৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হবেন দেশের ২৩তম রাষ্টপ্রতি। নির্বাচন কমিশনের ডাকা জাতীয় সংসদের বিশেষ বৈঠকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট গ্রহণ ২০ আগস্ট। সেদিন বেলা ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ হবে। নির্বাচনে সংসদ সদস্যরা নির্ধারিত ভোটকেন্দ্রে গিয়ে প্রার্থীর নাম লিখে ভোট দেবেন। ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পর ফলাফল প্রস্তুত করে তা প্রকাশ করা হবে। গতকাল জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে প্রেস ব্রিফিংয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন তথ্য জানান সরকারদলীয় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। এর আগে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সুষ্ঠু ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে স্পিকার, চিফ হুইপ, বিরোধীদলীয় প্রতিনিধিসহ নির্বাচন কমিশন ও সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। গতকাল সন্ধ্যায় নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য ২০ আগস্ট সংসদ সদস্যদের বৈঠক ডেকে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। জাতীয় সংসদ ভবনে সংসদ সদস্যদের এ বৈঠক হবে।
নিজ দলের পছন্দের প্রার্থীর বাইরে কোনো সংসদ সদস্য ভোট দিতে পারবেন না। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, দলের সিদ্ধান্তের বাইরে তাঁরা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। ৩৫ বছর পর এবার সংসদে রাষ্ট্রপতি পদে ভোট গ্রহণ হতে যাচ্ছে। এর আগে ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুজন মনোনীত প্রার্থীর মধ্যে তখন বিএনপির আবদুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
ব্রিফিংয়ে চিফ হুইপ বলেন, ‘মনোনয়নপত্র দাখিল ও প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ১৮ আগস্ট। এরপর আমরা নির্বাচন করব। আমাদের বিএনপিদলীয় প্রার্থী আমরা এখনো চূড়ান্ত করিনি। প্রধানমন্ত্রীকে এ বিষয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি আমাদের দলের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করবেন।’
বর্তমান ভোটপদ্ধতি সম্পর্কে চিফ হুইপ বলেন, ‘ভোট প্রকাশ্য বা গোপন যেভাবেই হোক, সেখানে ভোটদাতাকে নিজের নাম ও আসন নম্বর লিখতে হবে। ফলে কে কাকে ভোট দিয়েছেন, তা শনাক্ত করা সম্ভব। এখানে আপাতত কোনো গোপনীয়তা নেই। ভবিষ্যতে যেভাবে সিদ্ধান্ত হবে, সেভাবেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বিরোধী দল থেকেও একজন প্রার্থী দেওয়ার কথা জানিয়ে চিফ হুইপ বলেন, ‘নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য আজকে আমরা বসেছিলাম। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ, নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা এবং সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা স্পিকারের সভাপতিত্বে বৈঠক করেছি।’ তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি, সংসদ নেতা, বিরোধীদলীয় নেতা এবং স্পিকার মহোদয় ভোট দেবেন। ভোট দেওয়ার সময় গণমাধ্যমের উপস্থিতি থাকবে। ভোট গ্রহণ সরাসরি দেখানো হবে। ভোট শেষ হওয়ার পর ফলাফল প্রস্তুতের সময়ও গণমাধ্যমকে জানানো হবে।’
চিফ হুইপ জানান, সংসদ ভবনের ভিতরেই ভোট গ্রহণের ব্যবস্থা করা হবে। ভোটের জন্য বুথ থাকবে। সংসদ সদস্যরা সেখানে গিয়ে ভোট দেবেন। তিনি বলেন, মোট ৩৪৯টি ভোট আছে। যদি দেখা যায় এক ঘণ্টার মধ্যেই ভোট হয়ে গেছে, তাহলে এক ঘণ্টা পর ফলাফল প্রস্তুতের কাজ শুরু করা যাবে। আর যদি কোনো ভোট বাকি থাকে, তাহলে বিকাল ৫টার পর ভোট শেষ করে ফলাফল প্রস্তুত করা হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনায় নির্বাচন কমিশনের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা থাকবে জানিয়ে চিফ হুইপ বলেন, নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা থাকবেন। কমিশন থেকে কোনো কমিশনার এলে তিনিও থাকবেন। সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা তাঁদের প্রয়োজনীয় সাচিবিক সহায়তা দেবেন।
