Image description

ভারতের স্বার্থসংশ্লিষ্ট তিনটি প্রকল্প বাতিল করার প্রস্তাব করেছে নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে দুটি প্রকল্প বাংলাদেশি টাকার পাশাপাশি ভারতীয় ঋণ সহায়তায় (এলওসি) বাস্তবায়ন করার কথা। ঋণের অর্থছাড় করেনি ভারত। অপরটি বিশ্বব্যাংকের ঋণ সহায়তায় রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রকল্পগুলো নেওয়া হয়েছিল। এগুলো হলো-‘আশুগঞ্জ অভ্যন্তরীণ কনটেইনার নৌবন্দর স্থাপন’, ‘যমুনা নদী টেকসই ব্যবস্থাপনা প্রকল্প-১ (নেভিগেশনাল চ্যানেল উন্নয়ন)’ এবং ‘আপগ্রেডেশন অব মোংলা পোর্ট।’ নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয় সম্প্রতি প্রকল্পগুলো বাতিলের প্রস্তাব পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

প্রকল্প তিনটির মধ্যে দুটি বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এবং অপরটি মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ (মোবক) বাস্তবায়ন করছে। এগুলো বাস্তবায়নে আট হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়। এরই মধ্যে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায় বাংলাদেশকে এই টাকা গচ্চা দিতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভারতীয় পণ্য ট্রানশিপমেন্ট সুবিধা দিতে আশুগঞ্জ অভ্যন্তরীণ কনটেইনার নৌবন্দর স্থাপন এবং আপগ্রেডেশন অব মোংলা পোর্ট প্রকল্প দুটি নেওয়া হয়। একইভাবে ভারতের সঙ্গে নৌপ্রটোকল চুক্তির আওতায় জাহাজ চলাচলের সুবিধা করে দেওয়ার জন্য যমুনা নদী টেকসই ব্যবস্থাপনা প্রকল্প-১ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওই রুটে বাংলাদেশের ছোট ও মাঝারি আকারের নৌযান চলাচল করে। ওইসব নৌযান চলাচলের জন্য এ প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা নেই বলে জানান বিআইডব্লিউটিএ’র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

কাজ শেষ না করে তিন প্রকল্প বাতিলের প্রস্তাবের বিষয়ে জানতে চাইলে নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়া যুগান্তরকে জানান, ঋণের টাকা ভারত নির্ধারিত সময়ে ছাড় করেনি। অনেক বছর ধরে আটকে আছে। এতে প্রকল্প ব্যয় বাড়ছে। এসব কারণে প্রকল্পগুলো বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে।

নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, একই প্রস্তাবে চলমান অন্য প্রকল্পগুলো পুনর্বিন্যাস করার কথা বলা হয়েছে। তবে বৈদেশিক ঋণের প্রকল্পগুলো আগের মতো বহাল রাখার কথা বলা হয়েছে। সরকার কৃচ্ছ সাধনের নির্দেশনা দিলেও কয়েকটি প্রকল্পে তা উপেক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে বিআইডব্লিউটিএ’র ১০টি ড্রেজার ও আনুষঙ্গিক জলযান কেনার প্রস্তাব অন্যতম। সংস্থাটির বহরে ৪৯টি ড্রেজার রয়েছে। অথচ বর্তমানে ৫-৬টি ড্রেজার নদী খনন করছে। অলস বসে থাকা বাকি ড্রেজারগুলোর জনবল ও রক্ষণাবেক্ষণে বিপুল টাকা ব্যয় হচ্ছে।

আরও ছয়টি ড্রেজার ও আনুষঙ্গিক নৌযান কেনার জন্য কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। বিশাল এ ড্রেজার বহর থাকার পরও ‘৩৫ ড্রেজার ও সহায়ক জলযানসহ আনুষঙ্গিক সরঞ্জামাদি সংগ্রহ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ’ প্রকল্প বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় আরও ১০টি কাটার সাকশন ড্রেজার কেনার কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, বর্তমানে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর প্রায় ৪০০ কাটার সাকশন ড্রেজার রয়েছে। তবুও রহস্যজনক কারণে নতুন ড্রেজার কেনায় ঝোঁক সংস্থাটির কয়েকজন কর্মকর্তার।

তিন প্রকল্প বাতিল : বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার নৌপ্রটোকল, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার এবং উপকূলীয় জাহাজ চলাচল চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক রয়েছে। ওইসব চুক্তির আওতায় ভারতীয় এক অঞ্চলের পণ্য বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে আরেক অঞ্চলে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ২০১১ সালে ভারত প্রথমবার আশুগঞ্জ নদীবন্দর ব্যবহার করে কলকাতা থেকে ত্রিপুরার আগরতলায় পণ্য পাঠায়। ওই বছর ত্রিপুরার পালাটানা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভারী যন্ত্রপাতি আশুগঞ্জ হয়ে নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে খাদ্যশস্যসহ বিভিন্ন মালামাল গেছে এ রুটে।

