চিত্রনায়িকা পরীমণির গাড়ি বিতর্কে আলোচিত ‘মাসরুর’ হলেন খন্দকার মাসরুর হোসেন মিতু। তিনি ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্বৈরাচার শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের প্রাক্তন স্বামী এবং সাবেক মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ছেলে। গাড়ি বিতর্ক অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে তখন নামের মিল থাকা মাসরুর আরেফিনকে ফাঁসানো হয়। রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে নিরীহ মাসরুরকে নানাভাবে হয়রানি করা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চালানো হয় অপপ্রচার। আর এসবের নেতৃত্বে ছিলেন পুলিশের তৎকালীন ক্ষমতাধর কর্মকর্তা ডিবি প্রধান হারুনুর রশিদ। পরে অবশ্য পুতুলের সঙ্গে খন্দকার মাসরুরের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে।
হয়রানির শিকার এই মাসরুর আরেফিন হলেন সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। সম্প্রতি চিত্রনায়িকা তমা মির্জার এবি ব্যাংকে যোগদানকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাংক ও বিনোদনজগতের সম্পর্ক নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়। আর সেই সঙ্গে পুরোনো পরীমণি-মাসরুর বিতর্কও আবার সামনে চলে আসে। এই আলোচনায় সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিনের নাম আবারও নতুন করে উচ্চারিত হচ্ছে। তবে পরীমণিকে বিলাসবহুল গাড়ি উপহার দেওয়ার অভিযোগ তিনি শুরু থেকেই অস্বীকার করে আসছেন।
গোয়েন্দা ও অন্যান্য সূত্র জানিয়েছে, বোট ক্লাবকাণ্ডের পরে পরীমণিকে দামি গাড়ি উপহার দেওয়া নিয়ে তৎকালীন ডিবি প্রধান হারুন সাংবাদিকদের সামনে প্রথমেই খন্দকার মাসরুর হোসেন মিতুর নাম ইঙ্গিত করেছিলেন। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ের জামাইয়ের নাম ইঙ্গিত করায় চাপে পড়েন ডিবি হারুন। এর পরই তিনি ভোল পাল্টে ফেলেন। ওই সময়ে ডিবি হারুনের দ্বন্দ্ব ছিল সিটি ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যানের ভাই শওকত আজিজ রাসেলের সঙ্গে। খন্দকার মাসরুর হোসেন মিতুর নাম আড়াল করতে ডিবি হারুন বেছে নেন সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিনকে। নামের সঙ্গে প্রায় মিল থাকা এবং শওকত আজিজ রাসেলের ওপর প্রতিশোধ নেওয়া- এক ঢিলে দুই পাখি মারার কৌশল নেয় ডিবি হারুন।
সূত্র বলছে, এ ঘটনার কিছু দিন আগে দুবাইয়ে খন্দকার মাসরুর হোসেন মিতু এবং পরীমণির প্রমোদ ভ্রমণের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ও মাসরুর হোসেন মিতুর মধ্যে দাম্পত্য কলহ শুরু হয়। যার জের ধরে তাদের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছিল বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ঘটনার সঙ্গে পতিত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী স্বৈরাচার শেখ হাসিনা এবং তার মেয়ে জড়িত থাকায় মাসরুর আরেফিনের দাবির সত্যতা তখন স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। পরীমণিকে পরবর্তী সময়ে মামলা ও অন্যান্য আইনি জটিলতায় রাখার পেছনেও শেখ হাসিনার অদৃশ্য ভূমিকা ছিল বলে ধারণা করা হয়।
সূত্র জানান, খন্দকার মাসরুর হোসেন মিতুকে অর্থাৎ হাসিনাকন্যা পুতুলের নামকে, পরীমণি নাম থেকে দূরে রাখতে গিয়ে একই নামের কারণে মাসরুর আরেফিনকে অসম্মান ও অভিযোগের মুখে ফেলা হয়। পরীমণিকে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা দামের গাড়ি উপহার দেওয়ার বিষয়টি ২০২১ সালের আগস্টে সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিনের নাম ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ওই সময় প্রকাশিত সংবাদে তার সঙ্গে পরীমণির কথিত অডিও রেকর্ডে গাড়ি উপহারের প্রসঙ্গ থাকার দাবি করা হয়েছিল। কয়েকটি গণমাধ্যমের একই প্রতিবেদনে সিটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে ‘শওকত রুবেল’ নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে পরীমণির ঘনিষ্ঠতার কথাও উল্লেখ করা হয়।
জানা গেছে, ২০২১ সালে সংবাদ প্রকাশের পরপরই মাসরুর আরেফিন অভিযোগটি অস্বীকার করেন। তিনি সেই সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, তিনি পরীমণি নামের কাউকে কখনো দেখেননি, তার সঙ্গে কোনো পরিচয় বা যোগাযোগ নেই এবং পরীমণির ফোন নম্বরও তার কাছে থাকার প্রশ্নই আসে না। মাসরুর আরেফিন তখন বলেন, তার জীবনের বড় অংশ ব্যাংকিংয়ের কাজ এবং সাহিত্যচর্চায় কাটে। তিনি কোনো ক্লাব বা পার্টিতে যান না বলেও উল্লেখ করেছেন। তার বক্তব্য ছিল, ঢাকার যারা ক্লাবকেন্দ্রিক সামাজিক পরিসরে চলাফেরা করেন, তাদের কেউ তাকে সেখানে দেখেছেন, এমন দাবি করতে পারবেন না।
মাসরুর আরেফিনের পোস্টে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল সংবাদে ব্যবহৃত ব্যাংক চেয়ারম্যানের নাম। তিনি বলেন, ‘শওকত রুবেল’ নামে সিটি ব্যাংকের কোনো চেয়ারম্যান নেই। তার ধারণা ছিল, প্রতিবেদনে হয়তো ব্যবসায়ী শওকত আজিজ রাসেলের নাম ভুলভাবে লেখা হয়েছে। তার বক্তব্য, ব্যাংক চেয়ারম্যানের পরিচয় পর্যন্ত ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়ে থাকলে একই প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে তোলা গাড়ি উপহারের অভিযোগ কোন তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে করা হয়েছিল, সে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
ঘটনার কয়েক দিনের মাথায় ২০২১ সালের ২৪ আগস্ট জাতীয় একটি দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠায় ভুল স্বীকার করে সংবাদ ছাপে। যেখানে বলা হয় : ‘গত ৮ আগস্ট ‘পরীমণি ও পিয়াসার সঙ্গে ২১ প্রভাবশালীর সম্পর্ক’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদের এক স্থানে ভুলবশত একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিনের নাম ছাপা হয়েছে। এ ছাড়া এ সংবাদে একই ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে ‘শওকত রুবেল’ নাম ছাপা হয়েছে। এ কথা স্বীকার করতে কার্পণ্য নেই যে, এ দুটি তথ্যই ভুল ছিল। পরীমণির ঘটনার সঙ্গে মাসরুর আরেফিনের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। তার নামটি ভুলবশত ছাপা হওয়ায় এবং তাতে করে তার ব্যক্তিমর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ায় পত্রিকাটি দুঃখ প্রকাশ করছে। সিটি ব্যাংকের এমডির মর্যাদাহানির বিষয়টি পত্রিকাটি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে এবং এই অনভিপ্রেত ভুলের জন্য তার ও তার পরিবারের কাছে আবারও দুঃখ প্রকাশ করছে।