Image description
একটি জুয়ার ওয়েবসাইট বন্ধ হয় , কিছুদিন পর একই ধরনের আরেকটি সাইট হাজির । একটি অ্যাপ সরিয়ে দেওয়া হলে নতুন নামে আবার চালু হয় কার্যক্রম । এভাবে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ টি জুয়ার সাইট খোলা হয় । প্রযুক্তির এই ফাঁক গলে দেশে ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে অনলাইন জুয়া । পুলিশের হিসাব বলছে , বর্তমানে দেশে ৫৮৬ টি জুয়ার সাইট সক্রিয় । 
 
এসব জুয়ার ওয়েবসাইটে অবৈধ লেনদেনে ব্যবহৃত হচ্ছে ৩ হাজার ৮৬৪ টি মোবাইল ব্যাংকিং ( এমএফএস ) অ্যাকাউন্ট । এতে দৈনিক ৩০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা লেনদেন হয় । অনলাইন জুয়ায় লেনদেন হওয়া টাকার বড় অংশ ক্রিপ্টোকারেন্সি ও হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে । পুলিশ বলছে , জুয়ার ওয়েবসাইট ও অ্যাপস নিয়মিত বন্ধের জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনে ( বিটিআরসি ) তালিকা দেওয়া হয় । তারা বন্ধও করে , তবে জুয়াড়িরা নতুন সাইট খুলে আবার শুরু করে ।
 
তাই অনলাইন জুয়া একেবারে বন্ধ করা যাচ্ছে না । কারণ , সাইট ও অ্যাপের অনেকগুলোর নিয়ন্ত্রণ দেশের বাইরে । পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের ( সিআইডি ) সূত্র বলছে , গত ৬ মে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত চারজনকে ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি । তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১৭ মে নরসিংদী ও ঢাকার ধানমন্ডি থেকে আরও ৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয় । 
 
এ ঘটনায় রাজধানীর পল্টন থানায় সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে একটি মামলা হয়েছে । গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন আশরাফ উদ্দীন আহম্মেদ , সজীব চক্রবর্তী , আশরাফুল ইসলাম , জসীম উদ্দীন , তৈয়ব খান , সৌমিক সাহা , মো . কামরুজ্জামান ও আবদুর রহমান । ওই মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট সিআইডির কর্মকর্তা বলেন , দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় বিভিন্ন অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে আসছিল চক্রটি । এসব প্ল্যাটফর্মে জুয়াড়িরা বিকাশ , রকেট , নগদসহ মোবাইল ব্যাংকিং সেবা , ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং ক্রিপ্টো ওয়ালেটের মাধ্যমে লেনদেন করত । পরে ওই অর্থ ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ডিজিটাল হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হতো । 
 
সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের ( সিপিসি ) সাইবার ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ইউনিট জানিয়েছে , ওই চক্র চারটি ওয়েবসাইট খুলে জুয়া শুরু করেছিল । এসব ওয়েবসাইটের নিয়ন্ত্রণ রাশিয়ার একটি চক্রের হাতে ছিল । তারা প্রায় ২৫০ কোটি টাকা পাচার করেছে । পাচার হওয়া অর্থ সিআইডি , বাংলাদেশ ব্যাংকের গোয়েন্দা ইউনিট বিএফআইইউ এবং আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে ফেরত আনার কাজ চলছে । 
 
চক্রটির আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কও সংশ্লিষ্ট ক্রিপ্টো ওয়ালেট শনাক্ত করা হয়েছে । এ ছাড়া গত ১৩ মে রাজধানীর উত্তরা ও তুরাগ এলাকা থেকে অনলাইন জুয়াড়ি চক্রের সদস্য ৬ চীনা নাগরিকসহ ৯ জনকে গ্রেপ্তার করে ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম ( দক্ষিণ ) বিভাগ । এ ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে রমনা থানায় সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা হয়েছে । এই চক্র চীনের । তারা ভিয়েতনামে এই কাজ করে এসে বাংলাদেশে শুরু করেছিল । 
 
চক্রের নিয়ন্ত্রণ বিদেশে থাকলেও দেশে তাদের এজেন্ট , সাব - এজেন্ট এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিজস্ব লোক রয়েছে ; যারা অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা সংগ্রহ করে সেগুলো ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করে পাচার করত । তারপর ক্রিপ্টোকারেন্সি যেসব দেশে বৈধ , সেখান থেকে সেগুলো ডলারে রূপান্তর করে । সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের তথ্যানুযায়ী , গত ১ মে থেকে ১১ আগস্ট পর্যন্ত দেশে প্রায় ৫৮৬ টি অনলাইন জুয়ার সাইট সক্রিয় রয়েছে । এসব সাইটে জুয়ার লেনদেনে ৩ হাজার ৮৬৪ টি মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব ও ১৯৮ টি ব্যাংক হিসাব ব্যবহৃত হচ্ছে । 
 
