ইরান ও ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান জ্বালানি ‘ডিজেল’-এর সরবরাহ বিশ্বব্যাপী ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ডিজেলের বাজার এতই সংকুচিত হয়ে পড়েছে যে চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ-উভয় অঞ্চলেই ‘ডিজেল ক্রাক স্প্রেড’ (অর্থাৎ এক ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং তা থেকে পরিশোধিত ডিজেলের মূল্যের মধ্যকার পার্থক্য) ব্যারেলপ্রতি রেকর্ড ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে।
চলমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়া থেকে ডিজেল রপ্তানিও ৫০ শতাংশ কমেছে। বিশ্বব্যাপী মজুতকারীদের কাছে ডিজেলের মজুতও কমে আসছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, আসছে শীত মৌসুমের আগে অর্থাৎ শরতে এবার ডিজেলের দাম বৃদ্ধি পাবে। যার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের বাজারেও। কারণ সরকারের আমদানীকৃত তেলের মধ্যে ৭০ শতাংশই ডিজেল।
আর এমনটি হলে দেশের পরিবহন খাত, পণ্য বহনকারীসহ সব খাতেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। যা মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। জ্বালানিবিষয়ক স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক জার্নাল অয়েলপ্রাইস ডটকমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের অস্থিরতার কারণে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থায় গত কয়েক মাসে চরম বিঘ্ন ঘটার পরও জ্বালানি তেলের বাজার এই সময়ে বড় দাগে অস্থিতিশীল হয়ে ওঠেনি, বরং এ বাজার এক ধরনের নিশ্চিন্ত ভাব বজায় রেখেছে।
এমনকি ছয় মাস ধরে যখন হরমুজ প্রণালি দিয়ে ট্যাংকার চলাচল যুদ্ধের আগের তুলনায় একেবারেই কমে এসেছে, তখনো অপরিশোধিত তেলের ফিউচার প্রাইস খুব কমই ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের গতি অতিক্রম করেছে। সূত্রের তথ্যানুযায়ী, ভবিষ্যতে অপরিশোধিত তেলের দাম কেমন হবে- তা নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে বাজারের সংশ্লিষ্টরা সংঘাতের অবসানের ওপর অনেক বেশি নির্ভর করলেও বাস্তবে ডিজেলের সরবরাহ সংকুচিত হয়ে আসছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ডিজেলের বাজার এতটাই সংকুচিত হয়ে পড়েছে যে, এ সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ-উভয় অঞ্চলেই ‘ডিজেল ক্রাক স্প্রেড’ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।
সূত্র বলছে, অপরিশোধিত তেলের বাজার থেকে স্বল্পমেয়াদি সরবরাহ নিয়ে ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশার বিষয়টি বোঝা গেলেও ডিজেলের বাজারগুলো এই পেট্রোলিয়াম পণ্যটির বাস্তব ও তীব্র ঘাটতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন পর্যন্ত চলতি বছরে ডিজেলের চাহিদা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল কিন্তু ডিজেলের প্রাপ্যতা ও দাম অর্থনীতি এবং মুদ্রাস্ফীতিকে সরাসরি প্রভাবিত করে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ‘ডিজেল ক্রাক ¯েপ্রড’ (অপরিশোধিত তেল ও ডিজেলের মূল্যের পার্থক্য) এ সপ্তাহে প্রথমবারের মতো তিন অঙ্কের ঘরে পৌঁছেছে। গত সোমবার অপরিশোধিত তেলের মূল্যের তুলনায় ডিজেলের বাড়তি দর ব্যারেলপ্রতি সর্বোচ্চ ১০২ ডলারে উঠে গিয়েছিল।
তবে গত মঙ্গলবার তা কিছুটা কমে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলারে নেমে আসে। ‘ভর্টেক্সা’-এর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়া থেকে ডিজেল ও গ্যাস-অয়েল রপ্তানি ৫০ শতাংশেরও বেশি কমে গেছে। এখন দৈনিক প্রায় ৩৩ লাখ ব্যারেল থেকে কমে মাত্র ১৬ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে ডিজেলের সরবরাহ পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে। কারণ একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে মজুত কমছে, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অপর্যাপ্ত হয়ে পড়েছে।
এর ফলে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের গড় দাম এখন প্রতি গ্যালন ৫ দশমিক ৪৭ ডলার, যা এক মাসের ব্যবধানে ৮ শতাংশ এবং গত বছরের গড় দাম ৩ দশমিক ৬৯ ডলারের তুলনায় ৪০ শতাংশেরও বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে আগামী সপ্তাহগুলোতে ডিজেলের চাহিদা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ কৃষকরা সেখানে ফসল তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, ছুটির মৌসুমের জন্য দোকানগুলোতেও পণ্য সরবরাহে ট্রাকচালকদের ব্যস্ততা বাড়ছে এবং শীতকালে ঘর উষ্ণ রাখার জ্বালানি হিসেবে সাধারণ মানুষ ডিজেল কিনতে শুরু করেছেন।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশ্লেষকদের ধারণা, উচ্চমূল্যের কারণে পেট্রোলের চাহিদা কিছুটা কমতে পারে। তবে ডিজেলের চাহিদা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল বা মূল্য-অসংবেদনশীল। এনার্জি অ্যাসপেক্টসের রবার্ট ক্যাম্পবেল সম্প্রতি ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, ‘ডিজেল হলো শিল্প-অর্থনীতির প্রাণশক্তি; তাই চাইলেই এর ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া যায় না। অর্থনীতির জন্য এ জ্বালানি অপরিহার্য। আসছে শরৎকালে এর দাম আরও বাড়তে পারে, যা পণ্যের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াবে এবং যুক্তরাষ্ট্রে নভেম্বরের শুরুর দিকের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ভোক্তাদের পকেটের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।
বাংলাদেশে প্রভাব : বাংলাদেশ সরকারের আমদানীকৃত তেলের মধ্যে যেহেতু ৭০ শতাংশই ডিজেল। এজন্য ডিজেলের দামের ওপরই সবকিছু নির্ভর করে। ডিজেলের সংকট হলে একদিকে ঝুঁকিতে পড়ে পোশাক খাত। তেমনি খাদ্য উৎপাদনও হুমকিতে পড়ে, বোরো আবাদ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে কৃষক। আবার বন্দর থেকে শিল্প এলাকায় পণ্য পৌঁছাতে ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানের ভাড়ায়ও এর প্রভাব পড়ে। ডিজেলের সংকটে বাস-ট্রাক চলাচলের ওপরও প্রভাব ফেলে।
আবার এ জ্বালানি না পেলে সমুদ্রে মাছ ধরতে যেতে পারেন না জেলেরাও। তেলের সংকটে হুমকিতে পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনও। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ডিজেলের দাম বৃদ্ধি পেলে স্বাভাবিকভাবেই পরিবহন খাতে দাম বৃদ্ধি পাবে। আর পণ্য বহনকারী সব খাতেই এর প্রভাব পড়বে। আর এমন হলে তা মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। হিসাব করে জ্বালানি তেলের দাম কী পরিমাণ বৃদ্ধি হবে তা বের করা যায়, কিন্তু এটি বের করে সরকার যে তা বাস্তবায়ন করবে সে রকম কোনো মেকানিজম নেই।