আয় বাড়ছে, কিন্তু সেই বাড়তি আয় দিয়ে আগের মতো পণ্য ও সেবা কেনা যাচ্ছে না। কয়েক বছর ধরে মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে নিচে থাকায় বাস্তবে শ্রমজীবী মানুষের আয় কমেছে। কাগজে-কলমে মজুরি কিছুটা বাড়লেও খাবার, চিকিৎসা, বাসস্থান ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যে হারে বেড়েছে, তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি মানুষের আয়। ফলে কমেছে কোটি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত টানা পাঁচ অর্থবছরই গড় মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার কম ছিল। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মজুরি বেড়েছে ৮ দশমিক ১১ শতাংশ। বিপরীতে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ। অর্থাৎ মজুরি বৃদ্ধির তুলনায় মূল্যস্ফীতি ছিল ০ দশমিক ৫৭ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি। এর আগের অর্থবছরগুলোতেও ব্যবধান ছিল আরও বড়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ০৩ শতাংশ, আর মজুরি বেড়েছিল ৮ দশমিক ১০ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশের বিপরীতে মজুরি বেড়েছিল ৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ০২ শতাংশ, আর মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ০৪ শতাংশ।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাইয়ে অবশ্য ব্যবধান কিছুটা কমেছে। ওই মাসে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২২ শতাংশ, আর ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। ব্যবধান নেমে এসেছে ০ দশমিক ১০ শতাংশীয় পয়েন্টে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার চাপ এক মাসের পরিসংখ্যানে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়।
মূল্যস্ফীতি ও মজুরি বৃদ্ধির এ ব্যবধান সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি করছে নিম্ন ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের ওপর। কারণ তাদের আয়ের বড় অংশই খাবার, বাসাভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা ও অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে ব্যয় হয়ে যায়। ফলে পণ্যের দাম আয়ের চেয়ে দ্রুত বাড়লে সঞ্চয় তো দূরের কথা, প্রয়োজনীয় খরচেও কাটছাঁট করতে হয়।
রাজধানীর নতুন বাজার এলাকায় রিকশা চালান মাসুদুর রহমান। প্রতিদিন আনুমানিক ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা আয় করেন তিনি। এর প্রায় এক-চতুর্থাংশ রিকশার মালিককে ভাড়া হিসেবে দিতে হয়। বাকি অর্থ দিয়ে খাবার, বাসস্থান ও অন্যান্য খরচ চালাতে হয় তাকে। এর আগে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন মাসুদ। বেশি আয়ের আশায় রিকশা চালানো শুরু করলেও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় স্বস্তি ফেরেনি। নির্মাণ শ্রমিক নজরুল ইসলামের অভিজ্ঞতাও একই। প্রতিদিন ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা আয় করেন তিনি। পরিবারের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতেই প্রায় পুরো আয় শেষ হয়ে যায়। মাসুদ ও নজরুলের এই বাস্তবতা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়।
দেশে মোট শ্রমশক্তি প্রায় ৬ কোটি ৯১ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ৮৪ শতাংশ বা ৫ কোটি ৮০ লাখ মানুষ অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে নিয়োজিত, যাদের সবারই চিত্র অনেকটা একই। তাদের বড় অংশ দৈনিক বা অনিয়মিত মজুরিতে কাজ করেন। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে মজুরি সমন্বয়ের কোনো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা না থাকায় বাজারে পণ্যের দাম বাড়লেও তাদের আয় কখন বাড়বে, তা নির্ভর করে শ্রমের চাহিদা ও নিয়োগকর্তার সিদ্ধান্তের ওপর। বিবিএসের মজুরি হার সূচকে কৃষি, শিল্প ও সেবাসহ ৬৩টি পেশায় অনানুষ্ঠানিক দৈনিক শ্রমিকদের মজুরি পর্যবেক্ষণ করা হয়।
ফলে এ সূচক দেশের বড় একটি অংশের শ্রমজীবী মানুষের আয় পরিস্থিতি বোঝার গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এম মাসরুর রিয়াজ গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বছরের পর বছর মূল্যস্ফীতির হার মজুরি বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে গেলে শ্রমিকদের প্রকৃত আয় কমে যায়। আর প্রকৃত আয় কমার অর্থ হলো প্রকৃত ভোগও কমে যাওয়া। এর ফলে শ্রমিকদের পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার ও স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় কমাতে হয়, যা জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের পথে বড় বাধা।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশের ৪৭টি শিল্প খাত নিজেদের প্রয়োজন ও কাঠামো অনুযায়ী মজুরি নির্ধারণ করে এবং বিভিন্ন সময়ে তা সংশোধন করে। তবে অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য এ ধরনের ব্যবস্থা নেই। এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য মজুরি সমন্বয়ের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। এমনকি ন্যূনতম মজুরি পাওয়া শ্রমিকদেরও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি পুনর্নির্ধারণ না হলে ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।