এসব মোবাইল ব্যাংকিংয়ে অসংখ্য এজেন্ট নম্বর রয়েছে । জুয়াড়িরা বিভিন্ন এমএফএস কোম্পানির ব্যক্তিদের সঙ্গে কারসাজি করে এই এজেন্ট নম্বর সংগ্রহ করে । আবার কেউ কেউ দৈনিক এজেন্ট নম্বর ভাড়া নিয়ে জুয়ার টাকা জুয়াড়িদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে । পুলিশ জানায় , গত ৮ জুন কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী থেকে মোস্তাক মিয়া নামের এক যুবককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ । তাঁর বিকাশ ও নগদ এজেন্ট ব্যবসা রয়েছে । তবে এই ব্যবসার আড়ালে ১০ থেকে ১১ টি অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইটের টাকা তাঁর ওইনম্বরে লেনদেন হতো । জুয়ার ওয়েবসাইটের অপরাধীরা তাকে কমিশন দিয়ে সেখানে লেনদেন করত ।
 
ভূরুঙ্গামারী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মুনতাসির মামুন মুন বলেন , গ্রেপ্তার ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা হয়েছে । সিআইডি জানিয়েছে , একেকটি মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব থেকে ৩০ হাজার থেকে ৫/১০ লাখ টাকা লেনদেন করে চক্রটি । এজেন্ট নম্বরগুলোতে কখনো কখনো এর বেশি লেনদেন হয় । সেই হিসাবে সিআইডির পর্যবেক্ষণ , বর্তমানে সক্রিয় ৩ হাজার ৮৬৪ টি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের অ্যাকাউন্ট থেকে দৈনিক সারা দেশে ৩০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা অবৈধ লেনদেন হয় । 
 
সিআইডি জানিয়েছে , জুয়ার ওয়েবসাইটগুলোর বেশির ভাগ নিয়ন্ত্রণ করা হয় রাশিয়া , চীন , হংকং , ভিয়েতনাম এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে । সিআইডির সিপিসি ইউনিটের অতিরিক্ত ডিআইজি মো . সাইফউদ্দীন শাহীন আজকের পত্রিকাকে বলেন , ‘ আমাদের সাইবার প্যাট্রল টিম নিয়মিত এসব জুয়ার সাইট মনিটরিং করে । তারা দৈনিক যেসব জুয়ার সাইট পায় , সেগুলো বন্ধ করতে আমরা নিয়মিত বিটিআরসিকে তথ্য ও তালিকা দিই । ৫৮৬ টি ওয়েবসাইট বন্ধ করতেও তালিকা দেওয়া হয়েছে । 
 
এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংককে মোবাইল ব্যাংকিংগুলোর বিষয়েও তথ্য দেওয়া হয়েছে । ' ৫ বছরে ৫১০৯ ওয়েবসাইট , ৪৫০ অ্যাপ বন্ধ করেছে বিটিআরসি : আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট ও অ্যাপস বন্ধে তালিকার সুপারিশ পাওয়ার পর সেগুলো বন্ধ করে বিটিআরসি । সংস্থাটির সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে , ২০২১ সালের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৫ হাজার ১০৯ টি জুয়ার ওয়েবসাইট এবং ৪৫০ টি অ্যাপ বন্ধ করেছে তারা । 
 
কেন পুরোপুরি বন্ধ হয় না : তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন , একজন ব্যবহারকারী প্রথমে কোনো জুয়ার সাইট বা অ্যাপে ঢুকে মোবাইল নম্বর দিয়ে নিবন্ধন করেন । এরপর নির্দিষ্ট মোবাইল ব্যাংকিং নম্বর বা ব্যাংক হিসাবে টাকা পাঠিয়ে তার জুয়ার অ্যাকাউন্টে অর্থ যোগ করেন । জিতলে একই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে টাকা ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থা থাকে । ফলে ওয়েবসাইট বন্ধ করে দিলেই পুরো চক্র ভেঙে পড়ে না । কারণ , জুয়ার সঙ্গে যুক্ত মোবাইল নম্বরগুলোতে নতুন ওয়েবসাইট খুলেই জুয়াড়িরা বার্তা পাঠিয়ে দেয় । বকেয়া টাকাও পরিশোধ করে । 
 
এই পেমেন্ট নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকায় পুনরায় তারা সংগঠিত হয় । এরই মধ্যে অনলাইন জুয়া , হুন্ডি ও অন্যান্য আর্থিক অপরাধে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের অপব্যবহার ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংক , বিটিআরসিসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে সিআইডি । এ ছাড়া গত ২৪ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছিলেন , অনলাইন জুয়া ডিজিটাল হুন্ডির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে প্রায় ৫৫ হাজার মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস অ্যাকাউন্টের লেনদেন স্থগিত বা ফ্রিজ করা হয়েছে । 
 
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন : প্রযুক্তিবিদ ও আইনজীবী তানভীর হাসান জোহা বলেন , একটি সাইট বন্ধ করলে অপরাধীরা নতুন সাইট নিয়ে ফিরে আসতে পারে । তাই তাদের সাইট , অ্যাপ , ব্যবহারকারী , এজেন্ট , এমএফএস , ব্যাংক হিসাব ও অর্থের গন্তব্য — এই পুরো চেইনকে আইনের আওতায় আনতে পারলে জুয়ার নেপথ্যের মূল হোতারা বের হয়ে আসবে । তবে এই তদন্ত অনেক সময়সাপেক্ষ জটিল । তাই ধীরে চলে মামলা ।