Image description

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ‘রাগী পাখি’ পেজে সোনালি ময়না বিক্রির একটি ভিডিও দেন বন্য প্রাণী বিক্রেতা ইব্রাহিম। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় দেওয়ার ঠিক তিন ঘণ্টার পর একই পেজ থেকে তিনি আরেকটি ভিডিও দেন।

এতে বলা হয়, কুমিল্লার একটি এলাকা থেকে ময়না পাখি কিনতে এসেছেন। তাঁর দাবি, বন্য প্রাণী বিক্রি কোনো অপরাধ নয়। তিনি কোনো আইন ভঙ্গ করছেন না।

শুধু ইব্রাহিম নন, তাঁর মতো অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়ায় অবৈধভাবে বন্য প্রাণী বেচাকেনা করে আসছেন।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, নানাভাবে নজরদারি বৃদ্ধির কারণে অনলাইনে ঝুঁকেছেন এসব ব্যবসায়ী।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, হাটবাজার বা অন্য কোনো অনলাইন/অফলাইন মাধ্যমে বন্য প্রাণী বেচাকেনা নিষিদ্ধ করেছে সরকার। চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি দেশের জীববৈচিত্র্য ও বন্য প্রাণী সুরক্ষায় প্রণীত বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এতে ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন্য প্রাণীর বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে হাটবাজার বা অন্য কোনো মাধ্যমে বন্য প্রাণী বেচাকেনা করা যাবে না। ফেসবুক বা অন্য কোনো মাধ্যমে বন্য প্রাণী বেচাকেনা কিংবা এর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণের কোনো দৃশ্য প্রচার করলে কঠোর আইনি শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।

গত এক সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, ইউটিউবে নজরদারি, বন বিভাগ এবং এই ব্যবসায় জড়িত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অবৈধভাবে বন্য প্রাণী বেচাকেনায় সারা দেশে অন্তত ৫০-৬০ জন এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এর মধ্যে ‘পাখি পালন’, ‘পাখি ঘর’, ‘শালিক পাখি লালন পালন’, ‘রাগী পাখি’, ‘পাখি ক্রয় বিক্রয়’ নামের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপ বেশ সক্রিয়।

এ ছাড়া ইউটিউবে ‘বিসমিল্লাহ বার্ড মিডিয়া’, ‘ইউইউ বার্ড’, ‘ইন্ডিয়ান বার্ড এল’, ‘অস্থির পাখি’ চ্যানেল উল্লেখযোগ্য।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বন্য প্রাণীর অবৈধ বাজার কয়েক শ কোটি টাকার। দেশে দেশীয় প্রজাতির বন্য প্রাণীর চাহিদা বেশি এবং বিদেশি প্রজাতির প্রাণী মূলত পাচারের উদ্দেশ্যে নিয়ে আসা হয়। স্বল্প দাম, সহজলভ্যতা এবং লালন-পালনে সুবিধার কারণে শখের বসে অনেকে দেশীয় প্রজাতির বন্য প্রাণী কেনে।

এই ব্যবসায় জড়িত ব্যক্তিরা বলছেন, বিদেশি প্রাণীগুলো মূলত পাচারের উদ্দেশ্যে দেশে আনা হয়। দেশে এসব প্রাণীর ক্রেতা কম। উচ্চ মূল্য এবং অনেক প্রাণীর লালন-পালন ব্যয় বেশি হওয়ায় কেনে না। এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অনেকে বন্য প্রাণী বিক্রয়কে অপরাধ হিসেবে মানতে নারাজ।

‘রাগী পাখি’ পেজের ইব্রাহিম জানান, ২০১২ সাল থেকে তিনি বন্য প্রাণী বেচাকেনা করে আসছেন। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করে অনলাইনে বিক্রি করেন। এই অপরাধে বেশ কয়েকবার জেলেও গেছেন। জেল থেকে বের হয়ে আবার এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিক্রেতা বলেন, বন্য প্রাণী বেচাকেনা অবৈধ। চাহিদা থাকায় এই ব্যবসা কখনো বন্ধ হবে না। এই বাণিজ্যের সঙ্গে বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জড়িত।

বন বিভাগের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত দেশে মোট আট হাজার ১৫৪টি বন্য প্রাণী জব্দ করা হয়। এর মধ্যে ৯২টি স্তন্যপায়ী প্রাণী, চার হাজার ৫০৮টি পাখি, তিন হাজার ৫৫৪টি সরীসৃপ জব্দ করা হয়।

এসব জব্দ করতে বন বিভাগ ৩৯৬টি অভিযান পরিচালনা করে এবং ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে। ২০২৫ সালে ৪১৫টি অভিযানে আট হাজার ২৮১টি বন্য প্রাণী জব্দ করা হয়। এর মধ্যে ২৫৪টি স্তন্যপায়ী প্রাণী, চার হাজার ৭৩৫টি পাখি, তিন হাজার ২৯০টি সরীসৃপ ও দুটি মাছ। ২০২৪ সালে ২৩০টি অভিযানে তিন হাজার ১৪৫টি বন্য প্রাণী জব্দ করা হয়। এর মধ্যে ৯৮টি স্তন্যপায়ী প্রাণী, এক হাজার ২৭৫টি পাখি, এক হাজার ৭৭৪টি সরীসৃপ, দুটি মাছ এবং পাখির চার কেজি নখ।

জাতিসংঘের বন্য প্রাণী সংরক্ষণ বিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) তথ্য মতে, বিশ্বব্যাপী ঝুঁকিপূর্ণ প্রজাতির লাল তালিকার (রেড লিস্ট) প্রায় ২৮ শতাংশ প্রজাতি এখন বিলুপ্তির হুমকির মুখে।

বাংলাদেশ বন বিভাগের তথ্য বলছে, দেশের ৭৩৬টি প্রজাতির পাখির মধ্যে ৪৭টি, ১৫৮টি সরীসৃপ প্রজাতির মধ্যে ৬৩টি, ৪২টি উভচর প্রজাতির মধ্যে বর্তমানে আটটি এবং ১২৪টি স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে ৪৩টির অস্তিত্ব হুমকির মুখে রয়েছে।

ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ড বলছে, ১৯৭০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী এখন পর্যন্ত দুই-তৃতীয়াংশ বন্য প্রাণীর সংখ্যা কমেছে। এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে গেছে ৩১ প্রজাতির প্রাণী। এ ছাড়া দেশে অন্তত ২১৯ প্রজাতির বন্য প্রাণী বিপন্ন। এই তালিকায় রয়েছে উভচর, সরীসৃপ, পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণী।

বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের বন্য প্রাণী পরিদর্শক অসীম মল্লিক বলেন, ‘ধারাবাহিক অভিযানের ফলে চক্রটি অনলাইনে সক্রিয় হয়েছে। অভিযানে যাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়, পরবর্তী সময়ে ছাড়া পেয়ে তারা অনলাইনে বন্য প্রাণী বেচাকেনা শুরু করে। এতে ক্রেতা-বিক্রেতা দুই পক্ষেরই সুবিধা। সময়, অর্থ এবং ধরা পড়ার ঝুঁকি কমেছে। একেক সময় একেক জায়গার ঠিকানা ব্যবহার করে তারা। এসব কারণে অনলাইনের এই চক্রগুলো চিহ্নিত করা বেশ কঠিন। এসব চক্র চিহ্নিত করার পর্যাপ্ত সরঞ্জামও নেই। বন্য প্রাণী বেচাকেনা বন্ধ করতে সরকারের আন্ত বিভাগ যোগাযোগ বাড়ানো এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।’