Image description

গত বৃহস্পতিবার রাতে রংপুর মহানগরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও দুই সন্তান নৃশংসভাবে খুন হন। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ জানিয়েছেন, বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনের সময় ওই শিক্ষকের কাছে ধরা পড়ে যাওয়ার পর তারা হত্যাকাণ্ড ঘটান। খুলনার লবণচরা এলাকায় মাদক কারবার ও আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বে প্রকাশ্য দিবালোকে জোড়া খুনের ঘটনা ঘটে। এর কিছুদিন আগে যশোরের শার্শায় তিন বছরের এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন আলম গাজী নামে এক ব্যক্তি। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদে মাদক সেবন ও কারবারের তথ্য পায় পুুলিশ। আলম গাজী বাংলা মদ ও ইয়াবা সেবন করে শিশুদের টার্গেট করতেন। এর আগেও দুটি শিশুকে পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছিলেন তিনি। রাজধানীর পল্লবীতে আলোচিত শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত সোহেল রানাও মাদকাসক্ত। সিলেট নগরের কোতোয়ালি মডেল থানার পাশে আসাদুল আলম নামে এক মাদক কারবারি ও ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে নিহত হন র‌্যাব সদস্য ইমন আচার্য।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে সিংহভাগ রোমহর্ষক ও ক্লুলেস খুনের পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মাদকই দায়ী। আইস, ইয়াবা ও বিভিন্ন রাসায়নিক মাদকের প্রভাবে অপরাধীদের মানবিক বোধ লোপ পাওয়ায় খুনের ধরনগুলো দিন দিন আরও বীভৎস ও বর্বরোচিত হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক কয়েক দিনের অপরাধচিত্র বিশ্লেষণ করলে মাদকের এই ভয়াবহ রূপটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সম্প্রতি পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিটের গোপন জরিপেও উঠে এসেছে এমন ভয়াবহ তথ্য। মনোবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত সিনথেটিক মাদক ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ বা আইস মানুষের স্নায়ুতন্ত্রকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিচ্ছে। এসব মাদক সেবনের পর তাদের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা, হ্যালুসিনেশন ও অতিরিক্ত মাত্রায় হাইপার-অ্যাকটিভিটি তৈরি করছে। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে একজন আসক্ত ব্যক্তি খুব সহজেই যেকোনো নৃশংস খুনের মতো অপরাধ ঘটিয়ে ফেলছে।

পুলিশের তদন্তে দেখা গেছে, পরিত্যক্ত স্থানে গড়ে ওঠা মাদকের আড্ডার যুবকরাই দলবদ্ধ ধর্ষণসহ খুনের ঘটনায় জড়িয়ে থাকে। মাদকের টাকা জোগাড় করা এবং নেশাগ্রস্ত অবস্থায় দলবদ্ধভাবে অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে তারা। মাদকাসক্তদের পর্নোগ্রাফি আসক্তি সাধারণের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি, যা তাদের ধর্ষণের মতো অপরাধে উদ্বুদ্ধ করে। তা ছাড়া মাদকের টাকার জন্য সন্তান কর্তৃক পিতা-মাতাকে হত্যা অথবা নেশার ঘোরে স্ত্রীকে খুন করার মতো ঘটনা ঘটছে প্রায়ই। পুলিশের ডায়েরিতেও এ ধরনের রোমহর্ষক ঘটনার প্রমাণ মিলেছে। ২০১৩ সালে ঢাকার শান্তিনগরে পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তাঁর স্ত্রীকে তাঁদের কন্যা ঐশী রহমান নৃশংসভাবে হত্যা করে। ঐশী মারাত্মকভাবে ইয়াবায় আসক্ত ছিল। মাদকের টাকার জন্য ওই হত্যাকাণ্ড ঘটায় ঐশী।

অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশের প্রায় ১৮টি জেলা দিয়ে প্রতিদিন বিভিন্ন কৌশলে ভয়ংকর সব মাদক দেশে প্রবেশ করছে। এই চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত গডফাদার এবং স্থানীয় ডিলারদের শক্তিশালী নেটওয়ার্কের কারণে পাড়ামহল্লায় সহজেই মাদক পৌঁছে  যাচ্ছে তরুণ প্রজন্মের হাতে। হাত বাড়ালেই এখন মিলছে ভয়ংকর সব মাদক। মাদকাসক্ত এই তরুণরাই পরবর্তীতে কিশোর গ্যাং বা বিভিন্ন অপরাধচক্র গঠন করে পাড়ার সাধারণ মানুষের জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, রাজধানীর মোহাম্মদপুর, বসিলা ও রায়েরবাজার বধ্যভূমি এবং কবরস্থানের আশপাশে অর্ধশতাধিক কিশোর গ্যাং রয়েছে। এসব মাদকাসক্ত কিশোর গ্যাংকে প্রায়ই বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত করতে দেখা যায়। এ ছাড়া মোহাম্মদপুর, মিরপুর, উত্তরা, বাড্ডা, সবুজবাগ, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর, পুরান ঢাকাসহ রাজধানীজুড়ে প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায় মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের। তারা প্রকাশ্য কুপিয়ে লোকজনকে হত্যা করে রাস্তার পাশে ফেলে রাখছে। অনেকের দেহ থেকে হাত-পা বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। তা ছাড়া ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও মাদক কারবারসহ নানা অপরাধে জড়িত তারা।

পুলিশের বিভিন্ন সময়ের সমীক্ষা ও তদন্ত প্রতিবেদন বিশ্লেষণে একটি ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। দেশে নৃশংস হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ ও পারিবারিক সহিংসতায় অধিকাংশের পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ী মাদক। এ-সংক্রান্ত মাঠপর্যায়ে জরিপ চালিয়ে অপরাধ পরিসংখ্যানের বিশদ তথ্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। দেশে ঘটে যাওয়া অধিকাংশ চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড ও ধর্ষণের ঘটনার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে মাদকের সম্পৃক্ততা পেয়েছে পুলিশ। পুলিশ সদর দপ্তর ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বিভিন্ন সময়ের মামলার পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দেশের অপরাধ জগতের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ঘটনার পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে মাদক। তা ছাড়া বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের একটি বিশাল অংশই মাদকাসক্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

পুলিশের সূত্র জানায়, মাদকাসক্ত ব্যক্তি মাদকের টাকা জোগাড় করতে ঘরের জিনিসপত্র চুরি থেকে শুরু করে একপর্যায়ে ডাকাতি ও খুন করতেও দ্বিধা করছে না। পরিবার টাকা না দিলে শুরু করে সহিংসতা। ফলে তাদের হাতে প্রায়ই মা-বাবা, ভাইবোন বা স্ত্রী খুনের শিকার হচ্ছেন। এ ছাড়া মাদক সেবনের ফলে তাদের মনে তীব্র সন্দেহবাতিকতা তৈরি হচ্ছে। অনেক স্বামী মাদকাসক্ত হয়ে স্ত্রীকে পরকীয়া সন্দেহে পিটিয়ে বা শ্বাসরোধ করে হত্যা করছে। নেশার টাকার জন্য কিশোররা এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও তুচ্ছ কারণে হত্যাও করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক জানিয়েছেন, দেশে প্রতিহিংসাপরায়ণ এবং মাদকাসক্ত অবস্থায় অপরাধ করার প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা যখন অপরাধ করে, তখন তারা কাকে আঘাত করছে বা এর পরিণতি কী হতে পারে, সেই বোধ শক্তি সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলে। ফলে অতি তুচ্ছ ঘটনা বা কেবল মাদকের টাকা না পেয়ে নিজের বাবা-মা, স্ত্রী বা সন্তানকে খুনের ঘটনা অহরহ ঘটছে।