সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শারজা থেকে আসা দুই যাত্রীর কাছ থেকে গত বছর ১২০টি স্বর্ণের বার ও চারটি স্বর্ণের পেস্টের চাকার প্রায় ১৭.৫ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়। জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) ও শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এই স্বর্ণ জব্দ করেন।
এই ঘটনার পাঁচ দিন পরে জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ে। কিন্তু সেই সময়ের মধ্যে আসামিরা জামিনে মুক্ত হয়ে যায়। তখন রাষ্ট্রপক্ষ নথিপত্র পরীক্ষা করে দেখতে পায় যে ‘১৭’ সংখ্যাটি থেকে ‘৭’ সরিয়ে দিয়ে সুকৌশলে সেটিকে ‘১’ বানানো হয়েছে।
তবে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আইনজীবী সাদিয়া ইয়াসমিন তখন অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, মামলা গ্রহণের সময় নথিপত্রে স্বর্ণের পরিমাণ দেড় কেজিই ছিল।
শুধু এই একটি ঘটনাই নয়, এভাবে বারবার আইন ও প্রশাসনের একটি অংশ চোরাকারবারিদের পক্ষ নেওয়ায় স্বর্ণ চোরাচালানের জন্য বাংলাদেশ দিন দিন একটি নিরাপদ ট্রানজিট রুটে পরিণত হয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই নেটওয়ার্কের শিকড় অত্যন্ত গভীরে। এর সঙ্গে জড়িত দেশের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং বিমান ও সিভিল এভিয়েশনের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা।
আকাশপথ : শাহজালালের ‘সোনালি করিডর’: ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এখন আন্তর্জাতিক স্বর্ণ চোরাচালানের প্রধান আকাশপথ। গত পাঁচ বছরে এখানে প্রায় দুই হাজার কেজি স্বর্ণ জব্দ হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৬৯৭ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়। এরপর ধারাবাহিকভাবে কমেছে, তবে চালানগুলোর আকার বড় হয়েছে।
চলতি বছরেই তিনটি বড় চালান ধরা পড়েছে। ২৮ মার্চ রাতে দুবাই থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-৩৪৮ ফ্লাইটের কার্গো কম্পার্টমেন্টের টয়লেট প্যানেলের ভেতর থেকে সাদা কাপড়ে মোড়ানো ১৫৩টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। ওজন ১৭ কেজি ৯০১ গ্রাম, যার মূল্য প্রায় ৪৬ কোটি টাকা।
২ জুলাই আরেকটি ফ্লাইটের কার্গো হোল্ড থেকে ১৮ কেজি ৭২০ গ্রাম (১৬০টি বার) স্বর্ণ জব্দ হয়, মূল্য প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। ডিজিএফআইয়ের গোপন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়।
১৯ জুলাই নতুন কৌশল ধরা পড়ে। ক্যাথে প্যাসিফিক কার্গো ফ্লাইটে হংকং হয়ে আসা রাম্বুটান, চেরি ও অ্যাভোকাডোভর্তি কাঠের ক্রেট থেকে ১৬ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়, মূল্য প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের নামে চালান আনা হলেও কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
আগস্টেও ধারাবাহিক জব্দ চলছে। ১০ আগস্ট বিমানবন্দরের বাইরে একটি গাড়ি থেকে ১.৮১২ কেজি স্বর্ণের বার ও শিট উদ্ধার করা হয় (মূল্য প্রায় ৩.৭৩ কোটি টাকা)। পরে সেই গাড়ির চালক পালিয়ে যান।
ঢাকা কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত শতাধিক অভিযানে প্রায় দুই হাজার কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে। এর আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে বৈধভাবে আমদানি করা স্বর্ণের বার ও অলংকার থেকে মাত্র দুই হাজার ৩৮ কোটি টাকা শুল্ক-কর আদায় হয়েছে।