জানা গেছে, ওই পণ্য নেওয়ার সুবিধার্থে ২০১৮ সালের জুলাইয়ে শুরু হয় ‘আশুগঞ্জ অভ্যন্তরীণ কনটেইনার নদীবন্দর স্থাপন’ প্রকল্প। মূল অনুমোদিত প্রকল্পের ব্যয় ছিল ১ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা। ২০২২ সালের মধ্যে তা শেষ হওয়ার কথা ছিল। পরে দফায় দফায় প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ বাড়ানো হয়। ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ভারতীয় ঋণ ৭৩২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মেয়াদও শেষ হয়ে যায়। চলতি অর্থবছরে এক লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে প্রকল্পটি সচল রাখা হয়।

সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, প্রকল্পের আওতায় ৭৩৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে প্রায় ৩২ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। নদীর ওপর বিদ্যুতের পিলারের উচ্চতা বাড়ানো হয়েছে। রেলওয়ে আন্ডারপাস নির্মাণ করা হচ্ছে। এ অবস্থায় ভারত এলওসি’র তালিকা থেকে প্রকল্পটি বাদ দিয়েছে। দেশটি অর্থায়ন বন্ধ করায় প্রকল্পের কাজ শেষ না করে তা বাতিলের প্রস্তাব করেছে নৌমন্ত্রণালয়।

বিআইডব্লিউটিএর একাধিক কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পে ব্যয় হওয়া পুরো টাকাই গচ্চা যাচ্ছে। উপরন্তু অধিগ্রহণ করা জমি বেদখল হওয়া ঠেকাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে এ সংস্থাকে। এছাড়া আশুগঞ্জেই বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২১০ কোটি টাকা ব্যয়ে আরেকটি টার্মিনাল করা হচ্ছে।

জানতে চাইলে এ প্রকল্পের পরিচালক সাজেদুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, কয়েকটি কারণে প্রকল্প সঠিক সময়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। ভারত নির্দিষ্ট সময়ে ঋণ ছাড় করেনি। ইতোমধ্যে প্রকল্পের মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, প্রকল্পের আওতায় যে জমি অধিগ্রহণ হয়েছে সেই বিষয়ে কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবে।

ভারতীয় পণ্য নৌপথে পরিবহণের সুবিধার্থে ৬২০ কোটি ৪১ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘যমুনা নদীর টেকসই ব্যবস্থাপনা (নেভিগেশনাল চ্যানেল উন্নয়ন)’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে বিআইডব্লিউটিএ। বিশ্বব্যাংকের ঋণ সহায়তায় ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। প্রকল্পের আওতায় যমুনা নদীর সিরাজগঞ্জ থেকে কুড়িগ্রাম পর্যন্ত নৌযান চলাচলে বয়াবাতি স্থাপন, নৌযান কেনাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম ছিল। একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরির কথা ছিল। এজন্য পরামর্শকও নিয়োগ দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ওই নদীতে বাংলাদেশের নামমাত্র সংখ্যক নৌযান চলাচল করে। বিদ্যমান সুবিধা ব্যবহার করেই এসব নৌযান চলাচল করতে পারে। কিন্তু ভারতীয় নৌযান চলাচলের সুবিধার্থে প্রকল্পটি নেওয়া হয়। এরই মধ্যে প্রকল্পের আওতায় যেসব কাজ হয়েছে সেগুলোর জন্য ৩৫ লাখ টাকা বিল হয়েছে। কিন্তু টাকা পরিশোধ হয়নি। এ অবস্থায় প্রকল্পটি বাতিল করার বিষয়ে বিশ্বব্যাংককে চিঠিও দেওয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মিজানুর রহমান ভূঁইয়া যুগান্তরকে বলেন, ওই নদীপথে আড়াই মিটার পর্যন্ত গভীরতা রক্ষণাবেক্ষণ করে বিআইডব্লিউটিএ। এ সুবিধা নিয়ে বাংলাদেশি জাহাজ চলতে পারে। ভারতীয় জাহাজ যাতে দিন-রাতে চলাচল করতে পারে সেজন্য নিরাপত্তা সরঞ্জাম বসানোর কথা ছিল। প্রকল্প বাতিল হতে যাওয়ায় এ মুহূর্তে সব ধরনের কাজ বন্ধ।

ভারতীয় তৃতীয় এলওসি আওতায় ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ছয় হাজার ১৪ কোটি ৬১ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘আপগ্রেডেশন অব মোংলা পোর্ট’ শীর্ষক প্রকল্প শুরু হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় পণ্য নৌপথে এ বন্দরে এনে সড়কপথে দেশটির অন্য অঞ্চলে নেওয়ার জন্য অবকাঠামো সুবিধা বাড়ানো। প্রকল্পের আওতায় গভীর সমুদ্রবন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো, সমুদ্র, নদী, সড়ক ও রেলপথ নেটওয়ার্ক তৈরি করার কথা ছিল। এজন্য দেশটি চার হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা ঋণ দিতেও সম্মত হয়েছিল। এরই মধ্যে প্রকল্পের আওতায় পরামর্শক খাতে প্রায় ৩৮ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। কিন্তু সময়মতো ভারত ঋণ ছাড় করেনি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, মোংলা বন্দর আধুনিকায়নে চীন বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে। ভারতের ঋণ ছাড়ে জটিলতা থাকায় এবং চীন এগিয়ে আসায় আপগ্রেডেশন অব মোংলা পোর্ট প্রকল্পটি কাজ শেষ না করেই বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বন্দরসংশ্লিষ্টদের মন্তব্য পাওয়া যায়নি।