Image description

তীব্র গ্যাস - সংকট , যান্ত্রিক ত্রুটি এবং কাঁচামালের সংকটে চট্টগ্রামের তিনটিসহ দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি সার কারখানা বন্ধ রয়েছে । শুধু একটি কারখানা উৎপাদনে রয়েছে । এতে সামনের আমন মৌসুমে সার সরবরাহ নিয়ে কৃষকসহ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে তৈরি হয়েছে চরম উদ্বেগ । মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে সেখান থেকে সার আমদানি নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে । তবে কৃষি মন্ত্রণালয় দাবি করছে , দেশে সারের সংকট নেই । যথেষ্ট মজুত রয়েছে । এ ছাড়া চলতি মাসেই আমদানি করা সার দেশে আসবে । সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের ( বিসিআইসি ) অধীনে দেশে সাতটি সার কারখানা রয়েছে । বন্ধ কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড ( সিইউএফএল ) , যমুনা ফার্টিলাইজার

গ্যাস ও কাঁচামালের সংকট » চাহিদা অনুপাতে সারের মজুত কম : কৃষি মন্ত্রণালয় » সংকট নেই , তিন দেশ থেকে আসছে সার : কৃষিসচিব » নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ কৃষি অর্থনীতিবিদের । » কোথাও কোথাও দোকানে মিলছে না সার , অভিযোগ কৃষকের । কোম্পানি লিমিটেড ( জেএফসিএল ) , আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি ( এএফসিএল ) , ট্রিপল সুপার ফসফেট ( টিএসপি ) , ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড ( ডিএপিএফসিএল ) এবং শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি ( এসএফসিএল ) । শুধু ঘোড়াশাল পলাশ ফার্টিলাইজার পিএলসি ( জিপি ) সার কারখানা উৎপাদনে আছে । এ বিষয়ে বিসিআইসির পরিচালক

( বাণিজ্য ) মো . মনিরুজ্জামান আজকের পত্রিকাকে বলেন , বিসিআইসির সাত সার কারখানার মধ্যে ছয়টি বন্ধ রয়েছে । তবে দু - এক দিনের মধ্যে সিলেট শাহজালাল ফার্টিলাইজার সার কারখানা আবার উৎপাদনে যাবে । উৎপাদন বন্ধ থাকলেও কারখানাটি ‘ শাটডাউন ' করা হয়নি । আগামী আমন উৎপাদনে সারের কোনো ঘাটতি হবে না । কাতার ও সৌদি আরব থেকে হরমুজ প্রণালি

এড়িয়ে বিকল্প পথে সার আমদানি করা হচ্ছে । রাশিয়া ও ব্রুনেই থেকেও সার আমদানির আলোচনা চলছে । বিসিআইসির সাতটি কারখানার দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার ১০০ টন । দৈনিক ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টন ইউরিয়া উৎপাদনে সক্ষম সিইউএফএল গ্যাস- সংকটের কারণে গত ফেব্রুয়ারি থেকে বন্ধ । আগামী মাসের প্রথম থেকে সিইউএফএল চালু হতে পারে বলে জানান কারখানাটির জেনারেল ম্যানেজার ( বাণিজ্য ) আবদুল্লাহ আল মামুন । জেএফসিএলের উৎপাদনও গ্যাসের অভাবে গত ফেব্রুয়ারি থেকে বন্ধ রয়েছে । এর আগে তিন মাস চালু থেকে এক বছর বন্ধ ছিল কারখানাটি । জেএফসিএলে দৈনিক ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টন ইউরিয়া উৎপাদিত হয় বলে জানান ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার ( বাণিজ্য ) মো . জাকির হোসেন । কাঁচামালের সংকটে

৭ সার কারখানার

গত বছরের নভেম্বর থেকে টিএসপি কারখানা এখন পর্যন্ত বন্ধ । এর জেনারেল ম্যানেজার ( অপারেশন ) রোকন উদ্দিন সামস বলেন , ‘ কখন চালু হবে , তা বলা যাচ্ছে না । এই কারখানায় দৈনিক ২০০ থেকে ৩০০ টন টিএসপি সার উৎপাদিত হয় । '

একই গ্যাসের অভাবে গত বছরের ১ মার্চ থেকে আশুগঞ্জ সার কারখানা বন্ধ রয়েছে । এই কারখানায় দৈনিক ১ হাজার ১০০ টন সার উৎপাদিত হয় । এ বিষয়ে কারখানার উপমহাব্যবস্থাপক ( উৎপাদন ) এ বি মাহমুদ হোসেন বলেন , উৎপাদন বন্ধ থাকায় মাসে ক্ষতি হচ্ছে ১৩৫ কোটি টাকা । কারণে এএফসিএলের উৎপাদন সাময়িক বন্ধ রয়েছে । তবে দৈনিক ১ হাজার ৩০০ টন ক্ষমতার কারখানাটি শিগগির আবার উৎপাদনে আসবে বলে আশা দিয়েছেন ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার ( বাণিজ্য ) আহাম্মেদুর রহমান । কাঁচামাল ফসফরিক অ্যাসিডের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় গত ২৮ জুন থেকে ডিএপিএফসিএল কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে । প্রতিষ্ঠানটির জিএম আলমগীর জলিল জানান , এই কারখানায় গ্যাসের প্রয়োজন নেই । তবে কাঁচামালের অভাবে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে ।

