সুন্দরবনের গহিনে জলদস্যু আস্তানা অথবা নগরীতে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে অভিযান পরিচালনায় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) কখনো পিছপা হয়নি। একসময় র্যাবের নাম শুনলেই অপরাধীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ত। তবে র্যাবের কার্যক্রমে অনেকটা স্থবিরতার অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে খুলনা অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, সুন্দরবনে নতুন করে দস্যু বাহিনীর তৎপরতা এবং নগরীর আন্ডারওয়ার্ল্ডে সন্ত্রাসীদের দাপটের মধ্যেও র্যাব-৬-এর বড় ধরনের দৃশ্যমান অভিযান না থাকায় প্রশ্ন উঠছে বাহিনীর সক্ষমতা ও কার্যকারিতা নিয়ে।
সংশ্লিষ্টরা জানায়, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতির প্রভাব ও র্যাব বিলুপ্তির গুঞ্জন বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নিজ বাহিনীতে ফিরতে তারা তোড়জোড় শুরু করেছে। ফলে একসময় খুলনা বিভাগের অপরাধ দমনে যে র্যাব ছিল অন্যতম প্রধান শক্তি সেই বাহিনীর কার্যক্রম এখন অনেকটাই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
র্যাব কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া জেলা ছাড়া বাকি নয় জেলা ও ঢাকা বিভাগের গোপালগঞ্জ জেলার দায়িত্বে রয়েছে র্যাব-৬। এর সদর দপ্তর খুলনার লবণচরায়। পাশাপাশি সুন্দরবনের বনদস্যু নির্মূলের প্রধান দায়িত্বও পালন করে র্যাব-৬। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে তাদের তেমন কোনো অভিযানে অংশ নিতে দেখা যায়নি। এ বিষয়ে কোনো কর্মকর্তা বক্তব্য দিতে রাজি হননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘উপর মহলের নির্দেশনা মেনে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তবে আগের মতো তারা সক্রিয় নন। কারণ পরিস্থিতি ভিন্ন।’ তবে আরেক কর্মকর্তা বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর অধিকাংশ সদস্য নিজ বাহিনীতে ফিরতে চান। তবে এ অবস্থারও পরিবর্তন হয়েছে। বিশেষ করে সরকার গঠনের পর র্যাব সক্রিয় হয়েছে।
জানা গেছে, র্যাবের নিষ্ক্রিয়তায় আবারও সুন্দরবনে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বনদস্যু বাহিনীগুলো। সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করতে ২০১২ সালে সরকার র্যাবকে দায়িত্ব দিয়েছিল। ২০১৬ সাল থেকে ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর পর্যন্ত র্যাবের কাছে সুন্দরবন অঞ্চলের ৩২টি জলদস্যু বাহিনীর ৩২৮ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেছিলেন। তারা ৪৬২টি অস্ত্র ও ২২ হাজার ৫০৪ রাউন্ড গোলাবারুদ জমা দিয়েছিলেন। পরে র্যাবের সফল অভিযানের মধ্য দিয়ে ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর ‘দস্যুমুক্ত সুন্দরবন’ ঘোষণা করা হয়। তবে ৫ আগস্টের পর থেকে সুন্দরবনে কমপক্ষে ১৫টি দস্যু বাহিনীর প্রবেশ ঘটেছে। দস্যু দমনে সরকারের বিশেষ এ বাহিনীর কোনো উদ্যোগ নেই।
দুবলার চর ফিশারম্যান গ্রুপের সভাপতি কামাল আহমেদ বলেন, দস্যুরা বারবার তাদের মোবাইল ফোন নম্বর দিয়ে জিম্মিদের পরিবারের কাছে টাকা দাবি করছে। এসব নম্বর র্যাবের কাছে দেওয়া হয়েছে। তারা দেখছি দেখব বলছেন। র্যাবের তৎপরতা না থাকায় দস্যুরা জেলে অপহরণেরও হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। এতে জেলে-মহাজনরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। ব্যবসা নিয়ে তারা রীতিমতো শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, র্যাবের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিকল্প ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার খুলনা জেলা সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মোমিনুল ইসলাম বলেন, গুম-খুনের সঙ্গে বাহিনীটির কিছু সদস্য সরাসরি জড়িত ছিল। র্যাব এত বেশি সমালোচনায় জড়িয়ে গেছে যে, তাদের অস্তিত্ব এখন বিপুপ্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংস্কার করে বাহিনীকে নতুন করে গড়ে তোলা দরকার। তাহলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটবে। আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে পুলিশকেও সংস্কার, মানবিক ও দক্ষ করে তুলতে হবে।
