দেশে ১২৩ প্রজাতির মশা রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত চারটি প্রজাতি মানুষের মধ্যে বিভিন্ন রোগ ছড়ায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, আইইডিসিআর ও কীটতত্ত্ববিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে এই ছয় রোগের সব কটির প্রকোপ রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে আজ বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব মশা দিবস’। সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রতিবছর ২০ আগস্ট দিবসটি পালন করা হয়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, যেখানে মশা দিবসের মূল লক্ষ্য কমিউনিটিকে সচেতন ও সম্পৃক্ত করা, সেখানে রাষ্ট্র জনগণকে এই কার্যক্রমে যুক্ত করতে পুরোপুরি ব্যর্থ।
ডেঙ্গুর ভয়াবহতা চরমে : মশাবাহিত রোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ও মৃত্যু ডেঙ্গুতে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে দেশে প্রথম বড় আকারে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। ওই বছর হাসপাতালে ভর্তি হয় পাঁচ হাজার ৫৫১ জন।
গত এক দশকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে প্রায় সাড়ে সাত লাখ মানুষ। এ সময় মৃত্যু হয়েছে তিন হাজার ২৩৬ জনের। এর মধ্যে শুধু গত তিন বছরে মারা গেছে দুই হাজার ৬৯৩ জন, মোট মৃত্যুর প্রায় ৭৭ শতাংশ।
আট বছরেও বদলায়নি ম্যালেরিয়ার চিত্র : নিয়ন্ত্রণহীন আরেক মশাবাহিত রোগ ম্যালেরিয়া। গত আট বছরে রোগীর সংখ্যা, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী, সংক্রমিত এলাকা ও প্রধান চ্যালেঞ্জের চিত্রে বড় পরিবর্তন আসেনি। বরং রোগের বাহক অ্যানোফিলিস মশার জিনগত পরিবর্তন এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণ বৃদ্ধির মতো নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা ম্যালেরিয়া রোগের জীবাণু ছড়ায়। জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ৪৬০ জন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। এ সময় কারো মৃত্যু হয়নি। গত ১৫ বছরে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে সাড়ে চার লাখের বেশি মানুষ। মৃত্যু হয়েছে দুই শতাধিক মানুষের।
ম্যালেরিয়াপ্রবণ তিন জেলা বান্দরবান, রাঙামাটি ও কক্সবাজারে মোট রোগীর ৯৩.৩২ শতাংশ। এর বাইরে খাগড়াছড়ি ও চট্টগ্রামেও সংক্রমণ বেশি। জুমচাষি, কাঠুরিয়া, কয়লা শ্রমিক ও সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠী বেশি ঝুঁকিতে।
নতুন আতঙ্ক চিকুনগুনিয়া : দেশে গত বছর নতুন করে চিকুনগুনিয়া শনাক্ত হয়। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. আহমেদ নওশের আলম কালের কণ্ঠকে জানান, গত বছর দেড় শতাধিক চিকুনগুনিয়ার রোগী শনাক্ত হয়েছিল। আক্রান্তদের সবাই ঢাকার বাসিন্দা। এ বছর এখনো শনাক্ত হয়নি।
দেশে ২০০৮ সালে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রথম চিকুনগুনিয়া শনাক্ত হয়। তবে ২০১৭ সালে সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। ওই বছর প্রায় ১৪ হাজার মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয়।
সরকারি পর্যায়ে শুধু ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টার, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল ও আইইডিসিআরের বাইরে কোথাও রোগটি পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই। সারা দেশে পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে প্রায় আট বছর।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার লাইন ডিরেক্টর ডা. মো. হালিমুর রশিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার জানা মতে, ২০১৭ সালের পর কেন্দ্রীয়ভাবে হাসপাতালগুলোর জন্য চিকুনগুনিয়া পরীক্ষার কিট কেনা হয়নি। আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছেও বাজেট নেই।’
