ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ আমলের বিতর্কিত এস আলম ও নাসা গ্রুপের লুণ্ঠনে সংকট পড়া পাঁচ ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে অন্তর্বর্তী সরকার। বিএনপি সরকারে এসে এসব ব্যাংকের পুরোনো ও বিতর্কিত পরিচালকদের ফেরার সুযোগ নতুন আইনে রাখে।
এজন্য ব্যাংক রেজোল্যুশেন আইন সংসদে পাস করার সময় ১৮(ক) ধারা নামে নতুন ধারা যুক্ত করে, যা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। কিন্তু একীভূত হওয়া সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পুরোনো ও বিতর্কিত পরিচালকদের কেউই ব্যাংকে ফেরার আবেদন করেননি। ফলে তাদের নিয়ন্ত্রণে ব্যাংক যাওয়ার পথ বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
সোমবার (১০ আগস্ট) ১৮(ক) ধারা বাতিল করার সংশোধনী প্রস্তাব মন্ত্রিসভা বৈঠকে অনুমোদন দেওয়া হয়। বাতিলের কারণ হিসেবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পাঠানোর সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, শর্ত মেনে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আবেদন না করায় সরকার ধারাটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
১৮ (ক) ধারায় বলা হয়, কোনো ব্যাংক রেজোল্যুশনের আওতায় যাওয়ার আগে যারা শেয়ারহোল্ডার ছিলেন, তারা চাইলে পরে আবার সেই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করতে পারবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে অন্য কোনো উপযুক্ত ব্যক্তিকেও এই সুযোগ দিতে পারবে।
জাতীয় সংসদে পাস হওয়ার পর এ নিয়ে তখন ব্যাপক সমালোচনা হয়। পরে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট অধিবেশনে এই ধারা বাতিলের কথা জানিয়েছিলেন। সোমবার আইনটির সংশোধনী–সংক্রান্ত খসড়া অনুমোদন করে মন্ত্রিসভা। এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য তা জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে। সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভা বৈঠক হয়।
আর্থিক নানা অনিয়মের কারণে সংকটে পড়া পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক হচ্ছে– এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক। এর মধ্যে এক্সিম ছিল নাসা গ্রুপের এবং অন্য চারটি এস আলম গ্রুপের।
একীভূত পাঁচটি ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৭৯ শতাংশ।
বিতর্কিত ধারা যেভাবে যুক্ত হয়
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নানা অনিয়মে দুর্বল বেশি সমস্যাগ্রস্ত পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করতে গত বছরের ২৫ মে রেজোল্যুশন অধ্যাদেশ জারি করে বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার। বিএনপি সরকার গত ১০ এপ্রিল অন্তর্বর্তী সরকারের করা ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করে।
আইনটি সংসদে পাসের আগে ১৮(ক) নামে একটি নতুন ধারা যুক্ত করা হয়। এই ধারায় বলা হয়, কোনো ব্যাংক রেজোল্যুশনের আওতায় যাওয়ার আগে যারা শেয়ারহেল্ডার ছিলেন, তারা চাইলে পরে আবার সেই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করতে পারবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে অন্য কোনো উপযুক্ত ব্যক্তিকেও এই সুযোগ দিতে পারবে। অবশ্য এজন্য আবেদনকারীকে সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বিভিন্ন শর্ত পূরণের অঙ্গীকার করতে হবে। সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত ধারাটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সোমবারের সভার পর বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সরকারের আর্থিক দায়ভার, গ্রাহকের স্বার্থ এবং ব্যাংকিং খাতের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় আইনে নতুন ধারা ১৮(ক) সংযোজনপূর্বক বিলটি সংসদে উত্থাপন করা হয় এবং উত্থাপিত আকারে ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন, ২০২৬ পাস হয়। প্রচলিত রেজোল্যুশন টুলসমূহের পাশাপাশি একটি বাজারভিত্তিক বিকল্প ব্যবস্থা প্রচলন, রেজোল্যুশনের আওতাধীন ব্যাংককে সচল রেখে এর পুনর্গঠন, মূলধন–ঘাটতি ও তারল্য সংকট দূরীকরণ, আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং সরকারি আর্থিক সংশ্লেষ হ্রাসকরণের লক্ষ্যে ধারাটি সংযোজন করা হয়।
এতে বলা হয়, ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন, ২০২৬-এর ১৮(ক) ধারার সকল শর্ত পরিপালনপূর্বক কোনো ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান আবেদন না করায় উক্ত ধারা বিলুপ্ত করে ‘ব্যাংক রেজোল্যুশন (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে।