দীর্ঘ ৩৫ বছর পর সংসদ সদস্যদের ভোটে দেশের ২৩তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ৩৪৯ ভোটারের মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৫৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। ৮৮ ভোট পেয়ে পরাজিত হন কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম। ভোট পড়েছে মোট ৩৪৩টি। ভোটদানে বিরত থাকেন ৬ জন এমপি। গতকাল রাতেই নির্বাচন কমিশন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। মির্জা ফখরুল প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর অভিনন্দনের জোয়ারে ভাসছেন। প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন নতুন প্রেসিডেন্টকে অভিনন্দন জানিয়েছে।
বাংলাদেশের ২৩তম প্রেসিডেন্ট মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ক্ষমতাসীন দল বিএনপির ৩৫ বছর পর সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হলেন। এর আগে প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির শাসনব্যবস্থা থেকে সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনের পর ১৯৯১ সালে সংসদ সদস্যের সরাসরি ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস। ওই সময় আওযামী লীগের প্রার্থী ছিলেন বদরুল হায়দার চৌধুরী।
দেশের ২৩তম প্রেসিডেন্ট মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে নির্বাচিত ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গতকাল সন্ধ্যায় এ প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আইন, ১৯৯১ (১৯৯১ সালের ২৭ নম্বর আইন)-এর ধারা ১১ অনুসারে নির্বাচনি কর্তা ও নির্বাচন কমিশনারের ঘোষণা মোতাবেক মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন বিধিমালা, ১৯৯১-এর বিধি ১২(৬) অনুযায়ী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হয়েছেন বলে ঘোষণা করা হলো।
নতুন প্রেসিডেন্ট মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে লাল গোলাপ ফুল দিয়ে প্রথমেই শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আজ শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনে শপথ নেবেন বলে জানা গেছে। দেশের ২৩তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন বঙ্গভবন থেকে বিদায় নেয়া ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, ডিপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে বিএনপির প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও ভোট দিয়েছেন।
পরে ভোট দেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তবে সংসদ সদস্য না হওয়ায় জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ ভোট দিতে পারেননি। বেলা ২টায় জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়। এর আগে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হাফিজ উদ্দিন আহমদকে (বীর বিক্রম) রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে বিদায় জানিয়েছেন বঙ্গভবনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।
বঙ্গভবনে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের শেষ কর্মদিবস উপলক্ষে গতকাল সকাল সাড়ে ১১টায় সেনাবাহিনীর প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের (পিজিআর) একটি সুসজ্জিত চৌকস দল তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করে। এর আগে তিনি বঙ্গভবনের দর্শনার্থী বইয়ে স্বাক্ষর করেন। এরপর বঙ্গভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর গত ২৪ জুলাই হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম) ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
ভোটের আগেই ফলাফল কার্যত নির্ধারিত ছিল নির্বাচনে কোন প্রার্থী নির্বাচিত হবেন। কারণ সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা আছে, কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী মনোনীত হয়ে কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে ওই দল থেকে পদত্যাগ করলে তার সংসদ সদস্য পদ শূন্য হবে। এ ছাড়া নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দিলেও সংসদ সদস্য পদ থাকবে না। তবে একবার শূন্য হওয়ার পর পরবর্তী সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সেই নির্বাচনে আবার অংশ নিতে কোনো বাধা নেই।
নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব পালনে সততা, নিরপেক্ষতা, ন্যায়বোধ এবং জাতীয় স্বার্থের প্রতি অবিচল থাকার প্রত্যাশা করেন। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট সমগ্র জাতির ঐক্য, মর্যাদা ও আস্থার প্রতীক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেনÑ এটাই সকলে প্রত্যাশা করে অলি আহমদ নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্টের সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু, উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ও সর্বাঙ্গীণ সাফল্য কামনা করেন। মহান আল্লাহ তাঁকে গুরুদায়িত্ব পালনে সহায়তা করবেন বলেও আশা প্রকাশ করেন।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অভিনন্দন জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অন্তত দীর্ঘদিনের একটি সীমাবদ্ধতা থেকে দেশকে বের করে এনেছে। এদিকে বাংলাদেশের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অভিনন্দন জানিয়েছে চীন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার সম্পর্ক আরো গভীর করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে দেশটি। বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছে যুক্তরাজ্য।
