একশ্রেণির রাজনীতিবিদ, পুলিশ সদস্য, প্রশাসনের কর্মকর্তা ও গণমাধ্যমকর্মীদের অনৈতিক সুবিধা বহাল থাকায় বালুমহালের অপকর্ম বন্ধ হচ্ছে না। থামছে না ইজারাদারদের দৌরাত্ম্য। ক্যাডার বাহিনীর সশস্ত্র মহড়া, সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলছে। অস্ত্রের ঝনঝনানিতে প্রতিনিয়ত ঝরছে রক্ত। এদিকে ‘বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন-২০১০’ ও বিধিমালা-২০১১ মূলত কাগজে-কলমেই বন্দি। আইন অনুযায়ী সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত বালু তোলার নিয়ম থাকলেও সূর্যাস্তের পরই বালুমহালগুলো অপরাধের আখড়ায় রূপ নেয়। বালুমহাল সাবলিজ (উপইজারা) দেওয়ার বিধান না থাকলেও বাস্তবে সেটাই হচ্ছে। বিধান অনুযায়ী, ইজারাদাররা নিজস্ব জনবল ও যন্ত্রপাতির মাধ্যমে নির্ধারিত স্থান ও সময়ে বালু উত্তোলন করবেন। কিন্তু বেশির ভাগ ইজারাদারেরই জনবল বা যন্ত্রপাতি নেই। তারা অন্যদের সাবলিজ দিয়ে নিজেরা কেবল রয়্যালটি বা চাঁদা আদায় করেন। যুগান্তরের অনুসন্ধানে এসব তথ্য জানা গেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নদ-নদী পরিণত হয়েছে সহিংসতা, খুন ও ত্রাসের সাম্রাজ্যে। অবৈধ ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে শতকোটি টাকার বালু লুট করতে তৈরি হয়েছে রক্তক্ষয়ী প্রতিযোগিতা। নদীতে স্থলভাগের মতো স্থায়ী সীমানা পিলার বা চিহ্নিতকরণ ব্যবস্থা না থাকায় অনুমোদিত সীমানা পেরিয়ে দিগি¦দিক বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এ কারণে চাঁদপুর-মুন্সীগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ-ব্রাহ্মণবাড়িয়া, পাবনা-নাটোর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-নরসিংদী এবং মানিকগঞ্জে যমুনা নদীর সীমানা নিয়ে নিয়মিত সংঘর্ষ হচ্ছে।
গভীর রাতে ড্রেজার দিয়ে যত্রতত্র বালু উত্তোলন করায় বসতবাড়ি, ফসলি জমি, স্কুল-কলেজ ও সরকারি স্থাপনা বিলীন হলেও প্রশাসনের ভূমিকা প্রায়ই নীরব। অভিযানে কেবল নৌযানের চালক বা সাধারণ শ্রমিকরাই গ্রেফতার হন। মূল ইজারাদার বা আড়ালের প্রভাবশালী চক্র থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। আবার কখনো অভিযানে যাওয়ার আগেই তথ্য ফাঁস হয়ে যায়। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বালুমহালে যাওয়ার আগেই সটকে পড়েন অবৈধ বালু উত্তোলনকারীরা।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এইচ এম শাহাদাৎ হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, বালুমহালকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের সংঘাত, দখল বা আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ নেই। অবৈধ বালু উত্তোলন বা সংঘাতের সঙ্গে কেউ জড়িত হলে অভিযোগ ও তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সুনামগঞ্জের যাদুকাটা-১ ও যাদুকাটা-২ বালুমহালে ১০৬ কোটি টাকার ইজারাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তুঙ্গে। সাম্প্রতিক সময়ে বারকি শ্রমিক (ছোট নৌকায় যারা সনাতন পদ্ধতিতে পাথর-বালু সংগ্রহ করে), স্থানীয় রাজনৈতিক ক্যাডার ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মধ্যে কয়েকটি ধাওয়া-পালটাধাওয়া ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। গত ছয় মাসে এ বিষয়ে তাহিরপুর থানায় ৬৬টি মামলা হয়েছে। গত ১ জানুয়ারি থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত এসব মামলায় ৩০৫ জন আসামি আইনের আওতায় এলেও এরই মধ্যে সবাই জামিন পেয়েছেন। জামিনে বেরিয়ে আবারও অস্ত্র ও ড্রেজার নিয়ে আধিপত্য বিস্তারে লিপ্ত হয়েছেন।
গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত যমুনা অববাহিকার মানিকগঞ্জ ও বগুড়ায় সাতটি বড় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে তিনজন নিহত ও ৩০ জন আহত হন। মানিকগঞ্জের শিবালয়, দৌলতপুর ও হরিরামপুরসংলগ্ন নদী এলাকায় সীমানা নির্ধারণের জটিলতা ও মহাল দখলকে কেন্দ্র করে গত ৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯ এপ্রিল ও ১৪ জুন তিনটি পৃথক সংঘাতে একজন নিহত ও গুলিবিদ্ধসহ ১৮ জন আহত হয়েছেন। বগুড়ার সারিয়াকান্দি ও ধুনটে বালু কারবারের আধিপত্যকে কেন্দ্র করে মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত চারটি সংঘর্ষ ও গোলাগুলিতে দুজন নিহত হয়েছেন।
চাঁদপুর-মুন্সীগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ-ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্তের মেঘনা নদীতে বালুমহালের সীমানা নিয়ে প্রায়ই ককটেল বিস্ফোরণ, ড্রেজারে অগ্নিসংযোগ, স্পিডবোটের মহড়া ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটছে। পাবনা-নাটোর সীমান্তের পদ্মায় অবৈধ বালু তোলাকে কেন্দ্র করে একাধিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। গত ছয় মাসে এ নদীসীমায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত পাঁচজন। বিরোধপূর্ণ এলাকাগুলোতে সশস্ত্র পাহারাদার বসিয়ে চর দখল করে রাখা হয়েছে। আইন অনুযায়ী সাবলিজ বেআইনি হলেও বাস্তবে সেটিই হচ্ছে। ইজারাদাররা নেপথ্যে থেকে টোল আদায় করেন এবং নামধারী সাংবাদিক, স্থানীয় ক্যাডার ও অসাধু চক্রকে সাবলিজ দিয়ে নদীপাড় কেটে বালু উত্তোলনের পথ করে দেন।
আইনি দুর্বলতা : অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা আইনের দুর্বলতা। বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর ১৫(১) ধারায় বর্ণিত অপরাধগুলো জামিনযোগ্য। ফলে গ্রেফতারের পরই আসামিরা জামিন পান এবং পুনরায় একই অপরাধে লিপ্ত হন।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত সুনামগঞ্জের বিভিন্ন থানায় ৬৬টি মামলায় ৬০ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ এবং ২৪৫ জন আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। তবে আদালতে হাজির হওয়া মাত্রই সবাই জামিন পান। আইনের অধীনে ভ্রাম্যমাণ আদালত সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, ৫০ হাজার থেকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা এবং সরঞ্জাম বাজেয়াপ্ত করতে পারেন। কিন্তু নিয়মিত বা জোরালো অভিযান চোখে পড়ে না।
নদীর সিন্ডিকেট টিকিয়ে রাখতে ও ইজারাদারকে সুবিধা দিতে ঢাকায় অবস্থান করে কিছু ব্যক্তি উচ্চ আদালতে বিভিন্ন রিট পিটিশন পরিচালনা করেন। রিটের দোহাই দিয়ে অবৈধ বালু উত্তোলনকে আইনি বৈধতা দেওয়া হয়। ইজারাদারদের পক্ষে স্থগিতাদেশ বা সুবিধা নিতে আইনজীবীদের নিয়মিত অর্থায়ন করা হয় তাদের মাধ্যমে। সুনামগঞ্জের যাদুকাটা নদীর সিন্ডিকেট রক্ষায় এ ধরনের কাজ করছেন খুরশেদ আলম নামের এক ব্যক্তি।
গোয়েন্দা পরামর্শ : সার্বিক পরিস্থিতিতে সরকারকে বেশকিছু পরামর্শ দিয়েছেন গোয়েন্দারা। চিহ্নিত নদীপথে নৌপুলিশ, কোস্ট গার্ড ও র্যাবের সমন্বয়ে যৌথ টহল জোরদার করে অবৈধ অস্ত্র ও ক্যাডার বাহিনীকে তাৎক্ষণিক গ্রেফতারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আধুনিক জিপিএস প্রযুক্তিতে প্রতিটি বালুমহালের ডিজিটাল ম্যাপ তৈরি এবং নদীতে ভাসমান লাল বয়া বা স্থায়ী প্রতীক দিয়ে সীমানা চিহ্নিত করতে বলা হয়েছে।
বারবার অপরাধ করা অভ্যাসগত আসামিদের জন্য কঠোর অ-জামিনযোগ্য ধারা যুক্ত করতে দ্রুত আইন সংশোধন, সাবলিজ বা সহিংসতার প্রমাণ পেলেই ইজারাদারের চুক্তি বাতিল ও জামানত বাজেয়াপ্ত এবং পরিবেশ অধিদপ্তরকে সক্রিয় আইনি ভূমিকায় আনার পরামর্শও দিয়েছেন গোয়েন্দারা। জব্দ করা নৌযান বা বালু নিলামে যাতে অপরাধী চক্র বেনামে পুনরায় কিনতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর নিয়ম কার্যকর করাও জরুরি বলে তারা মনে করেন।