স্বজনদের আহাজারি, চোখে অশ্রু আর ঘরে ক্যানসারে আক্রান্ত বাবার মরদেহ—এমন এক চরম শোকাবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে পরীক্ষা দিয়েও অদম্য মেধার পরিচয় দিয়েছে যশোরের চৌগাছার মেয়ে ঋতু খাতুন। ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় মানবিক বিভাগ থেকে একমাত্র জিপিএ-৫ অর্জন করেছে ঋতু।
তবে অবিশ্বাস্য এই সাফল্যের মধ্যেও পিতৃহীন ঋতুর উচ্চশিক্ষা চালিয়ে নেওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। ঋতু খাতুন যশোর জেলার চৌগাছা উপজেলার হাকিমপুর গ্রামের প্রয়াত কবির হোসেন ও রেহেনা খাতুন দম্পতির ছোট মেয়ে। সে স্থানীয় হাকিমপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল।
ঋতুর মা রেহেনা পারভীন আগামীর সময়কে জানান, ২০১২ সাল থেকে তার স্বামী ফুঁসফুঁস জনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। ২০২৫ সালের দিকে বাম হাতে একটি টিউমার হয়। সেটি অপারেশন করতে গেলে রিপোর্টে ক্যান্সার ধরা পড়ে। ক্যান্সার আক্রান্ত হওয়ার আড়াই মাস পর ঢাকাতে তাকে কেমোথেরাপী প্রদান করার ১০-১২ দিন পর মেয়ের পরীক্ষার মধ্যে তিনি হঠাৎ মৃত্যু বরণ করেন। চিকিৎসা সেবা চালাতে গিয়ে মাঠের কিছু জমি বিক্রয় করতে হয়েছে। যত সামান্য কিছু জমি আছে সেটা দিয়ে কোনো রকম সংসার চালানো কষ্টসাধ্য। ফলে মেয়ের শিক্ষা জীবন নিয়ে দুঃচিন্তায় আছি। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তিনিই।
‘পরীক্ষা চলাকালেই শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে যশোর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গত ১০ মে ঋতুর ‘বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা’ পরীক্ষার দিন ভোরে হাসপাতালেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি’— যোগ করেন ঋতুর মা।
ঋতুর পরীক্ষা যাতে খারাপ না হয়, সেজন্য পরিবারের পক্ষ থেকে মৃত্যুর খবরটি প্রথমে তার কাছে গোপন রাখা হয়। কেন্দ্র দূরবর্তী (১০ কিলোমিটার দূরে চৌগাছা ছারা পাইলট বালিকা বিদ্যালয়) হওয়ায় ভোরে পরীক্ষা দিতে বের হওয়ার পরই মরদেহ বাড়িতে আনা হয়। পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফিরে বাবার মৃত্যুর খবর জানতে পারে ঋতু। এরপর শেষবারের মতো বাবার মুখ দেখে বিদায় জানানোর পর বুকের কষ্ট চেপে রেখেই সে একে একে বাকি সব পরীক্ষায় অংশ নেয়।
আবেগাপ্লুত হয়ে ঋতু বলে, ‘বাবা বেঁচে থাকলে আজ সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন। বাবা না থাকায় এখন পরিবারে আয়-রোজগারের কেউ নেই। সামনে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারব কিনা, তা নিয়ে চিন্তায় আছি।’
ঋতুর চাচা মোমিনুর রহমান বলেন, ‘এ প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে সে ভাল ফলাফল করেছে, এখন আমাদের সরকারে কাছে দাবি আর্থিক অভাবে যেন আমার ভাতিজির লেখাপড়া বন্ধ না হয়।’
ঋতুর স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. আশরাফুল ইসলাম জানান, এবারের এসএসসি পরীক্ষায় ৫৫ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে ৬জন জিপিএ ৫ পেয়েছে। এর মধ্যে মানবিক বিভাগ থেকে ঋতুই জিপিএ-৫ পেয়েছে। দরিদ্রতা ও অসুস্থ বাবা—কোনো কিছুই ঋতুর পড়াশোনা থামাতে পারেনি। আমরা প্রাথমিকভাবে ইতোমধ্যে স্কুলের পক্ষ থেকে সমস্ত শিক্ষকদের নিয়ে তার জন্য একটি আর্থিক ফান্ড তৈরি করেছি যাতে অর্থের অভাবে তার লেখাপড়া বন্ধ না হয়।
এ বিষয়ে চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা ইসলাম বলেন, ‘শোককে শক্তিতে পরিণত করে ঋতুর এই সাফল্য অত্যন্ত প্রশংসনীয়। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার উচ্চশিক্ষার জন্য সর্বোচ্চ সহায়তা প্রদান করা হবে।’