেক শিক্ষক পলাতক, কেউ কারাগারে আছেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা, পরবর্তী সময়ে শিক্ষকসংকট, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে যাওয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মব এবং শিক্ষার্থীদের নানা আন্দোলন ও পড়াশোনার বাইরে ব্যস্ত হয়ে পড়াকেও দায়ী করেছেন শিক্ষকদের কেউ কেউ। এ ছাড়া নকল ঠেকাতে কড়াকড়ি, সিসিটিভি নজরদারি ও খাতা সঠিকভাবে মূল্যায়নের কারণেও এবার ফেলের সংখ্যা বেড়েছে বলে মনে করেন তারা।
নারায়ণগঞ্জ ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসার শিক্ষক ও প্রধান পরীক্ষকের দায়িত্বে থাকা মনোয়ারা আক্তার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। মোবাইল ও অনলাইন আসক্তি ভয়াবহ। এমন পরীক্ষার্থীও আছে, যে খাতায় ২০ নম্বরের উত্তরও লেখেনি। তাকে পাস নম্বর দেব কীভাবে? কারিকুলাম পরিবর্তনের কারণে এবারের পরীক্ষার্থীরা কার্যত এক বছর পড়েই পরীক্ষা দিয়েছে। আগের কারিকুলাম পড়ানোর পদ্ধতিই বুঝে উঠতে পারেননি শিক্ষকরা। এ কারণেও শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে ছিল।
তবে মাদ্রাসাপ্রধানদের এসব ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর মো. ফারুক আহম্মেদ। তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে, তাদের যত্নের যথেষ্ট অভাব রয়েছে।’ কারিকুলাম পরিবর্তন বা মোবাইল আসক্তি যদি বড় কারণ হয়, তাহলে সাধারণ স্কুলের ফলেও একই প্রভাব থাকার কথা। আর কওমি শিক্ষার্থীরা আরবি বিষয়ে ফেল করবে-এটিও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা নয়।
তিনি বলেন, শূন্য পাস মাদ্রাসার প্রায় অর্ধেকই পুরোনো প্রতিষ্ঠান। আগে টেস্ট পরীক্ষার পর বিনামূল্যে কোচিং, অতিরিক্ত ক্লাস ও বাড়তি নজরদারি করা হতো। এবার যেসব প্রধানের সঙ্গে কথা হয়েছে, কোথাও এমন উদ্যোগের কথা পাওয়া যায়নি। মাদ্রাসাগুলোকে আরও কঠোর তদারকির আওতায় আনতে হবে। মাদ্রাসাপ্রধানদের দেওয়া বক্তব্য পর্যালোচনা করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরে সুপারিশ পাঠানো হবে। আগামী বছর থেকে শিক্ষার মানোন্নয়নে কার্যকর পরিবর্তন আসবে বলে আশা করেন তিনি।