গতকাল বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রধান নির্বাচনী কর্মকর্তা ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন ভোট গণনা শেষে প্রেসিডেন্ট হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম ঘোষণা করেন। এর আগে দেশের ২৩তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে বেলা ২টা থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। বিকেল ৫টায় ভোট গণনা শেষে ঐতিহাসিক এই নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়। ভোটগ্রহণের শুরুতে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম, জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও প্রেসিডেন্ট পদে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও বিএনপির সদ্য সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভোট দেন। এরপর ভোট দেন সংসদ সদস্যরা। সিইসি জানান, এ বিষয়ে দ্রুত গেজেট প্রকাশ করা হবে।
বাংলাদেশের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অভিনন্দন জানিয়েছে চীন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার সম্পর্ক আরো গভীর করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে দেশটি। চীনের পক্ষ থেকে দেয়া এক অভিনন্দন বার্তায় বলা হয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হওয়ায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে আন্তরিক অভিনন্দন। বার্তায় আরো বলা হয়, চীন বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। নতুন যুগে দুই দেশের অভিন্ন ভবিষ্যৎ নির্মাণে বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে প্রস্তুত রয়েছে বেইজিং। চীন আশা প্রকাশ করেছে, পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে দুই দেশ ও দুই দেশের জনগণের জন্য আরো বেশি কল্যাণ বয়ে আনা সম্ভব হবে।
এদিকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী অলি আহমদ। সেই সঙ্গে মির্জা ফখরুলের সুস্বাস্থ্য ও সাফল্য কামনা করেছেন তিনি।
গতকাল এক বিবৃতিতে অলি আহমদ বলেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক সহযাত্রায় আমরা উভয়ে প্রায় সময় একসঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছি।
সুতরাং গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, নাগরিক অধিকার ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে আমাদের বিশ্বাস ও অঙ্গীকার অভিন্ন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ১৯৯১ সালের পর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন দীর্ঘদিন প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন থেকেছে। ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে বিকল্প নেতৃত্ব, অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি জাতীয় সংসদ ও জনগণের সামনে বিবেচিত হওয়ার সুযোগ ছিল না। ৩৫ বছর পর এবারের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অন্তত সেই সীমাবদ্ধতা থেকে বের হয়েছে। ১১ দলীয় ঐক্য আমাকে প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করে এই গণতান্ত্রিক পরিসর সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, তার জন্য জোটের নেতৃবৃন্দ ও সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই।’
অলি আহমদ বলেন, এবারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেবল ক্ষমতাসীন দলের সিদ্ধান্তের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনে সীমাবদ্ধ না রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। কারণ এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ফল ও দায় কোনো ব্যক্তি বা দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা দেশ ও জনগণের জীবনে প্রতিফলিত হয়। তিনি উল্লেখ করেন, জাতির এই সন্ধিক্ষণে প্রেসিডেন্ট হিসেবে আপনার প্রতিটি সিদ্ধান্ত দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, গণতান্ত্রিক চর্চা ও জনগণের আস্থার ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।
ব্যক্তি, দল ও গোষ্ঠীগত বিবেচনার ঊর্ধ্বে থেকে দেশ ও নাগরিকদের বৃহত্তর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবেন এ প্রত্যাশা করি। বিশেষত গণভোটে জনগণ রাষ্ট্রীয় সংস্কারের পক্ষে যে রায় দিয়েছে তার প্রতি সম্মান, জবাবদিহি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় সংলাপের প্রশ্নে আপনার নিরপেক্ষ ও সক্রিয় অবস্থান দেশবাসী প্রত্যাশা করে। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সম্পন্ন হলেও জনগণের অধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, জবাবদিহি ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার সংগ্রাম শেষ হয় না।
রাষ্ট্রীয় পদ বা নির্বাচনী ফলাফলের ঊর্ধ্বে দেশ ও জনগণের প্রতি আমার দীর্ঘদিনের অঙ্গীকার অবিচল থাকবে। অলি আহমদ বলেন, আপনার দায়িত্ব পালন হোক সততা, নিরপেক্ষতা, ন্যায়বোধ এবং জাতীয় স্বার্থের প্রতি অবিচল অঙ্গীকারে। আপনি সমগ্র জাতির ঐক্য, মর্যাদা ও আস্থার প্রতীক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেনÑ এই প্রত্যাশা রাখি। আপনার সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু, উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ও সর্বাঙ্গীণ সাফল্য কামনা করি। মহান আল্লাহ আপনার এ গুরুদায়িত্ব পালনে সহায় হোন।’
ঢাকার ব্রিটিশ হাইকমিশনের এক বার্তায় বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছে যুক্তরাজ্য। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুকের পুরোনো একটি ছবি পোস্ট করে বার্তায় আরো বলা হয়, দুই দেশের মধ্যকার ঘনিষ্ঠ ও দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্বকে আরো সুদৃঢ় করতে যুক্তরাজ্য প্রেসিডেন্ট মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কাজ করার প্রত্যাশা করছে।
