রাজধানীর সবুজবাগের বাগানবাড়ি খালপাড় কালভার্টের নিচে ময়লার স্তূপে পলিথিনের শপিং ব্যাগে মোড়ানো একটি খণ্ডিত মাথা দেখতে পান পথচারীরা। ব্যাগটির ভিতর থেকে খণ্ডিত দুই হাতও উদ্ধার করে পুলিশ। গত বৃহস্পতিবার খণ্ডিত অংশগুলো ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) মর্গে পাঠানো হয়। মাথাটি দেখেই তদন্তকারীরা অনুমান করেন নৃশংসভাবে হত্যার পর ওই তরুণীকে টুকরো টুকরো করা হয়েছে। কিন্তু ফিঙ্গার প্রিন্ট ও খণ্ডিত মাথার মুখমণ্ডলের ছবিতে পরিচয় না মেলায় তদন্ত থমকে যায়। চার দিনেও মেলেনি খণ্ডিত অবশিষ্ট লাশ। ঘটনাস্থলে কোনো সিসি ক্যামেরা না থাকায় খুনি সম্পর্কে অন্ধকারে তদন্তকারীরা।
এ ঘটনার এক দিন পরই শনিবার সন্ধ্যায় কামরাঙ্গীরচর শহীদনগর বউবাজারের বিপরীত পাশের ঢাল থেকে দুটি খণ্ডিত হাত উদ্ধার করা হয়। পচন ধরায় হাতগুলো থেকে ফিঙ্গার প্রিন্টও মেলেনি। ঘটনাস্থল থেকেও মেলেনি কোনো ক্লু। এমনকি ওই দুটি হাত একই ব্যক্তির কিনা সেটি নিয়েও সন্দিহান পুলিশ। যদি হাত দুটি দুজন বা একজন ব্যক্তির হয় তাহলে তার বা তাদের দেহের বাকি অংশ কোথায়? যদিও পুলিশের ধারণা, দুটি ঘটনাতেই অন্য কোনো স্থানে হত্যার পর লাশ টুকরো করে গুম করার জন্য সেখানে ফেলা হয়েছে। দুটি ঘটনাতেই সারা দেশে তারবার্তা দিয়েছে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ। নিখোঁজ অনেকের স্বজন যোগাযোগও করেছে। কিন্তু নিহতদের স্বজন মেলেনি এখনো। মেলেনি নৃশংস খুনিদেরও খোঁজ।
শুধু এই দুই ঘটনাই নয়, সম্প্রতি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় এমন লাশ টুকরো করার ঘটনা ঘটছে। অনেক ঘটনা দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করছে। বেশির ভাগের রহস্যও উন্মোচন হচ্ছে। ধরা পড়ছে খুনি। তবে পরিচয় ও ক্লু পাওয়া না গেলে জট খুলছে না অনেক টুকরো লাশের রহস্যের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক অজ্ঞাত টুকরো লাশের ঘটনায় মামলা হলেও বছরের পর বছর ঝুলে থাকছে। এর পেছনে তদন্তকারীদের দক্ষতার অভাব, ক্লু না থাকায় গুরুত্ব না দেওয়াসহ বিভিন্ন কারণ রয়েছে। এ ছাড়াও রহস্য উন্মোচন হওয়া বা আসামি গ্রেপ্তার হওয়া ঘটনাগুলোও দেশব্যাপী আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে হত্যার পর লাশ টুকরো করে ঠাণ্ডা মাথায় সেগুলো বিভিন্ন জায়গায় ফেলে আসার ঘটনাগুলো জনসাধারণের মনে বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
সবশেষ গত শনিবার বিকালে কুমিল্লার গৃহবধূ ফরিদা বেগমকে হত্যার পর লাশ টুকরো করে বিভিন্ন স্থানে ফেলে আসার ঘটনা বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে। এর আগে গত মে মাসে রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর টুকরো করার ঘটনা সারা দেশে তোলপাড় সৃষ্টি করে। রামিসা হত্যার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভে নেমেছিল নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। এ ছাড়াও শিশু থেকে তরুণী ও মধ্য বয়স্ক ব্যক্তিদের টুকরো টুকরো লাশ প্রায়ই চাঞ্চল্য সৃষ্টি করছে। রামিসাকে হত্যার আগেরদিন মুগদা-মান্ডা থেকে উদ্ধার হয় প্রবাসী মোকাররম মিয়ার (৩৭) আট টুকরো লাশ। প্রথমে পাওয়া যায় মস্তকবিহীন সাত টুকরো। পরে মাথা উদ্ধার করা হয়। গত বছরের নভেম্বরেও জাতীয় ঈদগাহ মাঠের সামনে থেকে রংপুরের কাঁচামাল ব্যবসায়ী আশরাফুল হকের ২৬ টুকরো লাশ উদ্ধারের ঘটনাও খুনিদের ভয়ংকর রূপ সামনে নিয়ে আসে। রোমহর্ষক শরীর হিম করা এমন ঘটনা যেন থামছেই না।