জাপানিজ এনসেফালাইটিস : বাংলাদেশে এটি প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৭৭ সালে, ময়মনসিংহ অঞ্চলে। তখন অনেক মানুষ আক্রান্ত হলেও সঠিকভাবে কতজন আক্রান্ত, কতজন সুস্থ এবং কতজনের মৃত্যু হয়েছে, তা জানা যায়নি।
২০০৩-২০০৫ সালে বাংলাদেশের চারটি হাসপাতালে পরিচালিত এক গবেষণায় ৪৯২ জন এনসেফালাইটিস রোগীর মধ্যে ২০ জনের জাপানিজ এনসেফালাইটিস নিশ্চিত হয় এবং তাদের মধ্যে দুজন মারা যায়।
২০০৭-২০১৬ সালের বড় হাসপাতালভিত্তিক নজরদারিতে ছয় হাজার ৫২৫ জন মেনিনজাইটিস/এনসেফালাইটিস রোগীর মধ্যে ৫৪৮ জনের জাপানিজ এনসেফালাইটিস শনাক্ত হয়। এই গবেষণায় মৃত্যুর মোট সংখ্যা আলাদা করে উল্লেখ করা হয়নি।
নির্মূল ফাইলেরিয়া ফিরছে : ২০০১ সালের জরিপে ৬৪ জেলার মধ্যে ১৯টিতে রক্তে মাইক্রোফাইলেরিয়ার উপস্থিতির হার ২ শতাংশের বেশি পাওয়া যায়। ২০১৫ সালে গণ-ঔষধ সেবন কর্মসূচি বন্ধ করা হয়। এরপর সংক্রমণ বন্ধ হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ে শুরু হয় ট্রান্সমিশন অ্যাসেসমেন্ট সার্ভে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশকে ফাইলেরিয়া নির্মূলকারী দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
সম্প্রতি এ রোগটি আবার ফিরে এসেছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ফাইলেরিয়া নির্মূল নিয়ে কাজ করছেন ডা. জুবায়ের। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ঠাকুরগাঁও ও দিনাজপুরের মতো উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে এখনো ফাইলেরিয়া আক্রান্ত রোগী পাওয়া যাচ্ছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, অপারেশন প্ল্যান বন্ধ হওয়ার পর থেকে বর্তমানে সব ধরনের সরকারি কার্যক্রম পুরোপুরি স্থবির। অথচ পুরনো হিসাব মতেই রোগীর সংখ্যা ছিল ৪৩ হাজারেরও বেশি, যা বর্তমানে আরো বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে।
জিকার তথ্যই নেই : এডিস মশাবাহিত জিকা রোগ দেশে প্রথম শনাক্ত হয় ২০১৪ সালে। আইইডিসিআর সংরক্ষিত রক্তের নমুনা পরীক্ষায় তা জানা যায়। জিকায় আক্রান্ত ওই রোগী ছিলেন চট্টগ্রামের। ২০১৭ সালে আইইডিসিআরের একটি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধের মাধ্যমে বিষয়টি প্রথম জানা যায়।
সর্বশেষ গত বছর চট্টগ্রাম জেলায় দুজনের শরীরে জিকা ভাইরাস শনাক্ত হয়। আইইডিসিআর জানিয়েছে, জিকার কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। আইইডিসিআর ও আইসিডিডিআরবির গবেষকরা জানিয়েছেন গত তিন বছর অন্তত ১০ জনের রোগটি শনাক্ত হয়েছে।
কেন ব্যর্থ মশা নিধন কার্যক্রম : বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ব্যর্থতার মূল কারণ চারটি। এক. কোটি কোটি টাকা খরচের পর কাজের ফলাফল যাচাইয়ের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। নেই কোনো মানদণ্ড বা স্বাধীন মূল্যায়ন প্রক্রিয়া।
দুই. দক্ষ জনবলের সংকট। ১২টি সিটি করপোরেশনের মধ্যে কেবল ঢাকা উত্তরে একজন কীটতত্ত্ববিদ আছেন। সারা দেশে ৩৩টি অনুমোদিত পদের ১৮টিই খালি। তিন. জরিপের ঘাটতি। গত দেড় বছরে কোনো জাতীয় এডিস জরিপ হয়নি। ফলে মশার ঘনত্ব বা ঝুঁকির জায়গাগুলো সম্পর্কে না জেনেই চালানো হচ্ছে নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম। চার. জলবায়ু পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। অর্থাৎ তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের ফলে মশার প্রজননক্ষেত্র বিস্তৃতি হচ্ছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে, কিন্তু কেন এই পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, তার কোনো বিশ্লেষণ নেই। মাঠ পর্যায়ে কাজ হয়ে থাকলে তার ফলাফল কোথায়? কত শতাংশ মশা কমেছে, কোন এলাকায় উন্নতি হয়েছে, তার কোনো তথ্য নেই। তিনি মনে করেন, মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের মূল্যায়ন স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হওয়া উচিত।