Image description
পোশাক খাত নিয়ে সিপিডির সংলাপ

‘বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে কার্বননির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে সবুজ প্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় জরুরি সমন্বিত উদ্যোগ এবং ছোট ও মাঝারি কারখানার জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’

গতকাল রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘পোশাক খাতে শিল্প কার্বন নিঃসরণ হ্রাস : কীভাবে একে এগিয়ে নেওয়া যায়?’ শীর্ষক এক সংলাপে ব্যবসায়ী নেতা, অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা এ কথা বলেন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এ সংলাপের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা সহকারী সামি মোহাম্মদ।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সিপিডি দেশের ৩৫০টি তৈরি পোশাক কারখানা থেকে উৎপাদন ও জ্বালানি ব্যবহারের তথ্য সংগ্রহ করেছে। কাটিং, সেলাই, এমব্রয়ডারি, ফিনিশিং, প্রিন্টিং, ওয়াশিং, ডাইং ও প্যাকিং-আটটি উৎপাদন বিভাগে ৬৫ ধরনের যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করা হয়েছে। সংলাপ সম্পর্কে সামি মোহাম্মদ বলেন, ছোট কারখানাগুলোতে পুরোনো যন্ত্রপাতি ও সীমিত আর্থিক সক্ষমতার কারণে দক্ষতার ঘাটতি বেশি। এসব কারখানার জন্য মিশ্র অর্থায়ন ও সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা সম্প্রসারণের সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি ওয়াশিং ও ডাইংয়ের মতো বেশি শক্তিনির্ভর প্রক্রিয়ায় জরুরি মনোযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এসব প্রক্রিয়ায় গ্যাসভিত্তিক তাপশক্তির প্রয়োজন হওয়ায় সব ক্ষেত্রে সৌরশক্তি দিয়ে তা প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং অদক্ষ যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে কারখানাগুলো জ্বালানি ব্যয় কমানোর পাশাপাশি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে পারে। বিশেষ করে সোলার বিদ্যুৎ খরচ কমানোর পাশাপাশি এলএনজি ও অন্যান্য জ্বালানির দামের ওঠানামার ঝুঁকি কমাতে পারে। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ)  সহসভাপতি ব্যারিস্টার বিদিয়া অমৃত খান বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম (সিবিএএম) রপ্তানিকারকদের কার্বন নিঃসরণ কমাতে উৎসাহিত করার পাশাপাশি কার্বননির্ভর উৎপাদনকে নিরুৎসাহিত করবে।

শুরুতে সিমেন্ট, সার ও ইস্পাতসহ ছয়টি পণ্যের ক্ষেত্রে এটি কার্যকরের কথা থাকলেও ভবিষ্যতে পোশাকও এর আওতায় আসতে পারে। এতে বাংলাদেশের পোশাকের ওপর শুল্ক বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে ইউরোপে বাংলাদেশের পোশাকের চাহিদা ও বিনিয়োগ-দুটিই কমতে পারে। একই সঙ্গে চলমান জ্বালানিসংকট দ্রুত সমাধান না হলে দেশের পোশাক খাতের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

 বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশের মতো দেশে আগামী দিনে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ছাড়া বিকল্প নেই। একটি এফএসআরইউতে (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল) আগুন লাগার ঘটনায় পুরো দেশ সংকটে পড়েছে। জ্বালানিনিরাপত্তার জন্য সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। বাজেটে সৌরপণ্য থেকে ভ্যাট-ট্যাক্স প্রত্যাহারের কথা বলা হলেও বাস্তবে এখনো প্রায় ৫০ শতাংশ কর রয়েছে। পোশাক খাতকে কার্বনমুক্ত করার লক্ষ্য থাকলে সৌরবিদ্যুতের ওপর করের বাধা দূর করতে হবে।

এথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভ (ইটিআই) বাংলাদেশের প্রোগ্রাম এভিডেন্স অ্যান্ড লার্নিং পরিচালক শামিম মুনির উদ্দিন বলেন, পোশাকশিল্পে অটোমেশন এখন বাস্তবতা। তবে অটোমেশনের ফলে জ্বালানি ব্যবহারে কী ধরনের প্রভাব পড়ছে, তা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। বর্তমানে শিল্পের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন উৎপাদন কার্যক্রম অব্যাহত রাখা। এ সংকট শুধু ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম বলেন, একদিকে সবুজ কারখানার জন্য আলোচনা হচ্ছে, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় জায়গায় নীতিনির্ধারকদের বাধা দূর হচ্ছে না। নতুন শিল্পেও প্রযুক্তির ব্যবহার প্রত্যাশিত মাত্রায় দেখা যাচ্ছে না।

ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ইডকল) সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট আসিফ শাহরিয়ার বলেন, ছোট কারখানাগুলোকে একত্রিত বা সমন্বিতভাবে সহায়তা করা না গেলে ডিকার্বনাইজেশনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি থেকে যাবে।