একমাত্র সচল ঘোড়াশাল পলাশ সার কারখানার ( জিপি ) ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার ( বাণিজ্য ) নুরে আলম বলেন , একমাত্র জিপি সার কারখানার উৎপাদন চালু আছে । এখানে ২ হাজার ৮০০ টনের বেশি সার উৎপাদিত হয় । চাহিদা অনুপাতে মজুত কম : কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী , বর্তমানে দেশে ইউরিয়া , ডিএপি , টিএসপি , এমওপির মজুত রবি মৌসুমের চাহিদা অনুপাতে কম রয়েছে । বর্তমানে দেশে ইউরিয়া সারের মজুত রয়েছে ৫ লাখ ৬৮ হাজার টন , তবে আসছে রবি মৌসুমের চাহিদা রয়েছে ১৩ লাখ ২৬ হাজার টন । 

ডিএপির মজুত আছে ৩ লাখ ৫২ হাজার টন , চাহিদা ৯ লাখ ৮৮ হাজার টন । টিএসপির মজুত রয়েছে ৩ লাখ ৬৮ হাজার টন , চাহিদা রয়েছে ৪ লাখ ৪৯ হাজার টন । এ ক্ষেত্রে ঘাটতি ৮১ হাজার টন । এমওপির মজুত রয়েছে ১ লাখ ৮১ হাজার টন , চাহিদা রয়েছে ৫ লাখ ৯৮ হাজার টন । ভালো ফলনের জন্য এই চার ধরনের সারই কৃষকদের জন্য অতি প্রয়োজনীয় । কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে , চলতি মাসেই তিনটি দেশ থেকে আমদানি করা সার দেশে আসবে । ফলে মৌসুমের চাহিদার তুলনায় দেশে বাড়তি সার মজুত থাকবে । 

এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো . আবদুর রহিম জানান , চলতি মৌসুমে রোপা আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৭ লাখ হেক্টর । আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ হেক্টরসহ মোট ৫৯ লাখ হেক্টরে চাষাবাদ হবে । আসছে রবি মৌসুমে সারের চাহিদা বেশি থাকবে । চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে সারের মোট চাহিদা ৬৭ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ টন । এর মধ্যে ইউরিয়ার চাহিদা ২৬ লাখ ২২ হাজার টন , টিএসপি ৭ লাখ ৫০ হাজার টন , ডিএপি ১৪ লাখ ৮৫ হাজার টন এবং এমওপি ৯ লাখ ৫০ হাজার টন । দেশে কোনো সারের সংকট নেই বলে দাবি করেছেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো . সেলিম খান । 

গতকাল বুধবার রাতে তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন , ‘ বর্তমানে দেশে কোনো সারের সংকট নেই । গত বছরের এই সময়ের তুলনায় সারের মজুত যথেষ্ট ভালো আছে । কানাডা , রাশিয়া , মরক্কো থেকে এ মাসের মধ্যে আরও সার আসছে । মৌসুমের আগেই চাহিদার তুলনায় বেশি সার আমাদের মজুত থাকবে । সার ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণের জন্য দেশের ৬৪ জেলায় ৬৪ ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করা হয়েছে । ' বিশেষজ্ঞের পরামর্শ : আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিসিআইসির কারখানাগুলো সচল করে নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন কৃষি অর্থনীতিবিদ ড . জাহাঙ্গীর আলম । 

তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন , ‘ এখন বৈশ্বিক পরিস্থিতি আমদানির অনুকূলে নয় । তাই বিসিআইসির কারখানাগুলো সচল করে নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হবে । আমাদের কারখানা বন্ধ রাখা মানে নিজস্ব উৎপাদন বন্ধ রাখা । অথচ সার আমদানি নিরুৎসাহিত করতেই বিসিআইসি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল । প্রথম দিকে প্রতিষ্ঠানটি চাহিদার ৮০ শতাংশ ইউরিয়া উৎপাদন করত । এখন মাত্র ২০ শতাংশ সার উৎপাদন করতে পারে । ’ কৃষকের উদ্বেগ : : আজকের পত্রিকার রংপুর প্রতিনিধি জানান , পোদ্দারপাড়া গ্রামের কৃষক লাল মিয়া আমন চাষের সার নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন । 

তিনি বলেন , ‘ আমন ধান দ্যাওয়ার ( বৃষ্টির ) পানি দিয়া চাষ হয় । কিন্তু ১৫ দিন আগোত ধান নাগাছি শ্যালোর পানি দিয়া । এখন দ্যাওয়ার পানি নাই । জমি শুকি ফাকরা নাগছে । জমিত সার দিবার সময় আলছে । বাজার ফির সারও নাই । এমওপি দিলে ইউরিয়া নাই , ইউরিয়া দিলে টিএসপি নাই । মহা যন্ত্রণায় আছি । ’ হাড়িয়ারকুঠি ইউনিয়নের সরকারপাড়া গ্রামের কৃষক সাগর মিয়া আক্ষেপ করে বলেন , “ ভাই , ডাঙ্গীরহাট বাজারে দুই দিন সার আনবার যায়া ঘুরি আসছি । ডিলারের কাছে গেলে কয় সার নাই , শেষ হয় গেইছে । খুচরা দোকানে গেলে দাম বেশি চায় । ”