নৃশংসতা উগ্রে দিচ্ছে সামাজিক অস্থিরতা : মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, মানুষ আকাক্সক্ষার দাস। এই আকাক্সক্ষা পূরণ করতে গিয়ে অন্যের ক্ষতি সাধনের প্রতি ইচ্ছা তৈরি হয়। এক্ষেত্রে প্রথমে সে বিবেচনায় নেয় বাস্তবতা। যদি মনে করে কাজটি করলে কোনোভাবে পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে তখন আর তার মধ্যে নৈতিকতা ও বিবেকবোধ কাজ করে না। অপরাধ করার পরের ধরাছোঁয়ার উপায় খুঁজতে থাকে।
এক্ষেত্রে ক্রাইম প্যাট্রল এবং এ ধরনের বিভিন্ন সিরিয়াল ও মুভি হত্যার পর লাশ টুকরো করে গুম করার ঘটনা মাথায় ঘুরপাক খায় এবং উৎসাহ জোগায়। যখন কেউ কাউকে হত্যার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে তার মস্তিষ্ক তখন আর আবেগীয় থাকে না। হয়ে ওঠে সর্বোচ্চ মাত্রার নৃশংস। তিনি আরও বলেন, সবার মধ্যে আবেগ, রাগ, ঘৃণা ও হিংসা থাকবেই। তবে বর্তমানে সামাজিক অস্থিরতা, প্রিয়জনদের অহরহ বিশ্বাস ভঙ্গ, পরকীয়া সম্পর্কে লিপ্ত হওয়া, সহমর্মিতা কমে যাওয়া, দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ জমতে থাকাসহ চারপাশের পরিবেশ মানুষকে হিংস্র করে তুলছে। উগ্রে দিচ্ছে ভিতরের নৃশংসতা। এ কারণে টুকরো লাশের সংখ্যা বাড়ছে।
তদন্তে আলাদা ইউনিট গঠন প্রয়োজন : সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, লাশের পরিচয় শনাক্ত করা না গেলে খুনিরা বেঁচে যায়। এক্ষেত্রে পুলিশের দক্ষতা ও গুরুত্বের অভাব রয়েছে। পুলিশের উচিত সব ধরনের সোর্স, কৌশল প্রয়োগ করে খুনিকে আইনের আওতায় আনা। প্রয়োজনে এসব ঘটনা তদন্তে আলাদা ইউনিট গঠন করতে হবে। দক্ষ কর্মকর্তা দিয়ে মামলার তদন্ত করাতে হবে। কোনো অবস্থাতেই মামলাকে দীর্ঘসূত্রতায় ফেলা যাবে না।
অজ্ঞাতদের ডিএনএ থাকে সংরক্ষিত : সিআইডির ফরেনসিক বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএসপি) আবুল বাশার মোহাম্মদ আতিকুর রহমান বলেন, টুকরো লাশের আলাদা কোনো পরিসংখ্যান সংরক্ষণ করা হয় না। তবে আলামত সংগ্রহের পর প্রথমে ফিঙ্গার প্রিন্টের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করা হয়। ফরেনসিক করা হয় অন্যান্য আলামত। পরিচয় পাওয়া না গেলে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে অন্যান্য আলামত বুঝিয়ে দেওয়া হয়। আর খণ্ডিত অংশ থেকে প্রাপ্ত ডিএনএ ও ভিসেরা রিপোর্ট সংরক্ষণ করা থাকে। যদি কোনো নিখোঁজের স্বজন পাওয়া যায় তখন ডিএনএ প্রোফাইল ক্রসচেক করা হয়।
নৃশংস ঘটনায় বিশেষ গুরুত্ব : পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্তি আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, সব হত্যাকাণ্ডই নির্মম। তবে যেগুলো বেশি নৃশংস সেগুলো বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। খণ্ডিত লাশ উদ্ধারের ঘটনাগুলোও গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হয়। বেশির ভাগ ঘটনাতেই খুনি গ্রেপ্তার হয়। আর যেসব খণ্ডিত লাশের পরিচয় অথবা হত্যার কোনো ক্লু পাওয়া যায় না সেগুলোও রহস্য উদঘাটনেও পুলিশ মুন্শিয়ানা দেখিয়ে আসছে। তবে কিছু কর্মকর্তার দক্ষতা ও ক্লু না পাওয়ায় গুরুত্ব কম দেওয়ার বিষয়গুলোও অস্বীকার করছি না।