দুবাই এখনো স্বর্ণের প্রধান উৎস। ওমান, কাতার, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও হংকং থেকেও স্বর্ণ আসে। প্রবাসীদের ট্যাক্স ও কমিশন দিয়ে ব্যাগেজ রুলের ফাঁক গলে স্বর্ণের বার আনা হয়। পায়ুপথ, জামার সুতা, ইলেকট্রিক ডিভাইসসহ নানা পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। বিমানবন্দরে সিভিল এভিয়েশন, ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের এক শ্রেণির কর্মী অর্থের বিনিময়ে বড় চালান পাস করিয়ে দেন। অনেক সময় সিন্ডিকেটের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বেই চালান ধরা পড়ে।
নোয়াখালীর জয়নাল আবেদীন ১৯৯৬ সালে সৌদি আরবে যান। ২০২১ সালের ১ মে দেশে ফেরার সময় তাঁর কাছ থেকে দুই কেজি ৮১৭ গ্রাম স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে মাত্র ১৭ গ্রাম তিনি পরিবারের জন্য এনেছিলেন। বাকিটা রুমমেট মামুন ও টিকিট এজেন্ট হারুনের দেওয়া মালপত্রের সঙ্গে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। প্রায় ১৯ মাস কারাগারে থাকার পর জামিনে বের হন তিনি। এরই মধ্যে তাঁর মা মারা যান। মায়ের মৃতদেহ দেখার সুযোগও হয়নি জয়নালের। পাসপোর্ট এখনো পুলিশি হেফাজতে। পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তিনি।
স্থলপথ : ভারতমুখী করিডর : বিভিন্ন দেশ থেকে আকাশপথে আসা স্বর্ণের প্রায় ৯০ শতাংশই স্থলপথে ভারতে পাচার হয়ে যায়। মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহসহ ভারত সীমান্তঘেঁষা ৩০টি জেলা এই করিডর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর বড় কারণ হচ্ছে, বাংলাদেশে ১০ গ্রাম স্বর্ণের শুল্ক মাত্র ১৫০ টাকা, কিন্তু সেটা ভারতে প্রায় চার হাজার টাকা। এই ব্যবধানই চোরাকারবারিদের উৎসাহিত করে। ১০টি স্বর্ণের বার পাচার করতে পারলেই প্রায় আট লাখ টাকা লাভ!
যশোর সীমান্ত এখন দুবাই-ঢাকা-ভারত রুটের নিরাপদ পথ হিসেবে পরিচিত। যশোরে ২০২৪ সালে ১৫১ কেজি, ২০২৫ সালে ৬৮.৫ কেজি এবং ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত ২৪ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে। এটি মোট চোরাচালানের ক্ষুদ্র অংশ মাত্র।
বিমানবন্দর থানার তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে (২০২১-২০২৬) স্বর্ণ চোরাচালানের অভিযোগে মোট ৫৪১টি মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২১ সালে ১১৪টি, ২০২২ সালে সর্বোচ্চ ১৩৫টি, ২০২৩ সালে ১১২টি, ২০২৪ সালে ৮৪টি এবং ২০২৫-২৬ সালে ৯২টি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য মতে, ২০২৫ সালে দেশের বিভিন্ন কাস্টম হাউস দিয়ে অবৈধভাবে প্রবেশের সময় ১২ হাজার ৭৭৪ ভরি স্বর্ণ জব্দ বা উদ্ধার করা হয়েছে।
বিজিবি সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সীমান্ত এলাকা ও বিভিন্ন অঞ্চলে অভিযানে ৬০ কেজির বেশি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, জব্দ হওয়া স্বর্ণের পরিমাণ প্রকৃত চোরাচালানের ১০ শতাংশেরও কম।
সিন্ডিকেটের মুখোশ : ২০১৩ সালের ২৪ জুলাই শাহজালাল বিমানবন্দরে দুবাই থেকে আসা উড়োজাহাজ থেকে ১২৪ কেজি (১,১৬৫টি বার) স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। এর তৎকালীন মূল্য ৫৪ কোটি টাকা। এতে বিমানের প্রকৌশল বিভাগের ১০ জনসহ ১৪ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়।
২০১৪ সালের ২৬ এপ্রিল উড়োজাহাজের সাতটি টয়লেট কমোড থেকে ১০৫ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়। ১২ নভেম্বর কেবিন ক্রু মাজহারুল আফসার রাসেল ২.৬ কেজি স্বর্ণসহ আটক হন। তাঁর জবানবন্দিতে বিমানের ফ্লাইট শিডিউলিং প্রধানসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা গ্রেপ্তার হন। তাঁরা স্বীকার করেন, মন্ত্রী-এমপি, প্রভাবশালী ব্যবসায়ীসহ অন্তত ৫৬ জন বড়মাপের মানুষ এই কারবারের সঙ্গে জড়িত।
২০১৭ সালে আপন জুয়েলার্সের পাঁচ শোরুমে অভিযান চালিয়ে প্রায় ৫০০ কেজি স্বর্ণ ও আধা কেজি হীরা জব্দ করা হয়। মালিকপক্ষ কোনো বৈধ রসিদ দেখাতে পারেনি।
২০২৫ সালে দুদক ও সিআইডি ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের মালিক দিলীপ কুমার আগরওয়ালা এবং সাবেক বাজুস সভাপতি এনামুল হক খান দোলনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ স্বর্ণ-হীরা চোরাচালানের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা কামিয়ে ভারত ও অস্ট্রেলিয়ায় শোরুম খোলা এবং কাস্টমারদের নকল পাথর গছানোর।
সিআইডি আগরওয়ালার বিরুদ্ধে ৬৭৮ কোটি টাকার মানি লন্ডারিং মামলা করেছে। অভিযোগ, বৈধ আমদানি মাত্র ৩৮.৪৭ কোটি টাকার, অথচ স্থানীয় বাজার থেকে ৬৭৮ কোটি টাকার স্বর্ণ-হীরা সংগ্রহ করা হয়েছে, যার কোনো বৈধ দলিল নেই।
অর্থনৈতিক ক্ষতি ও নীতির ফাঁক : দেশে স্বর্ণের বার্ষিক চাহিদা ২০ থেকে ৪০ টন। এর প্রায় ৮০ শতাংশই চোরাই স্বর্ণ দিয়ে মেটানো হয়। বৈধ আমদানি নগণ্য। ব্যাগেজ রুলের অপব্যবহার, উচ্চ শুল্ক ব্যবধান এবং অভ্যন্তরীণ সহায়তা—এই তিনটি কারণে চোরাচালান থামছে না।
দেশে চাহিদার দ্বিগুণেরও বেশি পরিমাণ স্বর্ণ শুল্কায়নের মাধ্যমে ঢুকছে। ২০২২ সালে শুল্কায়নের মাধ্যমে অন্তত ৫৪ টন স্বর্ণ ঢুকেছে, যা চাহিদার প্রায় দ্বিগুণ। এর বাজারমূল্য ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এর বেশির ভাগই স্থলপথে অন্য দেশে পাচার হয়ে যায়। বৈধ পথে আসা স্বর্ণও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত করছে, কারণ যাত্রীরা স্বর্ণের বদলে ডলার আনলে তা দেশের ব্যাংকব্যবস্থায় যুক্ত হতো।
বাজুস বারবার দাবি জানিয়েছে ব্যাগেজ রুল সংশোধন, এক যাত্রীর বছরে একবারের বেশি স্বর্ণ আনার সুযোগ বন্ধ, সীমান্ত ও বিমানবন্দরে কঠোর নজরদারি এবং বিশেষ মনিটরিং সেল গঠনের।
স্বর্ণ চোরাচালান শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তা, রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থার ওপর সরাসরি আঘাত। সিন্ডিকেটের শিকড় যত গভীরে, ততই প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের। তা না হলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক স্বর্ণ চোরাচালানের ‘নিরাপদ হাব’ হিসেবেই পরিচিত থাকবে।
বাংলাদেশ জুয়েলারি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) মুখপাত্র আনোয়ার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা চোরাচালান রোধে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে অনেক আগে থেকেই বলে আসছি। বর্তমান সরকারকেও বিষয়গুলো নিয়ে আমরা বলছি। আমরা চাই, বাংলাদেশে অবৈধ পথে স্বর্ণ আসা কিংবা চালান হওয়া বন্ধ হোক, প্রতিটি জিনিসই বৈধভাবে হোক। এতে যেমন আমরা ব্যবসায়ীরা উপকৃত হব, তেমনি সরকারও রাজস্ব হারাবে না।’
তিনি আরো বলেন, বর্তমানে জুয়েলারিশিল্প একটি নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে স্বর্ণের দামের অত্যধিক ওঠানামার কারণে সাধারণ ক্রেতারা গয়না কেনা কমিয়ে দিয়েছেন। এর মধ্যে যদি অবৈধভাবে স্বর্ণ চোরাচালান ঘটতে থাকে, তাহলে সত্ভাবে ব্যবসা করা এই খাতের ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।