Image description

দুনিয়া কাঁপানো গণ-অভ্যুত্থান এবং এর পরে সুষ্ঠু একটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় এলে দেশে শান্তি ফিরে আসবে-এমনটিই প্রত্যাশা ছিল দেশের মানুষের। কিন্তু কোথায় এবং কী কারণে যেন জনমনে সেই স্বস্তি পুরোপুরি আসেনি। বরং ক্ষমতাচ্যুত ও পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা এবং এর পরে নানা ঘটনাপ্রবাহকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। নতুন করে জল্পনা-কল্পনা ও গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে।

আরও জানা যাচ্ছে, এই গুঞ্জনের প্রভাব কেবল রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং প্রশাসনসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলেও দেখা দিয়েছে নানা কৌতূহল। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফরে যাচ্ছেন কি না-এমন প্রশ্নকেও একই সূত্রে গাঁথা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা, ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বক্তব্য দিতে তাকে নিবৃত্ত না করা এবং দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি-সবকিছুই পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। কারও কারও মতে, দেশে বিরাজমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটকে পুঁজি করেও বর্তমান সরকারকে বহুমুখী চাপে ফেলার অদৃশ্য একটি কৌশলেরও যোগসূত্র রয়েছে এই পরিস্থিতির সঙ্গে। পর্যবেক্ষকদের কারও কারও মতে, দেশের ভেতর ও বাইরের প্রভাবশালী নানা মহল এই সংকটকে কেন্দ্র করে সরকারের বিরুদ্ধে জন-অসন্তোষ উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তারা বলছেন, সরকার সতর্ক না হলে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি করে ‘ঘোলা পানিতে মাছ শিকার’ করতে পারে সরকারবিরোধীরা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশের মতে, সরকারের গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস করে বিরোধী শক্তিগুলোর মধ্যে বিভেদ তৈরি করতেই নানা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এই পুরো পরিস্থিতি সরকারের নীতিনির্ধারক ও প্রশাসনিক মহল কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে, তা নিয়ে এখনো নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।

তবে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য রুহুল কবির রিজভী আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলছেন, কেউ অস্থিরতা সৃষ্টি কিংবা ষড়যন্ত্রের চেষ্টা করলে জনগণই তার উপযুক্ত জবাব দেবে। যুগান্তরকে তিনি বলেন, সরকার তো শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফেরত আনতে চায়। তিনি তো বাংলাদেশের একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, সরকার সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, জুলাই-আগস্টে ঘটে যাওয়া নারকীয় হত্যাকাণ্ডের জন্য হাসিনাকে বিচারের মুখোমুখি হতেই হবে। ইতোমধ্যে কয়েকটি মামলার বিচারকাজ সম্পন্ন এবং তার সাজা ঘোষণা করা হয়েছে।

১০ জুলাই এক সাক্ষাৎকারে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের ঘোষণা দিয়েছেন। এরপর ৫ আগস্টও তিনি একই ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে নির্বাসনে থাকা দলীয় নেতাদেরও তার সঙ্গে দেশে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে সংসদের বিরোধী দল ক্রমাগত রাজপথ সরগরম করে রাখছে। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটও সরকারের বিরুদ্ধে সক্রিয়। এছাড়া শেখ হাসিনার ঘোষণার পর ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্টসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগ এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ঝটিকা মিছিল ও স্লোগান দিয়েছেন। দেশের বেশ কয়েকটি জায়গা থেকে বোমা বা বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে নানা হিসাব মেলানো হচ্ছে।

তারেক রহমান ভারত সফরে গেলে কী হবে, সেই হিসাব মেলানোর পাশাপাশি না গেলে কী হবে, তা নিয়ে নানা মত দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। অন্যদিকে, এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের কিছু পেশাজীবী ও সুবিধাভোগী ফেসবুক, ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা অপতথ্য ছড়াচ্ছেন। দেশ ও বিদেশ থেকে বেছে বেছে তারা এমন সব ব্যক্তি ও নেতাকে নিয়ে টকশো করছেন, যারা বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে ন্যারেটিভ তৈরি করছেন। ভারতের পক্ষে বয়ান তৈরি করার পাশাপাশি ‘দেশের পরিস্থিতি বর্তমানে ভয়ানকভাবে খারাপ’-এমন ধারণা জনমনে তৈরির চেষ্টা করছেন তারা। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে তারা ধারণা তৈরির চেষ্টা করছেন যে, আগের হাসিনা সরকারই যেন ভালো ছিল!

আলোচনা আছে, শেখ হাসিনা নিজেই এসব তথ্য শেয়ার করার জন্য নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন। এর মূল উদ্দেশ্য হলো-সরকারের বিরুদ্ধে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি করা। একই সঙ্গে দেশের কয়েকটি স্থানে আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল ও ধানমন্ডি ৩২ নম্বরকেন্দ্রিক বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনাবলি রাজনৈতিক মাঠে নতুন আলোচনা ছড়িয়েছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, সরকারের জনপ্রিয়তা কমিয়ে এবং বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সরকারের দূরত্ব তৈরি করে শেখ হাসিনার ফেরার পথ সুগম করার একটি পরিকল্পনা চলছে। এজন্য দেশি-বিদেশি নানা শক্তি ব্যাপকভাবে তৎপর। এগুলো প্রতিরোধে সরকারের ভূমিকা এখনো জনমনে স্পষ্ট নয়।

আলোচনা আছে, দেশে অব্যাহত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে জনগণের দুর্ভোগের বিষয়টিও সরকারবিরোধীরা নানাভাবে সামনে আনছেন। অনেকের মতে, এমন পরিস্থিতি সরকারের ভাবমূর্তির জন্য কিছুটা হলেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সরকারবিরোধী প্রচারণার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি; যারা বিএনপিকে ক্ষমতায় দেখতে চায় না। কারও কারও ধারণা, এসব পরিস্থিতির কারণে পুলিশ ও সিভিল প্রশাসন পুরোপুরি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। বরং অনেক ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তারা পদক্ষেপ নিচ্ছে। এ কারণে সরকারের কাজকর্মে গতিশীলতা দৃশ্যমান হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ অবশ্য মনে করেন, সরকার পরিবর্তন হয় নির্বাচনের মাধ্যমে। তিনি বলেন, পাঁচ বছর পর আবার নির্বাচন হবে; মানুষের মানসিক প্রস্তুতি তেমনই থাকা উচিত। এখন সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম হতেই পারে। তা যৌক্তিক হলে জনগণ গ্রহণ করবে, আর অযৌক্তিক হলে প্রত্যাখ্যান করবে। বিষয়গুলো মূলত সরকারের পারফরম্যান্সের ওপর নির্ভর করে, এগুলোকে আমি ষড়যন্ত্র মনে করি না।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ যুগান্তরকে বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে তৃতীয় পক্ষ আসতে পারে-এমন জুজুর ভয় দেখিয়ে সরকার তার ব্যর্থতা ঢাকতে পারবে না। তৃতীয় পক্ষ বলতে যাদের বোঝানো হচ্ছে, তারাই বিএনপিকে ক্ষমতায় এনেছে। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ যদি বিএনপি তাদের রাজনীতিতে পুনর্বাসন করতে চায়, জনগণ সেটা মেনে নেবে না। সেক্ষেত্রে ওই কথিত তৃতীয় পক্ষের যে পরিণতি হয়েছে, তাদের পরিণতিও তাই হবে। ১৪শ নিরস্ত্র মানুষের খুনি, হাজার হাজার মানুষকে যারা আহত ও পঙ্গু করেছে, তারা রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ, আইনগতভাবেও নিষিদ্ধ হবে। সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের আর রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, বিরোধী দল জনগণের দাবি নিয়ে নিয়মতান্ত্রিকভাবে আন্দোলন করছে। এর মধ্যে আমরা অস্থিরতার কিছু দেখি না। জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেট অনুসারে তারা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করেনি। জনগণের সঙ্গে এভাবে প্রতারণা করলে জনগণ তো রাজপথে নামবেই। তেল, গ্যাস, বিদ্যুতের সংকট, দাম বৃদ্ধি, ভূতুড়ে বিদ্যুৎ বিল, আইনশৃঙ্খলার অবনতির মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সরকার আমাদের পরামর্শ মানছে না। আমরা সরকারকে সহযোগিতা করতে চাই। এজন্য সুনির্দিষ্ট, সুলিখিত পরামর্শ দিয়েছি। সেগুলো মানলে সংকট নিরসনের পথ উন্মুক্ত হতো। কিন্তু সরকার বাঁকা পথে হেঁটে জনদুর্ভোগ বাড়িয়ে তুলছে এবং ফ্যাসিস্টের মতো আচরণ করছে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম-আহ্বায়ক মনিরা শারমিন যুগান্তরকে বলেন, বিভিন্ন মাধ্যমে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসার বার্তা দিয়ে অস্থিরতা করতে চাইলেও সম্ভব হবে না। আমি মনে করি, এ মুহূর্তে বাংলাদেশে ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলগুলোসহ সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে এক ধরনের রাজনৈতিক ঐক্য রয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলের জায়গা থেকে আমরা সরকারের অনেক সমালোচনা করি। তবে সরকারের এই পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে যে একটা স্পষ্টবাদিতা এবং দুইটা বোল্ড স্টেটমেন্ট আমরা ৫ আগস্টের পরে দেখলাম-এই জায়গায় কিন্তু এটা আমরা প্রশংসাই করেছি। তিনি বলেন, সব সময়ই দেখেছি আওয়ামী লীগের ভারতমুখিতা; আমার আর সেটি চাই না। যদি ভারত ইস্যুতে সরকারের নমনীয়তা দেখি, সেক্ষেত্রেও আমরা সরকারের বিরোধিতা করব।