জামায়াতের অভিনন্দন : প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অভিনন্দন জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অন্তত দীর্ঘদিনের একটি সীমাবদ্ধতা থেকে দেশকে বের করে এনেছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচন প্রসঙ্গে অলি আহমদ বলেন, বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের পর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন দীর্ঘদিন প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন থেকেছে। ফলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই পদে বিকল্প নেতৃত্ব, অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি জাতীয় সংসদ ও জনগণের সামনে বিবেচিত হওয়ার সুযোগ ছিল না। ৩৫ বছর পর এবারের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অন্তত সেই সীমাবদ্ধতা থেকে বেরিয়ে এসেছে।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ৬ এমপি ভোট দেয়নি : প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ৬ এমপি ভোট দেননি। এর মধ্যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অসুস্থতার কারণে ভোট দিতে না আসার কথা জানিয়ে ইতোমধ্যে ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের কাছে চিঠি দিয়েছেন ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাস ও চট্টগ্রাম-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তফা কামাল পাশা। বিএনপির সংসদ সদস্য কিশোরগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ওসমান ফারুক।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ৬ এমপি ভোট দিতে পারেননি। জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষে প্রকাশ্যে ভোট গণনা করা হয়। পরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও নির্বাচনী কর্মকর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফল ঘোষণা করেন।
জামায়াতের সাতক্ষীরা-৪ আসনের বিতর্কিত সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ভোট দিতে আসেননি। খেলাফত মজলিসের আবুল হাসানও ভোট দিতে আসেননি। তবে আবুল হাসান বিদেশে অবস্থান করায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দিতে আসেননি বলে জানিয়েছেন দলের মহাসচিব আহমদ আব্দুল কাদের। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে নির্বাচিত স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা ভোট দিতে আসেননি। ভোটদানে বিরত থাকার বিষয়ে রুমিন ফারহানা গণমাধ্যমকে বলেন, এই নির্বাচন অর্থহীন এবং প্রহসনের। বিএনপির আসলাম চৌধুরীর সংসদ সদস্য পদ আদালতের রায়ে বাতিল হয়েছে।
ফলে বর্তমান সংসদে সংরক্ষিত নারীসহ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য। ভোট চলাকালে ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব গাজী আতাউর রহমানের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়, দলটির একমাত্র সংসদ সদস্য মাওলানা মাহমুদুল হোসাইন অলিউল্লাহ ভোটদানে বিরত থাকবেন। কারণ হিসেবে দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট নির্বাচন বিষয়ে জুলাই সনদে ঐকমত্য হওয়া সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসায় এই নির্বাচনে ভোট দেবে না ইসলামী আন্দোলন। তবে পরে ইসলামী আন্দোলনের সংসদ সদস্য ভোট দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
এর আগে বেলা ২টায় পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কার্যক্রম শুরু হয়। বক্তব্যের শুরুতেই মাইক বিভ্রাটে পড়েন সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন। পরে তিনি দুই প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেন এবং নির্বাচন পরিচালনার নিয়মাবলি সংসদ সদস্যদের সামনে তুলে ধরেন। এরপর নির্বাচনী সহায়ক কর্মকর্তারা সংসদ সদস্যদের আসনে ব্যালট পেপার নিয়ে যান। সদস্যরা নিজ নিজ আসনে বসে পূর্ণ নাম স্বাক্ষর করে পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে ভোট দেন।
প্রথম ভোট দেন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। এরপর ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ সংসদ সদস্যরা ভোট দেন। সরকারদলীয় প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও ভোট প্রদান করেন। জাতীয় সংসদের ৩৪৯ জন সদস্য এই নির্বাচনে ভোট দেয়ার কথা ছিল। তবে অসুস্থতার কারণে বিএনপির সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাস ভোটে অংশ নিতে পারেননি। আর সংসদ সদস্য না হওয়ায় ভোট দেওয়ার সুযোগ ছিল না কর্নেল (অব.) অলি আহমদের। ভোটগ্রহণের জন্য তিনটি ব্যালট বাক্স রাখা হয়।
সংসদ সদস্যদের পর্যায়ক্রমে ব্যালট পেপার দেওয়া হয়, যাতে ভোটগ্রহণে ভিড় না হয়। ব্যালট পেপারে দুই প্রার্থীর নাম ছিল। ভোট দিয়ে নির্ধারিত স্থানে স্বাক্ষর করে ব্যালট বাক্সে জমা দেন সংসদ সদস্যরা। ভোটগ্রহণ পরিচালনা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। নির্বাচন কমিশন ও সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ সময় দায়িত্ব পালন করেন। ভোটগ্রহণের শুরুতে প্রথম ২০ মিনিট সরাসরি সম্প্রচারও করা হয়। বিকাল ৫টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর ব্যালট বাক্স খোলা হয়। এরপর প্রকাশ্যে ভোট গণনা শেষে ফলাফল ঘোষণা করা হয়।
১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট পদে সরাসরি ভোট হয়েছিল। এরপর ১৯৯৬, ২০০১, ২০০২, ২০০৯, ২০১৩, ২০১৮ ও ২০২৩ সালে একাধিক প্রার্থী না থাকায় ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয়নি। ফলে ৩৫ বছর পর আবার সংসদ সদস্যদের ব্যালটের মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলীয় প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জয় অনেকটাই প্রত্যাশিত ছিল। তবে এবারের নির্বাচনে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল দুই প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান। নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আজ শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনে শপথ নেবেন বলে জানিয়েছেন সরকারদলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি।