Image description

বিনিয়োগকারীদের আমানত পেশাদার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিরাপদ ও লাভজনক খাতে খাটানোর কথা মিউচুয়াল ফান্ডের। তবে দেশে গত পাঁচ বছরে এ খাতে একের পর এক বড় ধরনের অনিয়ম ও জালিয়াতির ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। কোথাও ফান্ডের পুরো অর্থ হাওয়া হয়ে গেছে, কোথাও ভুয়া নথিপত্রে বিনিয়োগ দেখানো হয়েছে। আবার বাজারমূল্যের চেয়ে অস্বাভাবিক বেশি দামে দুর্বল ও প্রায় অকার্যকর কোম্পানিতে ফান্ড খাটানোরও অভিযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বিভিন্ন তদন্ত, মামলা ও প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের নথি পর্যালোচনা করে ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পাঁচটি বড় ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় মোট ৫৮৮ কোটি ৬৯ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে।

এর মধ্যে ইউনিভার্সাল ফাইন্যান্সিয়াল সলিউশনস (ইউএফএস) ও অ্যালায়েন্স ক্যাপিটালের বিরুদ্ধেই ২৮০ কোটি ৭ লাখ টাকা আত্মসাতের সরাসরি অভিযোগ রয়েছে। রেস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ছয়টি ফান্ডে সম্ভাব্য ক্ষতি ধরা হয়েছে প্রায় ২১৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এলআর গ্লোবালের ছয়টি ফান্ডের ৬৮ কোটি ৬৪ লাখ টাকা বিতর্কিত বিনিয়োগে খাটানোর প্রমাণ মিলেছে। অন্যদিকে, ভ্যানগার্ড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টকে দুটি বেআইনি বিনিয়োগের বিপরীতে ২০ কোটি ৫৯ লাখ টাকা সংশ্লিষ্ট ফান্ডে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বিএসইসি।

ইউএফএসে ২৩৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ: মিউচুয়াল ফান্ড খাতে সবচেয়ে বড় অনিয়মের ঘটনাটি ঘটায় ইউনিভার্সাল ফাইন্যান্সিয়াল সলিউশনস লিমিটেড (ইউএফএস)। ২০২২ সালের জুনে বিএসইসি ইউএফএসের ব্যবস্থাপনাধীন পাঁচটি ফান্ডের অনিয়ম খতিয়ে দেখতে পরিদর্শন দল গঠন করে। তদন্ত চলাকালে ২০২২ সালের ২১ আগস্ট ইউএফএস কর্তৃপক্ষ নিজেরাই ১০৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকার ঘাটতি স্বীকার করে অর্থ ফেরতের প্রতিশ্রুতি দেয়; যদিও তা আর ফেরেনি।

২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি বিএসইসির জমা দেওয়া চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, ইউএফএস-বাংলাদেশ এশিয়া ইউনিট ফান্ড, ইউএফএস-আইবিবিএল শরিয়াহ ইউনিট ফান্ড, ইউএফএস-পদ্মা লাইফ ইসলামিক ইউনিট ফান্ড ও ইউএফএস-পপুলার লাইফ ইউনিট ফান্ড— এই চার ফান্ড থেকে মোট ২৩৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৭০ কোটি ৬৯ লাখ টাকা সরিয়ে নিয়ে বিদেশে পাচার করা হয়।

তদন্ত মতে, ভুয়া কমার্শিয়াল পেপারে ৫৮ কোটি ৯০ লাখ, ভুয়া এফডিআর ও এমটিডিআরে ৪৭ কোটি ৯২ লাখ এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার বিক্রির ৬৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়। এসব অনিয়মে ব্যবহার করা হয় ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট, এফডিআর ও বিনিয়োগ-সংক্রান্ত জাল নথিপত্র।

এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের ব্যাংক হিসাব স্থগিত, বিশেষ অডিট ও দুদকের মাধ্যমে একাধিক মামলা করা হয়েছে। তবে আত্মসাৎকৃত অর্থ এখনো উদ্ধার সম্ভব হয়নি। ফান্ডের ট্রাস্টি ও কাস্টডিয়ান সংস্থা আইসিবি জানায়, মামলা ও বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের পরও কোনো টাকা ফেরত আনা যায়নি।

অ্যালায়েন্স ক্যাপিটালে ৪৫ কোটি টাকা সরানোর অভিযোগ: অ্যালায়েন্স ক্যাপিটাল অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থাপনায় থাকা এমটিবি ইউনিট ফান্ড ও অ্যালায়েন্স সন্ধানী লাইফ ইউনিট ফান্ড থেকে ৪৫ কোটি ৭ লাখ টাকা সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ২০২১ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে ফান্ডের অর্থ কৌশলে অ্যালায়েন্স ক্যাপিটালের নিজস্ব ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। পরবর্তী সময়ে সেই টাকা নগদে উত্তোলন বা অন্য প্রতিষ্ঠানে সরিয়ে নেওয়া হয়।

বিএসইসির তদন্তের পর সংশ্লিষ্টদের ব্যাংক হিসাব স্থগিত করা হয় এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক খন্দকার আসাদুল ইসলামের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিতে পুলিশকে অনুরোধ জানানো হয়। যদিও তার দাবি, অর্থ অতালিকাভুক্ত কোম্পানিতে বিনিয়োগের জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বিএসইসি আইনগত ব্যবস্থার জন্য দুদককে অনুরোধ জানালেও চূড়ান্ত মামলা বা অর্থ উদ্ধারের তথ্য এখনো মেলেনি।

রেসের ৬ ফান্ডে ২১৯ কোটি টাকার সম্ভাব্য ক্ষতি: রেস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থাপনায় থাকা এক হাজার ২২০ কোটি টাকা আকারের ছয়টি মিউচুয়াল ফান্ডে গুরুতর বিধিবহির্ভূত বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে। আইসিবির হিসাবে, এসব বিতর্কিত বিনিয়োগের কারণে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২১৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। ছয়টি ফান্ড হলো- ট্রাস্ট ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, এক্সিম ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, ফার্স্ট জনতা ব্যাংক মিউচুয়াল ফান্ড, ইবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, ফার্স্ট বাংলাদেশ ফিক্সড ইনকাম ফান্ড এবং আইএফআইসি ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড। সম্ভাব্য ক্ষতির মধ্যে ট্রাস্ট ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ডে ৩৪ কোটি ৮৮ লাখ, এক্সিম ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ডে ১৩ কোটি ২০ লাখ, ফার্স্ট জনতা ব্যাংক মিউচুয়াল ফান্ডে ৩৩ কোটি ৯৭ লাখ, ইবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ডে ২০ কোটি, ফার্স্ট বাংলাদেশ ফিক্সড ইনকাম ফান্ডে ৯৮ কোটি এবং আইএফআইসি ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ডে ১৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা অভিযোগ রয়েছে, বেস্ট হোল্ডিংসের বন্ড, রিজেন্ট স্পিনিং মিলসের বন্ড এবং পদ্মা ব্যাংক ও মাল্টি সিকিউরিটিজের প্রি-প্লেসমেন্ট শেয়ারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ট্রাস্ট ডিড ও মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। রেস অ্যাসেট এসব অভিযোগ অস্বীকার করলেও আইসিবি মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং বিএসইসি ছয়টি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠনসহ শোকজ ও বিশেষ অডিটের নির্দেশ দিয়েছে।

এলআর গ্লোবালে ৬৮ কোটি ৬৪ লাখ টাকার বিতর্কিত বিনিয়োগ: এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট তাদের ছয়টি ফান্ড থেকে পদ্মা প্রিন্টার্স অ্যান্ড কালারে (বর্তমান নাম কোয়েস্ট বিডিসি লিমিটেড) ৬৮ কোটি ৬৪ লাখ টাকা বিতর্কিত বিনিয়োগ করে। ২০২২ সালে কোম্পানিটির ৫১ শতাংশ শেয়ার অধিগ্রহণে ছয়টি ফান্ড থেকে ২৩ কোটি ৬২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হয়। ওই সময় কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য ছিল ঋণাত্মক ২ টাকা ৭৪ পয়সা এবং ওটিসি প্ল্যাটফর্মে শেয়ারটির লেনদেনমূল্য ছিল ১৩ টাকা ৬০ পয়সা। অথচ শেয়ার কেনা হয় ২৮৯ টাকা ৪৮ পয়সা দরে। পরে পরিশোধিত মূলধন বাড়ানোর সময় আরও ৪৫ কোটি ২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হয়।

বিএসইসির তদন্তে এ বিনিয়োগের মাধ্যমে ইউনিটধারীদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। ২০২৫ সালের অক্টোবরে বিএসইসি এলআর গ্লোবালের প্রধান নির্বাহী ও প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা রিয়াজ ইসলাম এবং বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামকে পুঁজিবাজারের কার্যক্রম থেকে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ করে। রিয়াজ ইসলামসহ ছয়জনকে এক কোটি টাকা করে এবং ফান্ডগুলোর ট্রাস্টি বিজিআইসিকে তিন কোটি টাকা জরিমানা করা হয়। একই সঙ্গে ৬৮ কোটি ৬৪ লাখ টাকা সুদসহ প্রায় ৯০ কোটি টাকা ফান্ডে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

ভ্যানগার্ডের ২০ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ফেরতের নির্দেশ: মিউচুয়াল ফান্ডের অর্থ সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘন করে দুটি বিনিয়োগে ব্যবহারের ঘটনায় ভ্যানগার্ড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টকে ২০ কোটি ৫৯ লাখ টাকা সংশ্লিষ্ট ফান্ডে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বিএসইসি। ৫ মে ২০২৬ অনুষ্ঠিত বিএসইসির এক হাজার ১২তম কমিশন সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। ভ্যানগার্ড এএমএল রূপালী ব্যাংক ব্যালান্সড ফান্ড থেকে ২০১৩ সালে বেঙ্গল পলি অ্যান্ড পেপারে এক কোটি ৫০ লাখ এবং ২০১৭ সালে এএফসি হেলথে ছয় কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছিল। বিএসইসির হিসাবে, এসব বিনিয়োগের বিপরীতে যথাক্রমে পাঁচ কোটি ৭৪ লাখ ও ১৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকা (মোট ২০ কোটি ৫৯ লাখ টাকা) ফেরত দিতে হবে। নির্ধারিত সময়ে ফেরত দিতে ব্যর্থ হলে ২২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান। তবে ফান্ডের সম্পদ সংরক্ষণ, লেনদেনের তদারকি ও আর্থিক তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্ব ট্রাস্টি, কাস্টডিয়ান ও নিরীক্ষকেরও রয়েছে। গত পাঁচ বছরে আলোচনায় আসা এসব ঘটনায় পুরো তদারকি কাঠামো নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।

আইসিবির চেয়ারম্যান ও পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবু আহমেদ কালবেলাকে বলেন, ‘ইউএফএসের ব্যবস্থাপনায় থাকা চারটি ফান্ডের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা আমি দায়িত্ব নেওয়ার আগের। এসব ঘটনায় দুদক ও বিএসইসি মামলা করেছে। আইসিবিও কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে এখনো অর্থ ফেরত আসেনি। মিউচুয়াল ফান্ড খাতে মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি ফান্ড ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের দায় রয়েছে। ইউএফএসের ঘটনাটিও এর একটি।’ তিনি বলেন, ‘অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের নামে মানুষের টাকা নিয়ে এভাবে জালিয়াতি করা বড় দুঃখজনক। যারা জালিয়াতি করেছে, তাদের বিষয়ে দুদক ও বিএসইসির কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’

বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ আবুল কালাম কালবেলাকে বলেন, ‘মিউচুয়াল ফান্ডে অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর অর্থ ফিরিয়ে আনার শর্তে যেসব জরিমানা করা হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টরা আপিল করেছেন। আপিল এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।

বর্তমান বিধিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি মিউচুয়াল ফান্ডের মোট সংগৃহীত অর্থের অন্তত ৬০ শতাংশ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে হয়। এর মধ্যে কমপক্ষে অর্ধেক তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজে রাখতে হয়। কোনো একক কোম্পানির শেয়ারে ফান্ডের মোট সম্পদের ১০ শতাংশের বেশি এবং কোনো কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের ১৫ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণ করা যায় না। কোনো নির্দিষ্ট শিল্প বা খাতে ২৫ শতাংশের বেশি বিনিয়োগের সুযোগ নেই। পাশাপাশি বার্ষিক নিট মুনাফার অন্তত ৭০ শতাংশ বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ হিসেবে দেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে বিনিয়োগের এই বিধি মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। ‘শক্ত’ বিনিয়োগ বিধান থাকার পরও নানা অনিয়মের ঘটনায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমেছে।

বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান সম্প্রতি কালবেলাকে বলেন, ‘বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত হলো মিউচুয়াল ফান্ড। অতীতে অনিয়ম ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে সাধারণ মানুষের আস্থা কমেছে। সেই আস্থা ফেরাতে প্রতিটি মিউচুয়াল ফান্ডের জন্য কিছু কি-পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর (কেপিআই) নির্ধারণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। আশা করছি এতে আস্থা ফিরবে।’