Image description

গাজীপুরের বাসিন্দা ১৯ বছর বয়সি সেতু বর্মণের উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার সময় বিয়ে হয় বিশ্বনাথ চন্দ্র মালোর সঙ্গে। বিয়ের ৪০ দিনের মাথায় ২০১৭ সালের ১১ আগস্ট সূত্রাপুরের শ্বশুরবাড়ি থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি আত্মহত্যা হিসেবে বিবেচিত হয় এবং সূত্রাপুর থানায় অপমৃত্যু মামলা হয়। প্রায় এক বছর পর ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে তাঁকে শ্বাসরোধে হত্যার কথা উঠে আসে। এরপর স্বামী বিশ্বনাথ চন্দ্র মালোকে আসামি করে হত্যা মামলা হয় এবং তাঁকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেয় পুলিশ। কিন্তু পুলিশ হত্যা সংশ্লিষ্ট কোনো তথ্য খুঁজে পায় না। তদন্তে জানা যায়, ময়নাতদন্তে জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মহত্যার ঘটনাটি হয়ে যায় হত্যা।

সেতুর বাবা ক্ষিতীশ চন্দ্র বর্মণ জানান, রাতে ফোন করে তাঁকে জানানো হয়, তাঁর মেয়ে সূত্রাপুরে স্বামীর বাসায় আত্মহত্যা করেছেন। পরে তিনি স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের মর্গে মেয়ের লাশ দেখতে পান।

দীর্ঘ তদন্ত শেষে এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সূত্রাপুর থানার তৎকালীন এসআই শহিদুল ইসলাম ২০২১ সালের ২ জানুয়ারি তথ্যগত ভুল দেখিয়ে মামলাটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেন। আদালত তা ওই বছরের ২৮ ডিসেম্বর গ্রহণ করে। তিনি বর্তমানে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশে কর্মরত।

এসআই শহিদুল ইসলাম বলেন, ১৬৪ ধারার জবানবন্দি এবং পারিপার্শ্বিক তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। এরপর পিবিআই তদন্ত করেছে। তারাও চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে। আর ময়নাতদন্তে যে হত্যা ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে তা ভুলে হতে পারে। 

শুধু এ ঘটনাটি নয়, ময়নাতদন্ত রিপোর্টের কারণে হত্যার ঘটনাও আত্মহত্যা হয়ে যাওয়ার তথ্যও পাওয়া যায়। কোনো কোনো লাশের সুরতহাল প্রতিবেদনে স্পষ্ট আঘাতের কথা উল্লেখ ছিল। কোথাও ঘটনার পারিপার্শ্বিকতার মধ্যেই ছিল খুনের স্পষ্ট ইঙ্গিত। কিন্তু তদন্তকারী কর্মকর্তারা এসব কিছুই আমলে নেননি। শুধু ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছিলেন। অথচ পরে জানা যায়, লাশের ময়নাতদন্তই ভুল ছিল। আগে যে ঘটনাগুলোকে আত্মহত্যা বলা হয়েছিল, আদতে তা ছিল খুন।

২০১৮ সালে খুনের এ রকম ১০টি ঘটনার কথা উল্লেখ করে পুলিশ সদর দপ্তরে একটি প্রতিবেদন দেয় তদন্ত সংস্থা পিবিআই।

জানা যায়, পুরান ঢাকার চকবাজারের একটি বাসা থেকে ২০১০ সালের ২৩ জুন আনিসুর রহমান নামে এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে চিকিৎসক মতামত দেন, আনিস আত্মহত্যা করেছেন। একাধারে থানা-পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও সিআইডি তদন্ত শেষে একই মতামত দেয়। কিন্তু মামলার বাদী আনিসের ভাই জাহাঙ্গীর মিয়া তৃতীয়বারের মতো নারাজি দিলে আদালত পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেন। পাঁচ বছর পর তদন্তে বেরিয়ে আসে প্রেমের সম্পর্কের জেরে আনিসুর রহমান খুন হয়েছিলেন।

এ ঘটনায় অভিযুক্ত দুই আসামি গ্রেপ্তারের পর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন। ২০১৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরে শ্বশুরবাড়িতে তিন সন্তানের জননী নিলুফা আখতার বাখারাকে (২৫) শ্বাসরোধে হত্যা করেন তাঁর দেবর। নিলুফারের ময়নাতদন্ত এবং ভিসেরা ও হিস্টোপ্যাথলজিক্যাল প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের এক চিকিৎসক মতামত দেন, তিনি আত্মহত্যা করেছেন। পুলিশ ও সিআইডিও তাঁদের তদন্তে আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করে। পরে পিবিআইর তদন্তে আসে ধর্ষণ করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে নিলুফারের দেবর তাঁকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের সাবেক উপাধ্যক্ষ ও ফরেনসিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট যেকোনো কারণে ভুল হতেই পারে। এটিকে শতভাগ সঠিক হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। ওই রিপোর্টে ডাক্তার তাঁর মতামত দিয়ে থাকেন। সেই মত শতভাগ সঠিক হবে এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ময়নাতদন্তে দক্ষতা ও প্রযুক্তির সংকটের কারণে অনেক সময় সঠিক তথ্য উঠে আসে না। তবে প্রভাবশালী মহলের চাপ ও টাকার কাছে নতিস্বীকার করেও অনেক সময় মিথ্যা প্রতিবেদন দেওয়া হয়।

খোঁজখবর নিয়ে জানা যায়, ময়নাতদন্ত করার জন্য চিকিৎসকদের আলাদা কোনো পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না। ফরেনসিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞদের ব্যক্তিগত রোগী দেখার সুযোগ কম। ফলে অনেক চিকিৎসক এই কাজে আগ্রহ দেখান না। মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, ময়নাতদন্তে ভুল তথ্য কখনোই কাক্সিক্ষত নয়। এ বিষয়গুলোতে আরও সতর্ক হওয়া উচিত। আধুনিকায়ন করা দরকার এবং ডিজিটাল ইক্যুইপমেন্ট ব্যবহার করা উচিত। যেন একজন বিচারপ্রার্থী কোনোভাবেই বঞ্চিত না হন।