গ্যাসসংকট, কয়লা ঘাটতি, আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ কমায় লোডশেডিং আরও বেড়েছে। রোববার রাত ১টায় ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করা হয়। অন্যদিকে মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনাল কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সারা দেশে যে তীব্র গ্যাসসংকট দেখা দেয়, তা এখনো কাটেনি।
গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য বলছে, গত কয়েক দিন বেশিরভাগ সময়ই লোডশেডিং আড়াই হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াটে ওঠানামা করেছে। মাঝরাতে লোডশেডিং সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াটও ছাড়িয়ে যায়। সাম্প্রতিককালে এত লোডশেডিং দেখা যায়নি।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। তবে বাস্তব উৎপাদন নির্ভর করে জ্বালানি সরবরাহ, কেন্দ্রগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও চাহিদার তারতম্যের ওপর। চলতি বছরের মে মাসে ১৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের রেকর্ড হয়েছে।
পিজিসিবির তথ্য বলছে, গতকাল রোববার দিবাগত রাত ১২টায় ৩ হাজার ৬৫৬ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়। রাত ১টায় তা রেকর্ড ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে ঠেকে; ওই সময় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৬২ মেগাওয়াট, সরবরাহ করা হয় ১২ হাজার ৫০৫ মেগাওয়াট। রাত ২টায় লোডশেডিং দাঁড়ায় ৩ হাজার ৭৫১ মেগাওয়াটে। এরপর কিছুটা কমে এলেও সোমবার বিকেলে আবারও লোডশেডিং তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়।
পিডিবির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গ্যাস সংকট ও রাতে কয়লার ঘাটতির কারণে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এর পাশাপাশি ভারত থেকে আসা আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহও কমেছে। সে কারণে লোডশেডিং বেড়ে গেছে।
গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত একটি এলএনজি টার্মিনাল কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে যায়। এরপর সারা দেশে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দেয়। জ্বালানির সরবরাহ সংকটে পড়ে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। সার্বিকভাবে কমে যায় বিদ্যুৎ উৎপাদন। তখন থেকেই দেশে লোডশেডিং বেড়ে যায়।
গত ৫ আগস্ট দিবাগত রাতে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত এলএনজি টার্মিনাল থেকে আংশিকভাবে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়। তবে এখনও বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আগের মতোই গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।
পিডিবি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুটের (এমএমসিএফডি) কিছু বেশি। বর্তমানে সরবরাহ বন্ধ থাকা ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি সচল থাকার সময় সরবরাহের পরিমাণ ছিল ১ হাজার এমএমসিএফডি।
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, এখন পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ বাড়েনি। আর রাতে কয়লার ঘাটতির কারণে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন কমে যায়। ইদানিং আদানি থেকেও কম বিদ্যুৎ এসেছে, তারা টেকনিক্যাল সমস্যার কথা জানিয়েছিল। আদানি আজ (সোমবার) জানিয়েছে যে তাদের সেই সমস্যার সমাধান হয়েছে। ফলে আদানি থেকে শিগগিরই পুরো বিদ্যুৎ আসবে বলে আশা করছি।
পিডিবি সূত্রে জানা গেছে, গ্যাসের স্বল্পতার কারণে ঘোড়াশাল ৩৬৫ মেগাওয়াট (ইউনিট-৭), ইউনিক মেঘনাঘাট ৫৮৪ মেগাওয়াট, মেঘনাঘাট ৭১৮ মেগাওয়াট এবং ভেড়ামারা ৪১০ মেগাওয়াট সিসিপিপির মতো বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনের বাইরে রয়েছে। শুধু গ্যাস ও তরল জ্বালানির অভাবে অন্তত ৫ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
পিডিবির অঞ্চলভিত্তিক লোডশেডিংয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ময়মনসিংহ অঞ্চলে চাহিদার ৩৫ শতাংশের মতো লোডশেডিং করতে হচ্ছে। সিলেট, বরিশাল ও রংপুর অঞ্চলে প্রায় ৩০ শতাংশ লোডশেডিং হচ্ছে। রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় লোডশেডিংয়ের পরিমাণ কম, ১০ শতাংশের মতো। তুলনামূলক কম লোডশেডিং চট্টগ্রাম অঞ্চলে।
গ্যাসের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংকটেও শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। দিনে চারবার লোডশেডিং হলে উৎপাদন শতকরা ১৫ শতাংশ কমে যায় বলে জানান শিল্প মালিকরা। তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে দিনে ৮ থেকে ১০ বার লোডশেডিং হচ্ছে। এতে কারখানার উৎপাদন কমে এসেছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস ও সাপ্তাহিক ছুটিকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জে টানা তিন দিন গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ থাকায় বিদ্যুতের ব্যবহারের ওপর চাপ কমে। লোডশেডিং কমার সুবিধা নিতে ফতুল্লার পঞ্চবটি বিসিক হোসিয়ারি পল্লীর ৪৬৫টি নিটিং কারখানা বন্ধের দিনেও চালু রাখা হয়।
বিসিক হোসিয়ারি পল্লী মালিক সমিতির পরিচালক শহীদুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, ছুটির দিনে বিসিকের অধিকাংশ গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ থাকায় বিদ্যুতের ওপর চাপ কম থাকে। ফলে লোডশেডিং কম হওয়ার সুযোগে নিটিং কারখানাগুলো উৎপাদন ঘাটতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।
এদিকে প্রায় তিন সপ্তাহ হতে চললেও বয়লারে আগুন থেকে সৃষ্ট কারিগরি ত্রুটিতে বন্ধ হওয়া এলএনজি টার্মিনালটি এখনও পুরোদমে কার্যক্রমে ফিরতে পারেনি। বর্তমানে একটি বয়লার চালু রাখার মাধ্যমে আংশিক গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এক্সিলারেট এনার্জি টার্মিনালটি পুরোদমে সচলে ১০ আগস্ট পর্যন্ত সময় চেয়েছিল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) উপমহাব্যবস্থাপক (এলএনজি) প্রকৌশলী মুহাম্মদ নাছির উদ্দীন সোমবার বিকেলে স্ট্রিমকে বলেন, ‘টার্মিনালটি পূর্ণাঙ্গভাবে সচলে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। বর্তমানে একটি বয়লার চালু আছে, ২৮০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। অন্য বয়লার চালু হলে সরবরাহ ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটে উত্তীর্ণ করা যাবে।