শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর ঢাকা মেট্রো সার্কেল। কারণ এই সার্কেলের অধীনে রাজধানীর স্কুল, কলেজ, মাদরাসা এবং শিক্ষাসংক্রান্ত কার্যালয়ের নির্মাণ ও মেরামতের কাজ চলে।
সূত্র জানায়, দুই মাস আগে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) আগারগাঁওয়ের প্রধান কার্যালয়ের অসমাপ্ত কাজ নতুন ঠিকারদারকে দেওয়া হয়। ৯৮ কোটি টাকার সেই কাজ পায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগ আমলের কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাকের নিকটাত্মীয়র প্রতিষ্ঠান নূরানী কনস্ট্রাকশন। গত ডিসেম্বরে ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ৩৫ কোটি টাকার নির্মাণকাজ দেওয়া হয় ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের প্রচার সম্পাদক রাকিব হোসেন মিরনের প্রতিষ্ঠান মিরন এন্টারপ্রাইজকে।
মোহাম্মদপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গৌর চন্দ্র মণ্ডল ২০২৪ সালের জুলাই মাসে অবসরে যান। অথচ তাঁর স্বাক্ষর জাল করে ২০২৫ সালের জুন মাসে হ্যান্ডওভার দেখিয়ে কোনো কাজ না করেই বিল তুলে নেয় মেসার্স মেড-ইন বাংলাদেশ নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, যার মালিক মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস হোসেন। কোতোয়ালি থানার আনোয়ারা বেগম মুসলিম গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে কোনো কাজ না করেই বিলের ১৯ লাখ টাকা তুলে নেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। জানা গেছে, হাসান শওকত ঢাকা মেট্রোর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত থাকার সময় বঙ্গভবনসংলগ্ন শেরেবাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়ের ১০ তলা একাডেমিক ভবন নির্মাণের কার্যাদেশ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সার্স বিল্ডার্স—সিডাব্লিউ বিডি (জেভি)। গত সপ্তাহে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভবনটির আটতলা পর্যন্ত নির্মাণকাজ হয়েছে।
অথচ ইইডির নথিপত্র থেকে জানা যায়, ভবনটির নবম ও দশম তলার নির্মাণকাজ বাবদ সিডাব্লিউবিডিকে দুই কোটি ৮০ লাখ টাকা ছাড় করা হয়েছে। সপ্তম চলতি বিলে এই টাকার ছাড়পত্রে স্বাক্ষর করেন সে সময়ের ঢাকা মেট্রোর নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান শওকত।
শেরেবাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়ের নবম ও দশম তলার ছাদ ঢালাই না হলেও বিলের স্পেসিফিকেশনে ছাদের ওপর পানি নিরোধক মেমব্রেন বাবদ সাত লাখ ৪৬ হাজার ৪৫০ টাকা, দশম তলাসহ ভবনের দেয়ালের ওয়াটার প্রুফিং বাবদ ছয় লাখ ৫০ হাজার টাকা, নবম তলার ছাদের শাটারিং বাবদ এক লাখ ৮৮ হাজার টাকা, দশম তলার ছাদের পিলার বাবদ পাঁচ লাখ ১৪ হাজার টাকা, দশম তলার ছাদের শাটারিং বাবদ এক লাখ ৮৮ হাজার টাকা, নবম তলার লিনটেল বাবদ পাঁচ লাখ ৯০ হাজার টাকা, নবম তলার ছাদের ঢালাই বাবদ চার লাখ ৯০ হাজার টাকা, নবম তলার ছাদের শাটারিং বাবদ চার লাখ ৯০ হাজার টাকা, নবম তলার সিড়ি বাবদ দুই লাখ ১০ হাজার টাকা, নবম তলার ছাদের রড বাবদ ৪০ লাখ টাকা, দশম তলার রড বাবদ ৯ লাখ টাকা, নিরাপত্তাবেষ্টনী বাবদ ৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। অথচ কেপিআইভুক্ত এলাকা হওয়ায় এই ভবনটি নবম ও দশম তলা করার সুযোগ নেই। ইইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শেরেবাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়ের ব্যাপারটি আমার জানা নেই। আমি এ ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’
কালের কণ্ঠের হাতে হাসান শওকতের রুমের একটি ভিডিও এসেছে, যেখানে হাসান শওকত তাঁর বেইলি রোডের অফিসরুমে চেয়ারে বসে আছেন। তাঁর সামনে রাকিব হোসেন মিরনসহ মাস্ক পরা কয়েকজন ব্যক্তি আছেন। ওই রুমে মোট সাতজন ব্যক্তিকে দেখা যায়। তাঁদের মধ্যে তিনজন বড় বেশ কয়েকটি প্যাকেট থেকে লাখ লাখ টাকা বের করে টেবিলের ওপর রাখেন। এরপর আবার তা খামে ঢোকাতে দেখা যায়।
জানা গেছে, প্রকৌশলী হাসান শওকত ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঢাকা মেট্রোতে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এরপর তিনি ৯-১০ মাসের জন্য ঢাকার বাইরে বদলি হন। এরপর আবার ইইডির প্রধান কার্যালয়ে বদলি হয়ে আসেন। গত বছর তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পান এবং তাঁকে ঢাকা মেট্রোর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদায়ন করা হয়।
জানা যায়, হাসান শওকত আওয়ামী ঘনিষ্ঠজন হিসেবে বেশি পরিচিত। কালের কণ্ঠের হাতে একাধিক ছবি রয়েছে, যেখানে তিনি বিভিন্ন দলীয় কর্মসূচিতে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন; এমনকি শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা জানাতে বিভিন্ন স্থানে গেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, হাসান শওকত নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের মালিক। তাঁর স্ত্রীর নামেও রয়েছে অঢেল সম্পদ; বিশেষ করে ঢাকা, খুলনা ও মেহেরপুরে এই সম্পদ রয়েছে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রো সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাসান শওকত কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শেরেবাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়ের ভবনটি ১০ তলা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এটি কেপিআইভুক্ত এলাকা হওয়ায় বাধা আসে। ফলে পরে আটতলা পর্যন্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আমি কিন্তু আমাদের ইঞ্জিনিয়ারদের বারবার বলেছি, এমনকি দুটি চিঠিও দিয়েছি, কোনো অ্যাডভান্স দেওয়া যাবে না। ওভার পে করা যাবে না। হয়তো ৯-১০ তলার অ্যাডভান্স বিল সাবমিট হতে পারে, কিন্তু সেটা ফাইনালি পেমেন্ট হয় নাই। যে অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ারের অধীনে এই কাজটি হয়েছে, তিনি এ ব্যাপারে ভালো বলতে পারবেন। তবে অতিরিক্ত বিল নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’
ভিডিওর ব্যাপারে হাসান শওকত বলেন, ‘বাংলা কলেজের কাজ করছিল ঢালী কনস্ট্রাকশন, কিন্তু তারা সেটি শেষ না করায় থার্ড পার্টির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তখন এই নেগোসিয়েশন করেন রাকিব হোসেন মিরন। সে সময় আমার অফিসে বসে দুই পার্টির মধ্যে টাকা লেনদেন হয়। ওই ভিডিওটাই আপনি দেখেছেন। ওই লেনদেনের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। প্রজেক্টটি তোলার স্বার্থে আমি ওখানে ছিলাম। তবে ওই ভিডিওর শেষে যে কথাবার্তা আছে, তা এআই এডিটেড। আর ট্যাক্স রিটার্নে উল্লেখিত সম্পত্তির বাইরে আমার ও আমার পরিবারের কোনো সম্পত্তি নেই।’