জুলাই সনদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন চেয়েছিল বিরোধী দল : বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা ছিল, জুলাই সনদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনটা হওয়া। নির্বাচনের পরে যেহেতু গণভোটের রায়ও সংস্কারের পক্ষে এসেছে, সংসদ যদি সেটার সংস্কার করে, ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনটা করতে পারতাম এবং জুলাই সনদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা অনেক জায়গায় বৃদ্ধি পাওয়ার কথা ছিল। তাহলে আমরা আসলেই একটা নতুন বাংলাদেশ, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং একজন রাষ্ট্রপতি পেতাম, যিনি আরও বেশি সম্মানিত ও গ্রহণযোগ্য হতেন। কিন্তু সেটা হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘তারপরও যেহেতু নির্বাচন হচ্ছে, আমরা এটা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হতে দিতে চাই না। সে কারণে বিরোধী দলের জায়গা থেকে প্রার্থী দেওয়া হয়েছে।’
গণমাধ্যমের উপস্থিতিতে হবে ভোট গ্রহণ : রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠানে জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেছেন, ১৯৯১ সালের পর দীর্ঘ বিরতিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট গ্রহণ হচ্ছে ২০ আগস্ট। এতে লাইভ টেলিকাস্ট হবে এবং সাংবাদিকদের বসার ব্যবস্থা থাকবে। গতকাল আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।
ইসি সচিব বলেন, গতকাল বেলা ১১টায় জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে স্পিকারের সঙ্গে একটি প্রস্তুতিমূলক সভা হয়েছে। আলোচনার মূল বিষয় ছিল ‘রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ২০২৬’। ভোটের তারিখ ২০ আগস্ট, বেলা ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত। জাতীয় সংসদের অধিবেশনকক্ষে ভোট গ্রহণ করা হবে। ভোটদান পদ্ধতি বিষয়ে তিনি বলেন, সংসদ সদস্যরা তাঁদের নিজ নিজ আসনে বসবেন। নির্বাচন কমিশনের সহায়তাকারী কর্মকর্তারা (স্পিকারসহ ২০ জন) ব্যালট পেপার সদস্যদের কাছে পৌঁছে দেবেন। সদস্যরা তাঁদের পছন্দের প্রার্থীকে চিহ্নিত করে সামনে রাখা তিনটি ব্যালট বাক্সের যেকোনোটিতে ব্যালট পেপার রাখবেন।
গণনা ও ফলাফল ঘোষণা বিষয়ে ইসি সচিব জানান, বিকাল ৫টায় ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে অধিবেশনকক্ষেই ভোট গণনা করা হবে। মোট ভোটারসংখ্যা ৩৪৯। গণনা শেষে প্রাথমিক ফলাফল সেখানে সিইসি (প্রধান নির্বাচন কমিশনার) ঘোষণা করবেন এবং পরবর্তী সময়ে সচিবালয় থেকে চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করা হবে। নির্বাচনি প্রক্রিয়া সংসদ থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে এবং সংবাদকর্মীদের জন্য নির্ধারিত বসার ব্যবস্থা থাকবে। ইসি সচিব বলেন, ব্যালট পেপারের দুটি অংশ থাকবে। একটা হচ্ছে মুড়ি-এতে ক্রমিক নম্বর, ভোটারের নাম, বিভক্তি নম্বর এবং স্বাক্ষরের জায়গা থাকবে। অন্য অংশে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নাম থাকবে এবং পাশে ভোটারকে নাম লিখে স্বাক্ষর করতে হবে।
আখতার আহমেদ বলেন, নির্বাচন কমিশনের ২০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নির্বাচনি কাজে নিয়োজিত থাকবেন এবং তাঁদের জন্য আলাদা আইডি কার্ড থাকবে। নির্বাচন কমিশনাররাও উপস্থিত থেকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবেন। ১৯৯১ সালের পর দীর্ঘ বিরতিতে নির্বাচন হচ্ছে। তাঁরা প্রত্যক্ষ করবেন। প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রার্থীর নামের পাশে ভোটারকে পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করতে হবে। কোনো এমপি যদি তাঁর দলের প্রার্থীর বাইরে অন্য কাউকে ভোট দেন তবে তা ‘ফ্লোর ক্রসিং’ বা ৭০ অনুচ্ছেদের আওতায় পড়বে কি না, জানতে চাইলে ইসি সচিব বলেন, এটি একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন এবং নির্বাচনের পদ্ধতিগত বিষয়ের বাইরে। তাই রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে এর উত্তর জেনে নেওয়াই ভালো।
গত ২৪ জুলাই ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সহাবুদ্দিন অসুস্থতা দেখিয়ে পদত্যাগ করেন। এরপর ২০ আগস্ট ভোটের তারিখ রেখে তফসিল দেয় ইসি। এবার বিএনপি ও জামায়াত জোট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে একাধিক বৈধ প্রার্থী থাকলে ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট গ্রহণ হতে পারে। কারণ এই সময়ে একক প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।
জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন ২৭ আগস্ট : ত্রয়োদশ (১৩তম) জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন আহ্বান করেছেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ। ২৭ আগস্ট (বৃহস্পতিবার) বেলা ৩টায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদকক্ষে এ অধিবেশন শুরু হবে।
গতকাল সংসদ সচিবালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদের (১) দফায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি এ অধিবেশন আহ্বান করেছেন।