গণ-অভ্যুত্থানের পর খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটেছে। দুই বছরে শতাধিক খুনের ঘটনা ঘটেছে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রণে ছয় সন্ত্রাসী বাহিনী। এসব বাহিনী সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ। নিয়মিত বিরতিতে এসব বাহিনীর কয়েকজন নিচের পর্যায়ের কর্মীকে গ্রেফতার করতে পারলেও বাহিনীপ্রধানরা অধরা। তারা দূর থেকে আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রযুক্তিগত অসহায়তা অথবা দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার অভাবে পুলিশ কিছুই করতে পারছে না। অথচ অভিজ্ঞতা ও দক্ষতায় এগিয়ে র্যাব। সন্ত্রাসী দমনে তাদের অনেকটাই নিষ্ক্রিয় দেখা যাচ্ছে। প্রযুক্তির সহায়তা ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তারা ছোটখাটো মামলায় ওয়ারেন্টের আসামিদের ধরতে ব্যস্ত। বড় অপরাধীদের ধরতে তাদের কার্যক্রম একেবারে নেই বললেই চলে। এসব বিষয়ে র্যাব-৬ এর কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল নিস্তার আহমেদের সঙ্গে বিস্তারিত কথা হয়। তিনি বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর একটি ক্রুশিয়াল টাইম আমরা পার করেছি। সেসময় বিভিন্ন ধরনের সংকট আমাদের সামনে ছিল। তবে আমরা কখনোই বসেছিলাম না। ছয় মাসে আমরা প্রায় ৫৭০টি অভিযান পরিচালনা করেছি। এসব অভিযানে ৫৭২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি বলেন, র্যাবে জনবলের ঘাটতি আছে। এ নিয়ে সরকারের সঙ্গে কথাবার্তা চলছে। আশা করছি-শিগগিরই সব সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
গুম খুনের পাশাপাশি বিরোধী মত দমনপীড়নেও র্যাবের বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। গুমসংক্রান্ত কমিশনের তথ্য অনুযায়ী-২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত গুমের ৪০০টি অভিযোগের মধ্যে ১৭২টিতে র্যাবের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এছাড়া মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ এবং ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচে’-এর প্রতিবেদনে দেখা যায়-গত এক দশকে র্যাবের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শতাধিক অভিযোগ উঠেছে।
মহামারি করোনা ভাইরাস নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ায় র্যাব-৬ এর হাতে ২০২০ সালের ১৯ মার্চ গ্রেফতার হয়েছিলেন খুলনার ব্যবসায়ী এমএ সাদী। তিনি বলেন, আমাকে তুলে নিয়ে র্যাব-৬ এর প্রধান কার্যালয়ে রেখে অমানুষিক অত্যাচার করা হয়। অন্ধকার রুমে আটকে রেখে তাদের দেওয়া ট্রাউজার পড়িয়ে নানাভাবে নির্যাতন করা হয়। বাংলাদেশে নরেন্দ্র মোদির আগমনের বিরুদ্ধে আমি কেন মিছিল মিটিং করছি? কোনো জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে আছি কি-না। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় আমাকে কারাগারে পাঠানো হয়। যদিও আমার পোস্ট ছিল করোনার বিষয়ে সচেতনতা নিয়ে।
কয়রা উপজেলার ব্যবসায়ী নূর হোসেন অভিযোগ করেন, বনদস্যুসংক্রান্ত বিষয়ে মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে ২০১৮ সালে আমাকে গ্রেফতার করে র্যাব সদস্যরা। তিন দিন আমার ওপর সীমাহীন নির্যাতন চালানো হয়। এখনো আমার শরীরে সেই নির্যাতনের চিহ্ন রয়েছে। কোনো তথ্য না পেয়ে সরি বলে তারা আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে ছেড়ে দেয়। আমি জামিনে মুক্ত হওয়ার পর র্যাবের বিরুদ্ধে মামলা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বিএনপির রাজনীতি করায় আমাকে অনেকে মামলা না করার পরামর্শ দেয়।