Image description

ড্রয়িং রুমের দেয়াল জুড়ে যুবক বয়সের ছবি— হাতে ফুটবল, চোখে উচ্ছ্বাস। সেই তরুণই আজ ৭২ বছর বয়সে ব্রেইন টিউমারের সঙ্গে লড়ছেন। শুক্রবার (৭ আগস্ট) রাতে গুলশানের বাসায় গিয়ে দেখা মিললো ইলিয়াস কাঞ্চনের— পর্দার নায়ক থেকে বাস্তবের নায়ক হয়ে ওঠা এক মানুষের, যিনি এখন নিজেই লড়ছেন সবচেয়ে কঠিন লড়াইটা।

সত্তরের দশকের শেষদিকে চলচ্চিত্রে পা রাখেন ইলিয়াস কাঞ্চন। সুদর্শন চেহারা আর সাবলীল অভিনয় দিয়ে শুরুতেই জায়গা করে নেন দর্শকের মনে। রোমান্টিক নায়কের বাইরেও পর্দায় হয়ে উঠেছেন প্রতিবাদী যুবক, ঐতিহাসিক ও লোকজ চরিত্র, পরিবারের দায়িত্বশীল কর্তা। ক্যারিয়ারে যেমন আছে ঢালিউডের সর্বাধিক ব্যবসাসফল ছবি ‘বেদের মেয়ে জোসনা’, তেমনি আছে ‘পরিণীতা’, ‘ভেজা চোখ’, ‘সুন্দরী’, ‘শাস্তি’, ‘ডুমুরের ফুল’, ‘বসুন্ধরা’র মতো সাহিত্যনির্ভর ও সামাজিক বার্তার ছবি। রাজ্জাক, ফারুক, আলমগীর, রুবেলদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বক্স অফিসেও হয়েছেন সফল।

৩১ বছর আগে স্ত্রী জাহানারা বেগমকে হারিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন। এই সংগঠনই তাকে পর্দার বাইরে পরিণত করেছে বাস্তবের নায়কে। সেই নায়ক এখন অসুস্থ। গত ১৫ মাস ধরে লন্ডনে চলছে তার ব্রেইন টিউমারের চিকিৎসা। ৬০টি কেমো সেশন শেষ করে সম্প্রতি দেশে ফিরেছেন এই গণমানুষের নায়ক।

আমরা পৌঁছানোর আগে থেকেই সেখানে উপস্থিত ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের আরেক কিংবদন্তি শবনম। আশির দশকে ‘সহধর্মিনী’ ছবিতে একসঙ্গে অভিনয় করেছিলেন তারা— একমাত্র সেই ছবিতেই জুটি বেঁধেছিলেন দুজন। তবে সিনেমার সেই সম্পর্ক ছবির বাইরেও টিকে আছে এখনো, বন্ধুত্ব আর পারিবারিক আত্মীয়তায়। শবনম টুকটাক স্মৃতিচারণ করছিলেন সেই ছবিটির। ইলিয়াস কাঞ্চন চেষ্টা করলেন মনে করার। পাশ থেকে ছেলে মিরাজুল মঈন জয়ও সাহায্য করলেন মনে করাতে। কিন্তু কিছুতেই মনে পড়ছিল না তার। ‘মনে পড়ছে না’— বলার সময় তার চোখেমুখে ফুটে উঠল কিছুটা হতাশার ছায়া।

কেমোথেরাপির পর সাধারণত মানুষের চুল পড়ে যায়, কিন্তু কাঞ্চনের ক্ষেত্রে ঘটেছে উল্টোটা— চুল বেড়েছে, তবে রং হয়ে গেছে সাদা। এই পরিবর্তন নিয়ে হালকা রসিকতা করলেন শবনম, ‘কে বলে ওনার বয়স ৭২ হয়েছে। আমি তো বলি ২৭। খালি চুলে একটু রং লাগালেই আর কেউ ধরতে পারবে না।’ জবাবে ইলিয়াস কাঞ্চন জানালেন, এই লুকেই তিনি স্বচ্ছন্দ।

শবনম বললেন, ‘আমি রসিকতা করছিলাম যাতে তিনি মনে না করেন তার পাশে কেউ নেই। এরকম একটা প্রাণবন্ত মানুষকে চুপচাপ দেখলে খারাপ লাগে।’

একের পর এক মানুষ আসছিলেন তাকে দেখতে— কেউ ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের কর্মী, কেউ চলচ্চিত্রের সহকর্মী, কেউ গণমাধ্যমকর্মী। তিনি বসে থেকে সবার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছিলেন, যদিও অনেক কথাই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না। তবু প্রত্যেকে মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। একটানা একটু বেশি কথা বললেই তিনি অসুস্থ বোধ করছিলেন, তখন চুপ হয়ে যাচ্ছিলেন।

কিছুক্ষণ পর এলেন বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় খলনায়ক মিশা সওদাগর, সঙ্গে তার মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়া ছেলে। ঘরে ঢুকেই পা ছুঁয়ে সালাম করলেন মিশা। ইলিয়াস কাঞ্চন একটু অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন তার দিকে। পাশ থেকে ছেলে জয় বললেন, ‘বাবা, উনি মিশা আংকেল। মিশা সওদাগর।’ উত্তরে কাঞ্চন বললেন, ‘আমি চিনি তো ওকে।’ মিশা তখন নিজের ছেলেকেও পরিচয় করিয়ে দিলেন। কাঞ্চন তার মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করে দিলেন।

মিশার সঙ্গে আসা দুজন হাফেজকে দিয়ে তিনি ইলিয়াস কাঞ্চনের জন্য দোয়া করালেন। স্মৃতিচারণ করে মিশা বললেন, ‘চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে আমি হুমায়ূন ফরীদী ও এটিএম শামসুজ্জামান ভাইকে অনুসরণ করতাম। তাদের পরে সবচেয়ে বেশি মানতাম কাঞ্চন ভাইকে। আমরা দুজন শিল্পী সমিতিতে সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছি, কিন্তু কোনোদিন সম্পর্ক খারাপ হয়নি। উত্তরায় ওনার বাড়ির কাছেই আমার বাসা, আমাদের মধ্যে পারিবারিক সম্পর্ক।’

শবনম ভরসা দিলেন ইলিয়াস কাঞ্চন ও তার সন্তানকে, ‘লন্ডনের চিকিৎসাব্যবস্থা অনেক উন্নত। দোয়া করি, পুরোপুরি সুস্থ হয়ে আপনি আবার অভিনয়ে ফিরবেন।’

ছেলে জয় জানালেন বাবার মনের ভেতরের এক চাপা আক্ষেপের কথা। ‘বাবার মনে হয়, জীবনে তার আরও অনেক কিছু করার সুযোগ ছিল, কিন্তু অনেক কিছুই করতে পারেননি। জবাবে আমি তাকে বলেছি— তুমি যতটুকু অর্জন করেছ, তা-ই অনেক মানুষের স্বপ্ন। তোমাকে দেশের মানুষ ভালোবাসে, এর চেয়ে বড় অর্জন আর কী হতে পারে।’

সবার কথার এক ফাঁকে গিয়ে দাঁড়ালাম তার পাশে। বসা থেকে উঠে দাঁড়ালেন তিনি, আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই জানতে চাইলেন, ‘কেমন আছেন?’ কুশল বিনিময়ের পর তিনি বললেন, ‘আমি ভালো আছি। দোয়া করবেন, দ্রুতই যেন আপনাদের মাঝে ফিরে আসতে পারি। আবার কাজ করতে পারি।’

প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় দিলেন সেদিন, যদিও শেষদিকে আর বসে থাকতে পারছিলেন না। ‘আমার খারাপ লাগছে’— এ কথা শোনার পর ছেলে জয় এগিয়ে এসে বাবাকে ধরে ভেতরে নিয়ে গেলেন। জানালেন, আগামী ১২ আগস্ট আবার লন্ডনে যাচ্ছেন তারা। সেখানে ১৯ আগস্ট হাসপাতালে হবে তার চেকআপ— দেখা হবে শরীরে ক্যান্সারের আর কোনো জীবাণু অবশিষ্ট আছে কিনা। এরপরই চিকিৎসকেরা ঘোষণা দেবেন, তিনি এখন বিপদমুক্ত।

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও একুশে পদক বিজয়ী এই অভিনেতার লাখো ভক্তের মত আমরাও চাই, তিনি ফিরে আসুন আমাদের মাঝে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে। উপহার দিন অনবদ্য কিছু ছবি। সড়ক নিরাপদ করার আন্দোলনের বাকি কাজগুলো শেষ করুন।