Image description

বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করবে কিনা—এ নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা। গত ৩ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক সভার কার্যবিবরণীতে এনটিআরসিএকে শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা বলা হলেও ১০ আগস্ট রাতে শিক্ষামন্ত্রীর অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে জানানো হয়েছে, ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে সরকার কোনও সিদ্ধান্ত নেয়নি।

এনটিআরসিএর ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে পরস্পরবিরোধী এই তথ্যের কারণে শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থী ও বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ১৮তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৯ হাজার ৮৪২ জনের নিয়োগ কোন প্রক্রিয়ায় হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এনটিআরসিএ প্রথমে শুধু নিবন্ধন পরীক্ষা নিত। ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে শূন্য পদের বিপরীতে নিবন্ধনধারীদের নিয়োগের সুপারিশ শুরু করে সংস্থাটি। অনেকটা সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) আদলে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে।

গত এক দশকে সংস্থাটি ১ লাখ ৭৭ হাজার ৫৭১ জন শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করেছে। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, এনটিআরসিএর সুপারিশ ছাড়া এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ নেই।

এনটিআরসিএর নিয়োগের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে—এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। শিক্ষাবিদদের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনও এর প্রতিবাদ জানায়।

 

৩ আগস্টের সভায় কী সিদ্ধান্ত হয়েছিল

গত ৩ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত সভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, এনটিআরসিএ এখন থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করবে না। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম নেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

সভায় সভাপতিত্ব করেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক, এনটিআরসিএর চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আলিফ রুদাবাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, ‘বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০০৫’ অনুযায়ী এনটিআরসিএর কাজ হবে নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন করা। ২০১৫ সালের পরিপত্র অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি আর শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করবে না বলেও সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এ ছাড়া ১৮তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৯ হাজার ৮৪২ জনকে তাদের পছন্দ অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথাও কার্যবিবরণীতে উল্লেখ রয়েছে। এ জন্য প্রয়োজনীয় পরিপত্র বা প্রজ্ঞাপন সংশোধন বা জারির কথাও বলা হয়েছে।

সরকারের অবস্থান কী

এর মধ্যেই সোমবার (১০ আগস্ট) রাতে শিক্ষামন্ত্রীর অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে অ্যাডমিনের পক্ষ থেকে মন্ত্রীর বরাত দিয়ে দেওয়া এক পোস্টে বলা হয়, এনটিআরসিএর কার্যক্রম ও শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ, দক্ষ ও সুন্দরভাবে কীভাবে পরিচালনা করা যায়, তা নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনা চলছে।

তবে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার কোনও সিদ্ধান্ত সরকার নেয়নি বলেও পোস্টে জানানো হয়।

পোস্টে বলা হয়, ‘বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) ২০০৫ সালে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। এনটিআরসিএর কার্যক্রম ও শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, দক্ষ ও সুন্দরভাবে কীভাবে পরিচালনা করা যায়, সে বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পর্যালোচনা অব্যাহত রেখেছে। ম্যানেজিং কমিটি/গভর্নিং বডি কর্তৃক শিক্ষক নিয়োগ প্রদান–সংক্রান্ত কোনও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি। এ বিষয়ে কোনও অপতথ্য প্রচার না করার জন্য সবার প্রতি অনুরোধ রইল।’

ফলে ৩ আগস্টের সভার কার্যবিবরণী এবং ১০ আগস্টের মন্ত্রীর বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

ছাত্র সংগঠনগুলোর প্রতিক্রিয়া

এনটিআরসিএর পরিবর্তে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ ছাত্রপক্ষ, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, ইসলামী ছাত্র আন্দোলনসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন। জাতীয় ছাত্রশক্তি এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিলও করেছে।

বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি নাজমুল হাসান বলেন, শিক্ষক নিয়োগে ম্যানেজিং কমিটির ক্ষমতা বাড়ানো হলে আবারও স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম ও অর্থের বিনিময়ে নিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে। ২০১৫ সাল থেকে এনটিআরসিএর মাধ্যমে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিকভাবে শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।

বাংলাদেশ ছাত্রপক্ষের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি আকিব হাসান বলেন, এনটিআরসিএর মাধ্যমে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগের যে প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা বাতিল করে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির হাতে নিয়োগের ক্ষমতা ফিরিয়ে দিলে শিক্ষক নিয়োগে ঘুষ, তদবির, রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বজনপ্রীতির সুযোগ তৈরি হবে।

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহও ম্যানেজিং কমিটির হাতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়ার সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন।

অন্যদিকে, বিষয়টিকে গুজব বলে আখ্যায়িত করে অপতথ্য প্রচার থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির এক ফেসবুক পোস্টে বলেন, এ পর্যন্ত ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি।

সিদ্ধান্ত হয়েছে, নাকি হয়নি

এনটিআরসিএ সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ আগস্টের বৈঠকে শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে মন্ত্রণালয় থেকে এনটিআরসিএতে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনও নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

ফলে কার্যবিবরণীতে সিদ্ধান্তের কথা থাকলেও সেটি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে বাস্তবায়নের পর্যায়ে যায়নি বলেই সংশ্লিষ্টরা জানান।