প্রায় ২০ বছর পর দেশ পরিচালনার দায়িত্ব এসে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও ব্যবসাবাণিজ্যে গতি ফেরানোকেই প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিল বিএনপি সরকার। সেই লক্ষ্যে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ছয় মাসে ব্যবসাবাণিজ্য ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছিল সরকার। এ সময় জ্বালানিসংকট, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মতো একাধিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ব্যবসা সহজীকরণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং রপ্তানি সম্প্রসারণে একের পর এক সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এজন্য আর্থিক ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্র প্রসার করতে ব্যাপকভিত্তিক সংস্কার কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়।
১৮০ দিন পর এতে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে বিনিয়োগ ও রপ্তানিতে আশার আলো দেখছেন তারা। মেয়াদের শুরুতে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজীকরণ করা হবে। ২৪ ঘণ্টা বন্দরসেবা চালু করা হবে। কর ব্যবস্থায় সংস্কার আনা হবে। জ্বালানি নিরাপত্তা ও নতুন শিল্পে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এখন পর্যন্ত এসব ক্ষেত্রে বেশ অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, এ পরিবর্তন ইতিবাচক, এবার এর দৃশ্যমান ফলাফলের অপেক্ষা। ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, প্রথম ছয় মাসে সরকার ব্যবসাবান্ধব সংস্কারের একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে। ব্যবসায়ী সমাজও সেই প্রচেষ্টাকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। তবে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রপ্তানিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে হলে এখন প্রয়োজন দ্রুত বাস্তবায়ন, সমন্বয় এবং ধারাবাহিকতা।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রথম মতবিনিময় সভায় গৃহীত ২৮টি সিদ্ধান্তের মধ্যে ২১টি বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন। অর্থাৎ সংস্কার শুধু ঘোষণায় সীমাবদ্ধ নেই, বাস্তবায়নের ধাপেও প্রবেশ করেছে। ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, দীর্ঘদিন পর সরকার ও বেসরকারি খাতের মধ্যে কার্যকর সংলাপ শুরু হয়েছে, যা আস্থা পুনর্গঠনে সহায়তা করছে। প্রথম ছয় মাসে সরকারের ব্যবসাবান্ধব সংস্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ১০টি অর্জন ঘিরেই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত প্রথম মতবিনিময় সভায় নেওয়া ২৮টি সিদ্ধান্তের মধ্যে ২১টি বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে লাইসেন্স সংস্কার, বন্দরসেবা, কর ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, জ্বালানি সরবরাহ, বিনিয়োগ সহজীকরণ এবং নতুন শিল্প খাত বিকাশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, নীতিগত ঘোষণা থেকে বাস্তবায়নের দিকে অগ্রসর হওয়াই সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক।
১৪ দিনের মধ্যে লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ : দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা শুরু ও সম্প্রসারণের অন্যতম বাধা ছিল বিভিন্ন লাইসেন্স ও অনুমোদন পেতে মাসের পর মাস অপেক্ষা। এ সমস্যা সমাধানে ব্যবসায়িক লাইসেন্সের সংখ্যা কমানো এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন সর্বোচ্চ ১৪ দিনের মধ্যে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য উচ্চপর্যায়ের কমিটি কাজ করছে। ব্যবসায়ীরা মনে করেন, এটি কার্যকর হলে বিনিয়োগের গতি বাড়বে এবং উদ্যোক্তাদের ব্যয় কমবে।
২৪ ঘণ্টা বন্দর, কাস্টমস ও ব্যাংকিং সেবা : রপ্তানি-আমদানিতে সময় ও ব্যয় কমাতে কাস্টমস, বন্দর এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকিং সেবা ২৪ ঘণ্টা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন্দর এলাকায় এরই মধ্যে এর পাইলটিং শুরু হয়েছে। রপ্তানিকারকদের মতে, বন্দরে পণ্য আটকে থাকার সময় কমলে সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা শক্তিশালী হবে।
এলসি নির্ভরতা কমিয়ে নতুন বাণিজ্য ব্যবস্থা : আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ওপেন অ্যাকাউন্ট ট্রেড, ডকুমেন্টারি কালেকশন এবং সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্সিংয়ের সুযোগ সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এর ফলে ব্যবসায়ীদের কার্যকর মূলধনের ওপর চাপ কমবে এবং আন্তর্জাতিক লেনদেন আরও সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গ্যাস সংকট সমাধানে ডেডিকেটেড এফএসআরইউ : শিল্প খাতের দীর্ঘদিনের প্রধান অভিযোগ গ্যাস সংকট। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় মহেশখালীতে শিল্পের জন্য ডেডিকেটেড এফএসআরইউ স্থাপনের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিকল্প গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার সম্ভাবনাও যাচাই করা হচ্ছে।
তবে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী মনে করেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সময় লাগবে। গত রবিবার অ্যামচ্যাম আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যা সমাধানে ন্যূনতম দুই বছর সময় লাগতে পারে।
কর ও কাস্টমস সংস্কার : ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কার্যক্রম পৃথক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে করনীতি প্রণয়নে বিশেষজ্ঞ ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। কাস্টমস মূল্যায়নে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। এতে ব্যবসা খাতে স্বচ্ছতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতা বাড়বে বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা।
বন্ড লাইসেন্সের মেয়াদ ৫ বছর : রপ্তানিমুখী শিল্পের অন্যতম দাবি ছিল বন্ড লাইসেন্স নবায়নের ঝামেলা কমানো। সরকার বন্ড লাইসেন্সের মেয়াদ প্রথমবারের মতো তিন বছর থেকে বাড়িয়ে পাঁচ বছর করেছে। পাশাপাশি অনলাইন নবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি রপ্তানিকারকদের প্রশাসনিক ব্যয় ও সময় কমাবে।
নতুন শিল্পে প্রণোদনা : প্রচলিত শিল্পের বাইরে সেমিকন্ডাক্টর, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক সুবিধা এবং সৌরশক্তি খাতে কর ছাড় দেওয়া হয়েছে। বগুড়ায় লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং হাব গড়ে তোলার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ ভবিষ্যতে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যকে একক অনন্য মাইলফলকে নিয়ে যাবে বলে মনে করে সরকার।
বিদেশি বিনিয়োগ সহজ করতে ই-ভিসা : বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ই-ভিসা ও অন-অ্যারাইভাল ভিসা সহজীকরণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণে দ্রুত ভিসা সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ উদ্যোগ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হতে পারে।
১০০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্য : সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি সেমিকন্ডাক্টর, আইসিটি, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং এসএমই খাতকে এ লক্ষ্য অর্জনের নতুন চালিকাশক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ব্যবসায়ী নেতাদের মূল্যায়ন : বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, গত ছয় মাসে সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়ী সমাজের যোগাযোগ বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত সাড়া পাওয়া যাচ্ছে এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধানও হয়েছে। তবে তিনি মনে করেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি ব্যবসার জন্য সবচেয়ে জরুরি।
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যবসায়ী সমাজে আস্থা ফিরে এসেছে। সরকার জ্বালানি ও ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ও বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, মধ্যপ্রাচ্য সংকট, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানিসংকট এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও ব্যবসা সহজীকরণ, টাস্কফোর্স গঠন এবং ব্যাংকিং খাত পুনরুদ্ধারে সরকারের উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে প্রকৃত মূল্যায়নের সময় এখনো আসেনি। কারণ বেশির ভাগ সংস্কার উদ্যোগ এখনো বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ উন্নয়ন, প্রশাসনিক জটিলতা কমানো, কর ব্যবস্থাকে আরও সহজ করা এবং মাঠপর্যায়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।